২৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান, ডাকসু’র ভোট আজ

  • ১১-মার্চ-২০১৯ ০৫:৪৯ অপরাহ্ন
Ads

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হবে আজ সোমবার। সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে ভোট। ৪৩ হাজার ২৫৬ শিক্ষার্থী ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করবেন। দিনটি ঘিরে উৎসব ও শঙ্কা দুই-ই বিরাজ করছে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। তারা মনে করছেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণই বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সব শঙ্কা পায়ে দলে উৎসবমুখর পরিবেশে ছাত্রছাত্রীরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন, প্রয়োগ করবেন ভোটাধিকার- এমন প্রত্যাশা সবার।
 
বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। রাতেই হলে হলে পৌঁছে গেছে ব্যালট পেপার ও বাক্স। নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে ক্যাম্পাস। রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সন্ধ্যার পর পুলিশের পক্ষ থেকে বহিরাগতদের ক্যাম্পাস ত্যাগে মাইকিং করা হয়। রাত ৮টার পর ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন শিক্ষার্থীকে চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, রাস্তা ফাঁকা থাকলেও হলগুলোয় বহিরাগতরা অবস্থান করছে। প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই।

সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ভোটে অংশ নেয়া ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের শিক্ষকরাও শঙ্কা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। এদিকে শনিবার রাতে ক্যাম্পাসের কার্জন এলাকা ও উত্তরপাড়া থেকে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ পাওয়া গেছে। রোববার সন্ধ্যার পর কিছু যুবককে টিএসসি-ডাসসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে ক্রিকেটের স্টাম্প ও ব্যাট এবং লাঠিসোঁটা মজুদ করতেও দেখা গেছে।

রাতে কর্তৃপক্ষ ডাসক্যাফেটেরিয়ার পাশ থেকে শতাধিক স্টাম্প উদ্ধার করে। এছাড়া বিগত দিনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যক্রমে হতাশ বেশির ভাগ প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী। শুরু থেকেই নির্বাচনের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের রাখঢাকে তারা নাখোশ। তারা অভিযোগ করেন, কোন হলে ক’টা বুথ হচ্ছে, সেই তথ্য পর্যন্ত তাদের দেয়া হচ্ছে না। নির্বাচন কাজে সব মতের শিক্ষকদের অংশগ্রহণ রাখা হয়নি। পোলিং এজেন্টের ব্যবস্থা নেই।

স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স নেই। ফলে বাক্সে আগে থেকে ব্যালট ফেলে রাখা হচ্ছে কি না, তা দেখার ব্যবস্থাও নেই। জাল ভোট ধরার লোকও নেই। এছড়া গণমাধ্যমও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সাংবাদিকরা বুথ পর্যন্ত যেতে পারবেন না। এসব কারণে ছাত্রলীগ বাদে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন। এ শঙ্কা থেকে ভোটের আগের দিন রোববার বিকালেও বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা ভিসির কাছে ৭ দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেন।

নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠন এবং স্বতন্ত্র জোট মিলে মোট ১৩টি প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর বাইরে বিভিন্ন পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও রয়েছেন। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুসারে ডাকসুর ২৫টি পদের বিপরীতে লড়বেন ২২৯ জন প্রার্থী। এর মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ২১ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৪ এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৩ প্রার্থী। এ ছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ৯ জন, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ৯ জন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ জন, সাহিত্য সম্পাদক পদে ৮ জন, সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ১২ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১১ জন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১০ জন ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর বাইরে ১৩টি সদস্য পদের বিপরীতে লড়বেন ৮৬ প্রার্থী। এ ছাড়া ১৮টি হল সংসদে ১৩টি করে ২৩৪ পদের বিপরীতে প্রার্থী রয়েছেন ৫০৯ জন। প্রত্যেক ভোটার কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি এবং হল সংসদে ১৩টি পদে একটি করে মোট ৩৮টি ভোট দিতে পারবেন। এ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪৩ হাজার ২৫৬ জন।

৪৩ হাজার ২৫৬ জন ভোটারের ভোট গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৮টি হলে সর্বমোট ৫১১টি বুথ স্থাপন করেছে। মাত্র ছয় ঘন্টা সময়ে এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের ভোট গ্রহণ কতটা সম্ভব তা নিয়ে কয়েকজন প্রার্থী সংশয় প্রকাশ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষার্থীরা যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোট দিতে পারেন সেজন্য হলগুলোতে পর্যাপ্ত বুথের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

হলের রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানান, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ৩৫টি, শহীদুল্লাহ হলে ২০টি, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৫টি, অমর একুশে হলে ২০টি, জগন্নাথ হলে ২৫টি, জসীম উদ্দীন হলে ২০টি, মাস্টারদা সুর্যসেন হলে ৩৫টি, মুহসীন হলে ৩০টি, রোকেয়া হলে ৫০টি, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪৫টি, শামসুন্নাহার হলে ৩৫টি, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে ২০টি, কুয়েত-মৈত্রী হলে ১৯টি, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২২টি, স্যার এ এফ রহমান হলে ১৬টি, বঙ্গবন্ধু হলে ২৪টি, জিয়া হলে ২০টি ও বিজয় একাত্তর হলে ৪০টি পোলিং বুথ করা হয়েছে। তবে ভোট কেন্দ্রে কোনো প্রার্থীর পক্ষে পোলিং এজেন্ট থাকবে না বলেও জানানো হয়। প্রত্যেক বুথে হলের আবাসিক শিক্ষকদের নিয়ে পোলিং কর্মকর্তারা থাকবেন। এ বিষয়ে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমাযুন কবির বলেন, কোনো হলে পোলিং এজেন্ট থাকবে না। হলের আবাসিক শিক্ষকদের নিয়ে পোলিং কর্মকর্তা থাকবেন। তারাই বুথে প্রবেশ করতে পারবেন।

দীর্ঘদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও বিভিন্ন হল সংসদ নির্বাচন হওয়ায় গোটা দেশবাসীর নজরও এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নির্বাচন হওয়ায় নিজেদের গৌরব ও ইতিহাসের ভাগীদার মনে করছেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

যে কারণে বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা। ফলে গতানুতিক ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাধিক জোট নির্বাচনে প্যানেল দিয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, প্রচারপর্ব শেষে এখন অপেক্ষা ভোটের।

Ads
Ads