আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা কর। যদি তোমরা প্রকৃত মুমনি হও।’ (সূরা মায়েদাহ : ২৩) অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তুমি আল্লাহর ওপর ভরসা কর। তুমি তো স্পষ্ট সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা নমল : ৭৯)
আরবি ‘তাওয়াক্কুল’ শব্দের অর্থ úূর্ণরুপে ভরসা করা। এটি যখন মহান আল্লাহর সঙ্গে স্পর্কিত হবে তখন অর্থ হবে- ‘মহান আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণরুপে ভরসা করা’। ‘তায়াক্কুল’ তথা ‘আল্লাহর উপর ভরসা’ মানব জীবনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্তর। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ঈমানের যেসব বিষয় ফরজ বা আবশ্যকীয়, তাওয়াক্কুল তন্মধ্যে অন্যতম। তাওয়াক্কুলের সংজ্ঞায় সুফি তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘মালিকের উপর বান্দার তাওয়াক্কুলের অর্থ, আল্লাহই তার নির্ভরতার একমাত্র স্থান- একথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।’(জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম :৪৩৭)
শায়েখ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘কল্যাণ অর্জনে ও অকল্যাণ দূরীকরণেসত্যিকারভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করার পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা যে সব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতে বলেছেন তা অবলম্বন করাকে তাওয়াক্কুল বলে’। (রাসাইলু ইবনে উসাইমিন :১/৬৩)
তায়াক্কুলের গুরুত্ব তাৎপর্য সম্পর্কে তাবেয়ি সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রহঃ) বলেন, ‘আল্লাহর উপর ভরসা ঈমানের সামষ্টিক রূপ’। (মুসান্নিফ ইবনে শায়বা:৭/২০২।) ইবনে কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘বান্দা যদি কোন পাহাড় সরাতে আদিষ্ট হয় আর যদি সে কাজে সে আল্লাহ তা‘আলার উপর যথার্থভাবে ভরসা করতে পারে, তবে সে পাহাড়ও সরিয়ে দিতে পারবে।’ (মাদারিজুস সালিকিন :১/৮১)
সুতরাং একজন মুমিন তার যাবতীয় কাজে আল্লাহর উপর ভরসাকে শুধুমাত্র একটি মুস্তাহাব বিষয় ভাবতে পারে না; বরং তাওয়াক্কুলকে একটি দ্বীনী দায়িত্ব বা আবশ্যিক কর্তব্য বলে মনে করবে। এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহর উপর ভরসা করা ফরজ। এটি উচ্চাঙ্গের ফরজ সমূহের অন্তর্ভূক্ত। যেমন আল্লাহর জন্য ইখলাছ বা বিশুদ্ধচিত্তে কাজ করা ফরয। অজু ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতার জন্য গোসলের ব্যাপারে যেখানে আল্লাহ তা‘আলা একটি আয়াতে একবার বলে তা ফরয সাব্যস্ত করেছেন, সেখানে একাধিক আয়াতে তিনি তাঁর উপর ভরসা করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁকে ছাড়া অন্যের উপর ভরসা করতে নিষেধ করেছেন’। (মাজমু ফতোয়া :৭/১৬)
আল্লাহর ওপর ভরসা করার মানে এই নয় যে, বান্দা তার চেষ্টা-তদবীর বন্ধ করে দিবে এবং উপায়-উপকরণ ছেড়ে দিবে। বরং তায়াক্কুলের মানে হল, অন্তর থেকে আল্লাহর উপর ভরসা করা, একই সঙ্গে পার্থিব নানা উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা এবং পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহই রিযিকদাতা, তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, জীবন ও মৃত্যু দাতা তিনিই। তিনি ছাড়া যেমন কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই, তেমনি তিনি ছাড়া কোন প্রতিপালকও নেই। আল্লামা ইবনে কায়্যিম (রহ) বলেন, ‘তাওয়াক্কুলের রহস্য ও তাৎপর্য হ’ল, বান্দার অন্তর এক আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া; জাগতিক উপায়-উপকরণের প্রতি অন্তরের মোহশ্যূ থাকা, তার প্রতি আকৃষ্ট না হওয়া। কারন, এসব উপায়-উপকরণের সরাসরি ক্ষতি কিংবা উপকার করার কোনই ক্ষমতা নেই’। (আল ফাওয়াইদ :৮৭)
তায়াক্কুলের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পার, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে পাখির মত রিজিক দিবেন। পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভড়া পেটে নীড়ে ফিরে।(তিরমিজি : ২৩৪৪, ইবনে মাজাহ : ৪১৬৪)
পাখি যেমন তায়াক্কুলের নামে হাত পাত ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে না বরং খুব সকালেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে রিজিকের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ে, তেমনি আমরাও যদি আল্লাহর ওপর ভরসা করে সম্ভাব্য সব উপায়-উপকরণ এবং চেষ্টা তদবীর করি, তবে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে অবশ্যই সফলতা দিবেন। সুতরাং জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহর তায়াক্কুল তথা ভরসা কা যেন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়- এ আহ্বান সবার কাছে। তবেই আমরা প্রকৃত মুমিন ও মুসলমান হতে পারব।
লেখক:মেজ পীরসাহেব,ছারছীনা।