প্রকাশ: সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০, ১২:৪৯ পিএম আপডেট: ৩০.১১.২০২০ ১:২৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ
বিতর্কিত কৃষি সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলন আছড়ে পড়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে। ব্যাহত হচ্ছে রেল, সড়ক পরিবহন থেকে সবধরনের নাগরিক পরিষেবা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আলোচনার আশ্বাস দিলেও, বিক্ষোভে অটল কৃষকরা রাজপথ ছাড়েনি একচুলও। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের উদ্দেশে বার্তা দিতে এ বার এগিয়ে আসতে হল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেও। তিনি জানালেন, কৃষকদের কল্যাণের কথা ভেবে, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করেই কৃষি আইনে সংশোধন ঘটিয়েছে তার সরকার। তবে তার এই কথায় কৃষকরা যে সন্তুষ্ট নন তা স্পষ্ট বুঝা গিয়েছে।
গতকাল ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে কৃষকদের উদ্দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর সম্প্রতি সংসদে কৃষি সংশোধনী আইন পাশ হয়েছে। এই সংশোধনের ফলে কৃষকরা শুধু শিকলমুক্তই হননি, নতুন অধিকার ও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা এসে পৌঁছেছে তাদের হাতে।’ এই ভাবে তিনি বিক্ষুব্ধ কৃষকদের শান্ত করতে চাইলেও তাতে কোন ফল লাভ হয়নি। কৃষি আইন সংশোধনের বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। বিক্ষুব্ধ কৃষকদের জন্য আইনটি কল্যাণকর বলেও প্রধানমন্ত্রী মোদি তাদের আশ^স্ত করতে চান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এই আইনের মাধ্যমে কৃষকদের সামনে অনেক দরজা খুলে গিয়েছে বলেও দাবি করেন।
মোদি বলেন, ‘কৃষি আইনে সংশোধন ঘটানোয় আমাদের কৃষকরা আরও অনেক বেশি সুযোগ পাবেন। তাদের বঞ্চনার দিনও শেষ হয়েছে বলে মন্তব্য করে মোদি বলেন, আইনটি আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনের আওতায় এক মাসের মধ্যে কৃষকদের সব অভাব অভিযোগের সমাধান হয়ে যাবে। মহকুমা শাসকদের নির্দেশ দেওয়া রয়েছে, এক মাসের মধ্যে কৃষকদের সব সমস্যার সমাধান করে দিতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের ধুলের বাসিন্দা জিতেন্দ্র ভাইজি নামের এক কৃষকের উদাহরণ টেনে আনেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘৩ লাখ ৩২ হাজার টাকায় ভুট্টার বিক্রি পাকা হয়েছিল এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। সেই বাবদ অগ্রিম ২৫ হাজার টাকাও হাতে পেয়েছিলেন। কিন্তু বাকি টাকা আটকে যায়। চার মাস অপেক্ষার পর নয়া কৃষি আইন ব্যবহার করে রক্ষা পান উনি। আইন সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানই শেষমেশ কাজে আসে তার।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ শেষ হতে না হতেই বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, আমরা আমাদের দাবি আদায়ে এখানে জমায়েত হয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে চাই তারা আমাদের দাবিগুলো মানছেন কি না?
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বার্তা এলেও, দিল্লিতে কৃষকদের বিক্ষোভ স্তিমিত হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। গত শনিবার দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, জাতীয় সড়ক থেকে বিক্ষোভ বুরারি গ্রাউন্ডে সরিয়ে নিয়ে গেলে সরকার তাদের অভিযোগ শুনবে এবং দাবিদাওয়াগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।’ কিন্তু তার ‘শর্তসাপেক্ষ’ আলোচনায় বসার এই প্রস্তাব সেদিনই খারিজ করে দিয়েছেন প্রতিবাদী কৃষকরা। আন্দোলন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা তাদের নেই, তাও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে ভারতীয় কিসান ইউনিয়নের পাঞ্জাব শাখার সভাপতি জগজিৎ সিংহ বলেন, ‘কোনও রকম শর্ত ছাড়া খোলা মনে আলোচনার প্রস্তাব দিতে পারতেন অমিত শাহ। এই সরকার কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেই চায় না। দেশের সামনে বড়াই করাই একমাত্র কাজ ওদের।’ আপাত দৃষ্টে দেখা যাচ্ছে সংকট মোচনের কোন লক্ষণ দু’পক্ষের ভেতরে স্পষ্ট নয়। কোন পক্ষ ছাড় দিতে রাজী না হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দিল্লিতে কর্মরত বিদেশি গণমাধ্যমের কর্মীরা জানান, কৃষকদের আন্দোলন যতদিন যাচ্ছে ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। এদিকে সরকারও ধীরে ধীরে সংঘাতের দিকেই এগিয়ে চলেছে। সরকারের অন্দরমহল থেকে বলা হচ্ছে আপসে যদি কৃষকরা আন্দোলন বন্ধ না করে তাহলে শক্তি প্রয়োগে সরকার পিছু হটবে না।
প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিনে কৃষক বিদ্রোহে অনেকটাই টালমাটাল হয়ে পড়েছে ভারত। লাখ লাখ কৃষক তাদের তিন দফা দাবি আদায়ে দিল্লিতে জমায়েত হয়েছেন। নতুন কৃষিসংস্কার বিল বাতিলের দাবিতে ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য থেকে লাখে লাখে কৃষক রাজধানী দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করে গত শুক্রবারই দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন। কৃষকদের দাবির পক্ষে ইতোমধ্যে সংহতি প্রকাশ করেছে বিজিপিবিরোধী সব দল। ফলে নতুন এ কৃষকবিদ্রোহ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ঘটতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।