ড. কাজী এরতেজা হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২০, ১০:২২ এএম আপডেট: ২৮.১২.২০২০ ১২:৪৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ
চাল ও ভোজ্যতেলের বাজার গরম। বেশ কিছুদিন ধরে চাল ও ভোজ্যতেলের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। দেশের অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে যে এমন অবস্থা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলার নেপথ্যে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে সব সময়। তাদের কারসাজিতে ঘটে এমন ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন বাজারের এই হাল এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ কেন সরকার? সরকারের অক্ষমতা কোথায়?, এটাও ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে! অনেকেই জানেন যে, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের একটি বড় অংশ বিএনপি-জামায়াত ঘেষা। এরা বিএনপি-জামায়াতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসা করে এবং বিএনপি-জামায়াতের অর্থভা-ারকে কিভাবে সমৃদ্ধ করা যায় সেই বিবেচনা থেকে নিত্যপণ্যের বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে তপ্ত করে তোলে। এভাবে নিমিষে অতিরিক্ত মুনাফার মাধ্যমে লুটে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ক’দিন আগেও আমি এ ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক করে এক কলামে লিখেছিলাম। যে নিত্যপণ্যের বাজার অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে না দিয়ে উচিত হলো সরকারের মুঠোয় শক্তভাবে ধরে রাখা।
চাল ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। সরকারের দায়িত্বশীলদেরকে অনুধাবন করতে হবে এই নাভিশ্বাসের বিষয়টি। চাল ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় সাধারণ ভোক্তারা যে সরকারের ওপর নাখোশ এটি একবারের জন্য হলেও ভাবতে হবে সরকারকে। ভাবতে হবে এ কারণে যে সরকারের ভাবমূর্তিতে আঁচড় কাটতে, রক্তাক্ত করতে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। তার মধ্যে এক নম্বর ষড়যন্ত্র হলো, নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলা। বিএনপি-জামায়াতের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এই কাজে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে আছে বহুদিন ধরে। তারা বাজার অস্থিতিশীল করার কাজে যাবতীয় কলকাঠি নেড়ে চলছে নেপথ্যে। নিত্যপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে যাদের ভাবার কথা সরকারের সেই সব দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এ নিয়ে কোনো ভাবনা আছে কি-না তা আমাদের অজানা। যদি থেকে থাকতো তাহলে ঘন ঘন নিত্যপণ্যের বাজার গরম হয়ে ওঠার যৌক্তিক কারণ কি? বাস্তবতা ছাড়া নিত্যপণ্যের বাজার ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যায় কেন? মোটা দাগে এটাও বলা যায়, বিএনপি-জামায়াতের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীলরা আঁতাত করে বসে আছে এটাও ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কি অবাস্তব, সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিএনপি-জামায়াতের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে বাজার অস্থিতিশীলের মাধ্যমে দেশে একটি নৈরাজ্য সৃষ্টিতে যুথবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে না! আমি মনে করি এটা অবাস্তব নয়, অলীকও নয়। অনুসন্ধান চালালে বের হয়ে আসবে আসল বাস্তবতা ও রহস্য। তখন দুশ্চিন্তায় পড়তে পারে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পর্যন্ত।
গতকাল চালের দাম বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষিমন্ত্রী পর্যন্ত। তিনি অভিযোগ করেছেন এতে মিলারদের কারসাজি আছে। গতকাল কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন গত ২/৩ বছর অনেক কম ছিল খাদ্যের (ধান/চাল) দাম। গত বছর খুবই ভালো হয়েছিল বোরো ধান, স্মরণাতীতকালে খুব কম হয়েছে এমন ধান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে চলতি বছর বন্যায় আউশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় এক কোটি ৫০ থেকে এক কোটি ৫৩ লাখ টন পর্যন্ত আমন ধান হয় আমাদের দেশে। এ বছর সরকার টার্গেট করেছিল আমনেও উৎপাদন বেশি হবে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে বন্যায় ফসল তিনবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার চালের বাজার নিজের মুঠোয় ধরে রাখতে কিছু সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সরকারি পদক্ষেপগুলো নিয়ে অনলাইনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তিনি বলেছিলেন, ‘২৫ শতাংশ শুল্কে চাল আমদানি করতে পারবেন বেসরকারি ব্যবসায়ীরা। যারা বৈধ লাইসেন্সধারী আছেন তারা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবেন ১০ জানুয়ারির মধ্যে। মন্ত্রণালয় কাকে কতটুকু ছাড়পত্র দেবে সেটার এলসি হবে। সেটা সরকারই মনিটরিং করবে। বেসরকারিভাবে এই চাল আমদানি করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেই সরকার বেসরকারিভাবে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক ছিলো করা হয়েছে এখন ২৫ শতাংশ। তবে লক্ষ্য রাখা হবে কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সরকার কারো হুমকিতে মাথা নত করে না বলেও জানিয়েছিলেন, সরকার মিলারদের চুক্তির জন্য পীড়াপীড়ি করেনি। তারা তাদের হুমকি নিয়ে থাকুক। প্রয়োজনে সরকার কৃষকের কাছ থেকে বেশি করে ধান কিনবে। যাতে করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দরকার হলে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল কিনবে। বেসরকারিভাবে যখন যতটুকু আমদানি করা প্রয়োজন তা করা হবে। বোরো আসার আগে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার সেটাও করা হবে। বোরো মৌসুমে এ অবস্থা থাকলে আবার আমদানি করা হবে।
সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা ওপেন করেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য মণ প্রতি ১০৪০ টাকা। কিন্তু বাইরে কৃষকরা ধান বিক্রি করে বেনিফিট হলে সরকারের কাছে বিক্রি করে না। কারণ আজকেও বাইরে ১২০০ টাকা মণ দাম আছে। চালের রেট বাণিজ্য, কৃষি, অর্থ, খাদ্য মন্ত্রণালয় মিলে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সহনীয় রেট কি করা যায় সেটার নীতিমালা নেই। সবকিছুর একটা নীতিমালা আছে বাট এটার নাই। ধানের দাম কমলে আমরা কৃষকের জন্য হাহাকার করি। আবার চালের দাম বাড়লেও হাহাকার করি। তাই এখানে একটা স্ট্যান্ডার্ড রেট থাকতে হবে। সহনশীল একটি স্ট্যান্ডার্ড রেট তৈরি করতে হবে। খাদ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগ সফল হোক এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। চাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্য কোনোভাবেই যেন অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে চলে না যায় তার দিকে খাদ্যমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষপর্যায়ে সচেতন থাকা দরকার। বাজার গরম করে তোলার আসল কুশীলব হল বিএনপি-জামায়াত এবং তথাকথিত আওয়ামী লীগ ছদ্মবেশি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যে কোনো মূল্যে এদের মোকাবিলা করে চাল, ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য স্থিতিশীল রাখায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে সরকারকে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ কি সরকারের হাতে? এর জবাব সরকারকেই নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে দেখাতে হবে বাজার সরকারের হাতেই আছে।