এই খুশির দিনগুলোতেও হাজারো দুঃখ হৃদয়ে নিয়েই তাদের ঈদ উদযাপন

  • ২৫-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত অধিকাংশ বৃদ্ধের চোখের পাতায় মোটা রেখা স্পষ্ট। মাথায় উশখো পাকা চুল। একটু চলাফেরা করলেই বয়সের ভাড়ে হাঁপিয়ে ওঠেন তারা। তবুও প্রতিদিন হেঁটে বৃদ্ধাশ্রমের প্রধান ফটকে কখনো আলতো কখনো পিঠ ঠেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। যদি একটু খানি দেখা মেলে আদরের খোকাদের।

আশাভঙ্গের যন্ত্রণা আর হারানো দিনের সুখস্মৃতি বয়ে বেড়ানো মা-বাবারা প্রতিদিনই বৃদ্ধাশ্রমের গেটে দাড়িয়ে থাকেন প্রিয় সন্তানের আসার অপেক্ষায়। কিন্তু সন্তানদের আশায় পথ চেয়ে থাকা এসব দুখীনি মা-বাবার অপেক্ষার অবসান হয় না কোনদিন। সন্তানরা ভুলে যায়, কিন্তু আদরের খোকাদের ভোলেন না তারা। তাই নিয়তি তাদের কাঁদায় প্রতিনিয়ত। এমনকি ঈদের আনন্দের দিনেও কাঁদেন তারা।

একপর্যায়ে ধৈর্য্য হারিয়ে তারা ফিরে যান শেষ ঠিকানা বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রমে। আবার আশা নিয়ে ছুঁটে যান প্রধান ফটকে। আশা ভঙ্গের এমন নিস্ফল চেষ্টা চলে দিনে কয়েকবার। এভাবেই স্বজনদের প্রতীক্ষায় সন্ধ্যা নেমে আসার পর চোখের জ্বল ফেলে ফিরে আসেন বৃদ্ধাশ্রমের আশ্রিত কক্ষে। কাঁদতে কাঁদতে একসময় তারা ঘুমিয়ে পড়েন। বৃদ্ধাশ্রমের মনের অশান্তি নিয়ে বসবাসকারী একাত্তর বছর বয়সী ছামিলা বেওয়া, বৃদ্ধা আমিরুন নেছা, মজিরন বেওয়া, সুফিয়া বেগমসহ অনেকেই।

তারা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা এখন বাতিলের খাতায়। আমাগো নিয়ে সন্তানদের ভাববার সময় নেই। সারাদিন তারা ব্যস্ত থাকে। তাই গত কয়েক ঈদের দিনেও তারা আমাদের খোঁজ নিতে আসতে পারেনি। ওই আশ্রমের সত্তর বছরের আরেক বৃদ্ধা কদবানু বেওয়া তার অতীতের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন সন্তানদের মুখে দু’মোঠো ভাত তুলে দিতে কত কষ্ট করেছি নানা দুর্ভিক্ষ, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা সংকটের মুহুর্তেও সন্তানদের আগলে রেখেছি। এমনও হয়েছে দু’দিন ধরে নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাইয়েছি। ঝড় ঝাপটায় বুকে আগলে রেখেছি তাদের।

কিন্তু আজ সন্তানরা বড় হয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে একে একে সবাই যে যার মতো করে থাকতে শুরু করে। ওদের সাথে আমাকে রাখা বোঝা মনে হয়। তাই নিজের ইচ্ছায় একদিন চলে আসি বৃদ্ধাশ্রমে। প্রায় দেড় বছর ধরে এখানে আছি।

এখানে আসার পর থেকে ঈদের দিন তাকে কেউ দেখতে আসেনি এটাই তার বড় দুঃখ। অন্তত ঈদের দিন ছেলে-মেয়ে ও নাতীদের দেখা পাওয়ার আশায় কোনমতে হেঁটে গেটের সামনে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। একসময় অধৈর্য্য হয়ে চলে আসেন। ঘণ্টাখানেক পর আবার দেখা পাবার আশায় গেটের সামনে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ান। সন্ধ্যা নেমে গেলেও পরিচিত কাউকে না দেখে চোখের পানি ফেলে রুমে চলে আসেন। মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে মাঝেমধ্যে কাঁদেন। কক্ষে গিয়ে নিজেকে বোঝান, হয়তো ব্যস্ততার কারনে কেউ আসতে পারেনি, কাল আসবে। এমন কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে যান টেরও পান না।

সন্তান ও নাতীদের নিয়ে একসাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে এখনও খুব ইচ্ছা হয় তার। ঈদে প্রায় সকল বাবা-মা সন্তানের অথবা স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করেছেন। কিন্তু গোবিন্দগঞ্জের বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থান করা বেশিরভাগ বৃদ্ধরাই ঈদের দিন কাটিয়েছেন সন্তান কিংবা স্বজনদের প্রতীক্ষায়। বরাবরের মতো এবারও ঈদে তারা নতুন কাপড় পেয়েছেন, খেয়েছেন ভালো খাবার। এখানে অচেনা তরুণরা দিয়েছে সন্তানের আদর। কিন্ত অধিকাংশই আত্মীয়-স্বজন বা গর্ভে ধারণ করা সন্তানটির দেখা পাননি। অধীর আগ্রহে দিনভর প্রহর গুনেছেন- হয়তো কেউ তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। কিন্তু দিন শেষেও কারো সাক্ষাৎ মেলেনি।

বৃদ্ধাশ্রমের অপর এক বৃদ্ধ ইদ্রিস আলী ঈদের নামায আদায় করে ফেরার সময় অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি।তার বুক জুড়ে রাজ্যের দুঃখ। মনে পড়ে সুখের সেই দিনগুলোর কথা। যখন তার সন্তান খুব ছোট, ওই সময় সন্তানকে কোলে-কাঁধে করে ঈদগাহে নিয়ে যেতেন। নামায পড়তেন সঙ্গে নিয়ে। আজ সেই আদরের ছেলে জীবিত থেকেও কাছে নেই।

বৃদ্ধা সেবা বৃদ্ধাশ্রমটি স্থানীয় কয়েকজন কলেজ পড়ুয়া তরুণের উদ্যেগে গড়ে ওঠে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার গোবিন্দগঞ্জ-নাকাইহাট সড়কের পার্শ্বে বোয়ালীয়া (শিববাড়ী) গ্রামে।

এ বৃদ্ধাশ্রমের উদ্যোক্তারা জানায় এখনো মাঝে মধ্যে অনেক বৃদ্ধা এখানে আশ্রয় নিতে আসেন অনেকে, তবে আমরা তাদের বাধ্য হয়ে ফিরে দিতে হয়। কারণ এখন এ বৃদ্ধাশ্রমে ১৯ জন নারী পুরুষ আছে তাদের পরিচালনা করতেই আমরা আর্থিক সংকটে পড়ছি।

প্রতি মাসে এসব অসহায় মানুষদের খাওয়ার জন্য চাল লাগে সাড়ে ১১ হাজার টাকার, ওষুধ সাত হাজার টাকার, রান্নার জন্য লাকড়ি লাগে এক হাজার ৮০০ টাকার, বৃদ্ধাশ্রমের বাসা ভাড়া ছয় হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল এক হাজার টাকা ও কাঁচা বাজারসহ অন্যান্য উপকরণ বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা।

এছাড়া তাদের খাবার রান্না করা, যত্ন নেয়া ও পড়ানোর জন্য রয়েছেন তিনজন মহিলা ও নাইটগার্ড রয়েছেন একজন। তাদেরকে প্রতিমাসে দিতে হয় ১০ হাজার ২’শ টাকা। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আসে বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটি থেকে ও বাকি টাকা আসে বিভিন্ন মানুষের সাহায্য নিয়ে। এদের মধ্যে সাতজন রয়েছেন উপদেষ্টা কমিটিতে। এ ছাড়া ৩০ জন রয়েছেন যারা বৃদ্ধাশ্রমে প্রতিমাসে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন। এসব অসহায় মানুষদের ভালোভাবে জীবন-যাপনের জন্য প্রতিমাসে প্রয়োজন হয় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা।

কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। প্রতিদিন অসহায় মানুষরা আসেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকার জন্য। কিন্তু টাকার অভাবে তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে দিতে পারছেন না বলে জানান বৃদ্ধ সেবা বৃদ্ধাশ্রমের উদ্যোক্তা ও সভাপতি আপেল মাহমুদ। তবে সরকারী সহযোগীতা ও সমাজের বৃত্তবানরা এগিয়ে এলে আমাদের এ বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনা করতে সহজবোধ্য হবে।

Ads
Ads