নির্ধারিত স্থান ছাড়াই গুনতে হচ্ছে দিগুণ ভাড়া

  • ৩০-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

** গণপরিবহন চলছে ফের আগের মতোই
** ভোগান্তি সয়ে এখনো ফিরছে রাজধানীবাসী 

রাজধানীতে গণপরিবহনের ড্রাইভার-হেলপাররা নিজেদের ইচ্ছেমতোই যেখানে খুশি সেখানে গাড়ি থামিয়ে দিগুণ ভাড়া আদায় করছে যাত্রীদের কাজ থেকে। এভাবে যাত্রীদের সকল গণপরিবহনে ‘জিম্মি’ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সরকারের নির্ধারিত ভাড়া তোয়াক্কা না করে নিজেদের মনমতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। দেখা যায়, গুলিস্তান থেকে ফার্মগেট একাধিক পরিবহন কিমি. অনুযায়ী দশ টাকা ভাড়া নিলেও যাত্রাবাড়ী টু মিরপুর শিকড় পরিবহন নিচ্ছে প্রেসক্লাবের পর থেকে যেখানেই যাত্রী নামুক না কেন পঁচিশ টাকা ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। ফুলবাড়িয়া থেকে আগত বিভিন্ন পরিবহন হাইকোর্ট, শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট যেখানেই নামুক না কেন যাত্রীদের দশ টাকাই দিতে হবে চালককে। এতে করে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়ে যায় চালক-হেলপারদের সাথে।

রাজধানীতে চলাচলকারী ‘শিকড়’ পরিবহন চালক মো. ইসমাইল হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ভাই আমাদের কিছু করার নেই। মালিক আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিবেন আমাদের সেভাবেই চলা ছাড়া কোনো গতি নেই। আমাদের যেসব সুপারভাইজার দেখেন এরা সব হইছে টাকার পাগল। হাতেগোনা সামান্য কিছু সুপারভাইজার দিয়ে আমাদের চলাচলের রোড নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাছাড়া আর কিছুই না। আমরাও চাই সকল পরিবহনের একটি নির্ধারিত কিছু করে দেওয়া হোক; আমরা যেন অন্যদের মতো একটি নির্দিষ্ট বেতন পাই। আমাদের পরিবার নিয়ে তিনবেলা খেয়ে বাঁচতে পারি। তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সুপারভাইজারদের’ যাত্রীরা বাসে উঠলেই দেখেন সিটিং হওয়ার পরও বেশি যাত্রী। তিনি বলেন, প্রতিটি পয়েন্টে আমাদের ১০-২০ টাকা করে সুপারভাইজাদের দিতে হয়। নাহলে তারা ইচ্ছে করে ওয়েভিলে বেশি যাত্রী লিখে দেয়। তাই আমরাও বাধ্য হয়ে বেশি লোক তুলি বলে জানান তিনি।

খাজাবাবা পরিবহনের চালক-হেলপারের সাথে কথা হলে তারা জানান আমরা গাড়ি প্রতিদিন চুক্তিতে নেই। আমরা গাড়ি  নেওয়ার পর যদি আমাদের মামলা, রেকার, ডাম্পিং হয় তাহলে এসব মালিক বহন করে । এখন আমরা যত যাত্রীই নেই না কেন এটা আমাদের বিষয়। তা নাহলে তো আমাদের পোষাবে না। তিনি আরো বলেন, রাজধানীতে ‘সিটিং’ বলতে কোনো গাড়িই নেই- সব পরিবহন চলে কারো না কারো নামে। আপনি যেই পরিবহন জিজ্ঞাসা করবেন শুনবেন সেখানে কোনো না কোনো বিশিষ্ট নেতা, পুলিশ জড়িত আছে। তাহলে কার গাড়িটি কে ধরবে। আর ধরলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে ফোন শুনতে পাওয়া যায়, ‘জি স্যার, জি স্যার দেখছি,’ বলে ছেড়ে দেন। নামেমাত্র অধিকাংশ পরিবহন কিছু সুপারভাইজার রেখে ‘সিটিং’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয় পরিবহন- এটাই হচ্ছে আমাদের রাজধানীর গণপরিবহন চিত্র।

এই বিষয়ে গণপরিবহনের যাত্রীরা বলছে, আমরা তো তাদের হাতে জিম্মি। তাদের ইশারায় আমাদের চলতে হয়। হাসান নামে এক যাত্রী বলেন, প্রেসক্লাস থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহনে উঠেছি। যাবো শহবাগ। আমার কাছ থেকে দশ টাকা ভাড়া আদায় করা হলো। এই পর্যন্ত রোডের ভাড়া কি দশ টাকা বলেন? 

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর গণপরিবহনে এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি। সব চলছে সেই আগের তালেই। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনারও তোয়াক্কা করছে না মালিক-শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বাসের ভেতরে চালকের ছবিসহ নাম, মোবাইল নম্বর ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি কোনো গণপরিবহনের ভেতরে দেখা যায়নি। যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করানও বন্ধ হয়নি। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ছাড়ার পর কেউ গেট বন্ধ রাখছে না। সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে পরিবহন মালিকরা মুখ খুলছেন না। টেলিফোনে জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট কেউই। অবশ্য সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরও সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন সচেতনতা আসেনি। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এক মাসের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। 

ঢাকার রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যারেটরি, শাহবাগ, পল্টন ও গুলিস্তান এলাকায় বিভিন্ন রুটের গণপরিবহনের কোনো বাস বা মিনিবাসের ভেতরে চালকদের সামনে তাদের ছবি, নাম, মোবাইল নম্বর ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি লাগানো দেখা যায়নি। অনেক বাসচালক বলছেন, তারা নতুন নিয়মের ব্যাপারে জানেন না। আবার অনেকে বলেছেন, মালিকরাও এ ব্যাপারে তাদের কিছু জানায়নি। মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তানগামী সব পরিবহনকে রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ করে বাস থামিয়ে যাত্রীদের ওঠানামা করাতে দেখা গেছে। ফার্মগেট থেকে শিশুপার্কের সামনে পর্যন্ত সড়কেও দেখা গেছে, চালকরা তাদের ইচ্ছেমতো যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। 

শাহবাগে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে যাত্রী ওঠানামা করালেও ট্রাফিক পুলিশকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। সবচেয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থা ফার্মগেট, পল্টন মোড়, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, গোলাপশাহ মাজার এলাকায়। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, রাস্তার মাঝখানে বাস থামানোসহ গণপরিবহনের সবকিছু আগের মতোই অরাজক অবস্থায় চলছে। একটুও বদলায়নি। কোনো পরিবহন চালককেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতে দেখা যায়নি।

মোহাম্মদপুর-নতুনবাজার ও উত্তরা-গুলিস্তান রুটের বিআরটিসি বাসের চালকরাও সরকারের নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করছে না। অন্যান্য পাবলিক বাসের মতো বিআরটিসি বাসের গেটও বন্ধ করা হয় না। গেট বন্ধ না থাকার কারণে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রীরা এখনো ওঠানামা করছেন।

এদিকে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন শেষে আবার কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন রাজধানীবাসী। ফেরার সময় পথে তাদের পোহাতে হচ্ছে নানা ভোগান্তি। বাসগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকায় পৌঁছানো যাত্রীসাধারণ। লঞ্চ আর ট্রেনের টিকিট পাওয়াও ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর যারা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে বাসে ঢাকা ফিরেছেন, ফেরিঘাটে তাদের পড়তে হয়েছে মহাযন্ত্রণায়। ফিরে আসা যাত্রীরা জানাচ্ছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। দুটি ফেরিঘাটের কাঁঠালবাড়ী ও দৌলতদিয়া পয়েন্টে শত শত যানবাহন ফেরির অপেক্ষায় আটকে ছিল। এ সময় নারী ও শিশুদের সহ্য করতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়, ফেরিঘাটের সমস্যা এবং পথের যানজটের কারণে কেউই যথা সময়ে রাজধানীতে ফিরতে পারেননি। দূরপাল্লার যেসব ট্রেন, লঞ্চ, বাস ঢাকায় পৌঁছেছে, সবগুলোতেই ছিল উপচেপড়া ভিড়। যাত্রীদের চোখেমুখে ছিল ক্লান্তি ও বিরক্তির ছাপ। 

গতকাল বুধবার রাজধানীর বাসটার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চটার্মিনালগুলোতে দেখা গেছে ফিরে আসা মানুষের ভিড়। নৌপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা লঞ্চের সবগুলোই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। কেবিন পাওয়া ছিল দুঃসাধ্য। লঞ্চগুলো দ্রুত যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আবার সদরঘাট টার্মিনাল ছেড়ে যায়। ভোর থেকেই টার্মিনালে ছিল প্রচ- ভিড়। সিএনজি অটোরিকশা ও গণপরিবহনের সংকট থাকায় যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। গণপরিবহন ও সিএনজি অটোরিকশাগুলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে যাত্রীদের কাছ থেকে।বরিশাল থেকে গতকাল ভোরে ঢাকায় ফেরা রফিকুল জানান, অনেক কষ্টে সুরভী লঞ্চে তিনি একটি কেবিন পান। সেটার ভাড়া ১২০০ টাকা, কিন্তু তাকে গুনতে হয়েছে দুই হাজার টাকা। কেবিনের সামনে তিনি দেখেছেন, যাত্রীরা কাঁথা-বালিশ নিয়ে শুয়ে আছেন।

বিআইডব্লিটিএর পরিবহন পরিদর্শক (টিআই) এবিএম মাহমুদ জানান, দক্ষিণাঞ্চল থেকে ৮৫টি লঞ্চ গতকাল সকালে সদরঘাটে ভেড়ে। এসব লঞ্চযাত্রীদের প্রায় সবাই যার যার কর্মস্থলে যোগদান করার জন্যই আসছে বলে জানান।এদিকে গতকাল মঙ্গলবারও কমলাপুর রেলস্টেশনে যেসব ট্রেন পৌঁছে তার সবগুলোই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। সারা দিনে ৬০টি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত যেগুলো পৌঁছায়, সেগুলোর প্রায় সবকটিই দেরিতে পৌঁছে। যদিও যাত্রীর কমতি ছিল না। কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী জানান, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ট্রেনগুলো বিভিন্ন গন্তব্য থেকে ছাড়তে দেরি হয়েছে। সকাল ১১টা পর্যন্ত ১৫টি ট্রেন ঢাকা পৌঁছায় বলে জানান তিনি।মাগুরা থেকে আসা ঢাকার যাত্রী আসিফ হোসেন জানান, তিনি জেআর পরিবহনের এসি বাসে টিকিট কেটেছিলেন। রাত ১১টায় বাস পান। সাধারণত ভোরেই ঢাকায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু  তিনি ফেরিই পান সকাল ১০টায়। ঢাকায় পৌঁছাতে তার দুপুর হয়ে যায়। 

ঢাকার গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির নেতা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, গত কয়েকদিন দৌলতদিয়া ঘাটে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে কোনো গাড়িই ঠিক সময়ে ঢাকায় পৌঁছতে পারেনি। ফলে গাড়িগুলো ফিরতেও পারছে না সময়মতো। এতে বাসের সিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। কিন্তু সোমবার থেকে স্বাভাবিক হয়েছে কিছুটা । আর যে সব পরিবহন বেশি টাকা নিবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান। গাবতলীর হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের কর্মী ইশারফ জানান, এখনো বিভিন্ন রুটের সমস্যা ঠিক হয় নেই। তাই যে সংখ্যক বাস এখনো ভোরে গাবতলীতে পৌঁছানোর কথা, তার এক-চতুর্থাংশ বাস টার্মিনালে পৌঁছে।

এসপি গোল্ডেন লাইন পরিবহনের চালক হাফিজুর রহমান জানান, ঘাটে জটের কারণে খুবই বাজে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক যাত্রী জ্যামের সময় গাড়ি থেকে নেমে লঞ্চে পার হয়ে ঢাকায় ফিরেছেন। এ ছাড়া অন্য রুট দিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসা যাত্রীরা কয়েকটি স্থানে যানজটে পড়লেও মোটামুটি স্বস্তিতেই রাজধানীতে ফিরেছেন। 


 

Ads
Ads