গায়েবি মামলা। আমার বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরের ঘটনা সব।’ কেন মামলা দিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জমির আইল নিয়া ঝামেলা ছিল, আর কোনো ঝামেলা তো মনে করতে পারি না। আমরা তো পার্টিও করি না।’

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ৭০ জনের দলটির সঙ্গে ছিলেন ফজল খান। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থানায় হওয়া মামলাটিতে মোট আসামি ১০৫। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে কাগজের নৌকা প্রতীক ও পোস্টার পোড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের সবাই কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কয়েকজন কোনো টাকা দেননি, বাকিরা এক থেকে তিন হাজার করে টাকা দিয়েছেন আইনজীবীর খরচ হিসেবে। প্রতি ১০ জনের এক ফাইলে আইনজীবী পাঁচ হাজার করে টাকা নিয়েছেন। আছে যাতায়াতের খরচও।

ফজল খানের হিসাবে অন্তত সাত মণ ধানের দাম বেরিয়ে গেল এক মামলার জামিন নিতে এসে। তিনি বলেন, চাষে আর লাভ হয় না। বীজ-সার-পানি দিতে কাঠাপ্রতি দুই হাজার ছয় শ টাকা খরচ হয়। এবার আমনের দরও ভালো, মণপ্রতি পাঁচ শ টাকা। এই দরে এক কাঠা জমিতে (ওই এলাকায় ১০ শতাংশে এক কাঠা) আড়াই হাজার টাকার ধান পাওয়া যায়। কাঠাপ্রতি এক শ টাকা লোকসান। তার ওপর মামলায় অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে গেল।

খেতে আটাশ ধান লাগানোর প্রস্তুতি ফেলে আসতে হয়েছে। তবে জামিনের জন্য একটি টাকাও দিতে পারেননি সবুজ মিয়া। দিনমজুর সবুজ মিয়া দলের একটু বাইরে হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনের হাঁটাপথে প্লাস্টিকের স্যান্ডেলের ওপর বসে ছিলেন। বয়স আনুমানিক ৫৫। তবে কাঁচা-পাকা চুল-দাড়িতে আরও বয়স্ক লাগে। হাতের ১০টি আঙুলই ক্ষয়ে কালো হয়ে গেছে, কয়েকটি দাঁতও নেই। কী মামলা জিজ্ঞেস করতেই ফোকলা দাঁতে হেসে সবুজ বলেন, ‘দিছে একটা! আমি কিছু বুজি না। গ্রামের লোকে কইল আসামি করছে, জামিন নিতে অইব। আমি কাইজ-কাম থুইয়া আইলাম। অন্যের বাড়িত কাম করি। আমি তো কাউরে কুনো ট্যাকাও দিতে পারি নাই।’ হাতের ক্ষয়ে যাওয়া নখ দেখিয়ে বলেন, খেত আর গোয়ালঘরে কাজ করতে করতে হাতের আঙুল ক্ষয়ে গেছে।

নেত্রকোনার দলটির মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর থানা ও বিজয়নগর, বগুড়ার সোনাতলা, নোয়াখালীর চরজব্বর থেকে আরও প্রায় তিন শ লোক এসেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার তিনটি মামলায় জামিন নিতে এসেছিলেন ১৫২ জন। তাঁদের কয়েকজন জানান, তাঁরা প্রায় সবাই বিএনপির রাজনীতি বা যাঁরা বিএনপি করেন, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনে ধানের শীষের এজেন্ট হওয়ার কথা ছিল তাঁদের। আগের দিনই থানা থেকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে এলেই গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর ভয়ে তাঁরা ভোটকেন্দ্রেও যাননি।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে আসা কৃষক রফিকুল ইসলাম, সামাদ মিয়ারা জানালেন, তাঁরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদেরও মামলায় জড়ানো হয়েছে।

" /> ভোরের পাতা

ধান বেচে জামিন নিতে ঢাকায়

  • ১৩-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
Ads

পাঁচ শ টাকা মণে আমন ধান বেচে মামলার আগাম জামিন নিতে ঢাকায় এসে ২০ টাকা প্লেট ভাত খেতে হয়েছে। তাতেই মেজাজ গরম ফজল খানের। হিসাব কষছিলেন এক জামিনে কয় মণ ধান গেল। সত্তরের কোঠায় বয়স এই কৃষকের বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। নির্বাচনের আগে নাশকতার মামলায় আসামি করা হয় তাঁকে। নির্বাচনের দিন জেনেছেন মামলার খবর।

ফজল খান বলেন, ‘সবই গায়েবি মামলা। আমার বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরের ঘটনা সব।’ কেন মামলা দিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জমির আইল নিয়া ঝামেলা ছিল, আর কোনো ঝামেলা তো মনে করতে পারি না। আমরা তো পার্টিও করি না।’

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ৭০ জনের দলটির সঙ্গে ছিলেন ফজল খান। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থানায় হওয়া মামলাটিতে মোট আসামি ১০৫। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে কাগজের নৌকা প্রতীক ও পোস্টার পোড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের সবাই কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কয়েকজন কোনো টাকা দেননি, বাকিরা এক থেকে তিন হাজার করে টাকা দিয়েছেন আইনজীবীর খরচ হিসেবে। প্রতি ১০ জনের এক ফাইলে আইনজীবী পাঁচ হাজার করে টাকা নিয়েছেন। আছে যাতায়াতের খরচও।

ফজল খানের হিসাবে অন্তত সাত মণ ধানের দাম বেরিয়ে গেল এক মামলার জামিন নিতে এসে। তিনি বলেন, চাষে আর লাভ হয় না। বীজ-সার-পানি দিতে কাঠাপ্রতি দুই হাজার ছয় শ টাকা খরচ হয়। এবার আমনের দরও ভালো, মণপ্রতি পাঁচ শ টাকা। এই দরে এক কাঠা জমিতে (ওই এলাকায় ১০ শতাংশে এক কাঠা) আড়াই হাজার টাকার ধান পাওয়া যায়। কাঠাপ্রতি এক শ টাকা লোকসান। তার ওপর মামলায় অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে গেল।

খেতে আটাশ ধান লাগানোর প্রস্তুতি ফেলে আসতে হয়েছে। তবে জামিনের জন্য একটি টাকাও দিতে পারেননি সবুজ মিয়া। দিনমজুর সবুজ মিয়া দলের একটু বাইরে হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনের হাঁটাপথে প্লাস্টিকের স্যান্ডেলের ওপর বসে ছিলেন। বয়স আনুমানিক ৫৫। তবে কাঁচা-পাকা চুল-দাড়িতে আরও বয়স্ক লাগে। হাতের ১০টি আঙুলই ক্ষয়ে কালো হয়ে গেছে, কয়েকটি দাঁতও নেই। কী মামলা জিজ্ঞেস করতেই ফোকলা দাঁতে হেসে সবুজ বলেন, ‘দিছে একটা! আমি কিছু বুজি না। গ্রামের লোকে কইল আসামি করছে, জামিন নিতে অইব। আমি কাইজ-কাম থুইয়া আইলাম। অন্যের বাড়িত কাম করি। আমি তো কাউরে কুনো ট্যাকাও দিতে পারি নাই।’ হাতের ক্ষয়ে যাওয়া নখ দেখিয়ে বলেন, খেত আর গোয়ালঘরে কাজ করতে করতে হাতের আঙুল ক্ষয়ে গেছে।

নেত্রকোনার দলটির মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর থানা ও বিজয়নগর, বগুড়ার সোনাতলা, নোয়াখালীর চরজব্বর থেকে আরও প্রায় তিন শ লোক এসেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার তিনটি মামলায় জামিন নিতে এসেছিলেন ১৫২ জন। তাঁদের কয়েকজন জানান, তাঁরা প্রায় সবাই বিএনপির রাজনীতি বা যাঁরা বিএনপি করেন, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনে ধানের শীষের এজেন্ট হওয়ার কথা ছিল তাঁদের। আগের দিনই থানা থেকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে এলেই গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর ভয়ে তাঁরা ভোটকেন্দ্রেও যাননি।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে আসা কৃষক রফিকুল ইসলাম, সামাদ মিয়ারা জানালেন, তাঁরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদেরও মামলায় জড়ানো হয়েছে।

Ads
Ads