উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাবে হাজারীবাগ, বললেন নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল 

  • ৭-ফেব্রুয়ারী-২০১৯ ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

আরবান রিডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা নগর পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বদলে দেয়া হবে ঢাকার অন্যতম দূষিত এলাকা হাজারীবাগকে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত বিশ্বের উদাহরণ কাজে লাগানো হবে। গতকাল বুধবার ভোরের পাতার সঙ্গে একান্ত আলাপে হাজারীবাগ নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (রাজউক) এর  বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কথা জানালেন এ প্রকল্পের পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ মোঃ আশরাফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে হাজারীবাগ এলাকার দূষিত মাটি সাধারণ জনবসতি এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে। যাতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি না হয়। ট্যানারি শিল্পে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের কারণে এই এলাকার মাটি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। এক সময় ওই এলাকার ট্যানারি শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে মাটিতে মিশেছে ক্রোমিয়াম, লিড, ও আর্সেনিকের মতো ভারী ও বিষাক্ত ধাতু। অবস্থানভেদে মাটির গভীরে এ দূষণের মাত্রা ৮ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। এতে উক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। দূষিত মাটিতে গাছপালার পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণ ও হুমকির মুখে। এই অবস্থার উন্নয়নে হাজারীবাগ এলাকাকে রিডেভেলপমেন্ট ফর্মুলায় বদলে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনায় হাজারীবাগ এলাকার মাটি সরিয়ে নতুন মাটি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি দুষিত মাটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে সরিয়ে ফেলা হবে। 

তিনি আরও বলেন,  হাজারীবাগে দেশের সবচেয়ে বড় ট্যানারি এলাকা হওয়া সত্বেও এতে কোনো ইটিপি বা সিইটিপি স্থাপনা করা হয়নি। যে কারণে ট্যানারিগুলো থেকে নির্গত দূষিত পানি ও রাসায়নিক বর্জ্য খোলা ড্রেনের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়তো। এর ফলে এলাকার মাটি পানি ও বায়ু দূষিত হয়ে পড়েছিল। তথ্যমতে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে প্রতিদিন ৭৫ টন কঠিন বর্জ্য ও ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য কোনোরূপ পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি খোলা ড্রেন দিয়ে মাটি, পানি ও নদীতে গিয়ে পড়ত। এতে পুরো এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। 

প্রকল্প  পরিচালক বলেন, নতুন করে ভূমি শোধন প্রক্রিয়ায় কমবে মাটি ও পানির বিষাক্ততা। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্জ্যরে সঙ্গে মাটিতে গিয়ে মেশা ক্রোমিয়াম ধাতু মাটি ও পরিবেশের জন্য একটি ধীরগতির বিষ। যা কখনো ধ্বংস হয় না বরং ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর করা হলেও হাজারীবাগের মাটি ও পানিতে ক্রোমিয়াম থেকে গেছে। ফলে এর দ্বারা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

রিডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় হাজারীবাগের ৮ ফুট থেকে ১০ ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে বিশুদ্ধ মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে। যাতে দূষিত মাটি নতুন প্রকল্প এলাকা ও ভূ-গর্ভস্থ পানির ক্ষতি করতে না পারে। এ জন্য এলাকার স্থানীয় ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভূমি মালিকরা ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছেন। হাজারীবাগের উন্নয়নের জন্য তিনটি পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে যেমন- ভূমি মালিক সমিতির নিজস্ব উদ্যোগ, ভূমি মালিক সমিতির সঙ্গে ডেভেলপার কোম্পানির চুক্তি ও ভূমি মালিক সমিতির সঙ্গে রাজউকের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে। ভূমি মালিকগণ যেকোনো একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে হাজারীবাগের উন্নয়ন করতে পারবে।  প্রকল্পটি দেশি/বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। 

হাজারীবাগ রিডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অনুযায়ী সবুজ প্রকৃতি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, মিশ্র ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পভুক্ত এলাকায় বিদ্যমান ৮৭৪টি ভবন, ভেঙ্গে পুরো এলাকায় বহুতল ভবনসহ আবাসিক-অনাবাসিক ভবন নির্মাণ, মসজিদ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, ট্যানারি ক্লিনিক লাইব্রেরি, হাসপাতাল, কাঁচাবাজার, প্রাথমিক-মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং সেন্টার ও ক্লাব স্থাপন এবং লেক এবং লেকের পাশ দিয়ে হাঁটার পথ ও পাবলিক স্পেস রাখার ব্যবস্থা করা হবে। ভূমি উন্নয়নের পর হাজারীবাগ এলাকায় প্রস্তাবিত বহুতল ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৬ (ছয়) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

এছাড়াও ভবনের উপর বৃষ্টির পানি ধারণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা, লেক ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে পার্ক নির্মাণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাইমারী শেল্টার হিসেবে  খোলা জায়গা রাখা ও বায়ুশোধনের জন্য উপযোগী গাছ লাগানো হবে। প্রকল্প এলাকায় একটি মাল্টি পারপাস কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যাতে একই ভবনে নাগরিকরা কাউন্সিলর অফিস, ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার ও সুইমিংপুলসহ অন্যান্য সুবিধা পাবে। এলাকার অভ্যন্তরে পথচারী বান্ধব ফুটপাত তৈরি করারও পরিকল্পনা রয়েছে।  

হাজারীবাগের উন্নয়নের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বিস্তারিত নকশা তৈরি করা হবে বলে জানিয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, এই নকশায় বিশেষজ্ঞ ও ট্যানারি মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতের প্রতিফলন থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভূমি মালিকরা বর্তমান সম্পত্তির সমমূল্যের আবাসিক বা বাণিজ্যিক স্পেস পাবেন। এছাড়া কমিউনিটি স্পেসগুলো সমন্বিত মালিকানা ও ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে এসোসিয়েশন দ্বারা ব্যবস্থাপনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। রিডেভেলপমেন্ট ফর্মুলায় হাজারীবাগের উন্নয়ন ঘটলে জমির বিদ্যমান মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং একটি পরিকল্পিত কমিউনিটি বেইজড মিশ্র এলাকা গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। 

Ads
Ads