জনতা ব্যাংক ডোবানোর কারিগর আমিনুর রহমান 

  • ১৯-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ::

বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারিতে ২০১২ সালে ভিত নড়ে গিয়েছিল জনতা ব্যাংকের। চলতি বছরের শুরুতে ঝড় উঠেছিল এননটেক্স গ্রুপের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি নিয়ে। তারপর উদঘাটিত হলো ব্যাংকটির ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের ৪ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি। এর বাইরেও গত এক দশকে ছোট-বড় নানা জালিয়াতির ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়েছে জনগণের অর্থে পরিচালিত ব্যাংকটি। লাগামহীন লুটপাটের কারণে বেসিক ব্যাংকের মতোই ডুবতে বসেছে জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির লুটপাট শুরু হয়েছিল সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম আমিনুর রহমানের হাত ধরে। ২০০৮ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। নতুন করে খেলাপির ঝুঁকিতে আছে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক এমডি এস এম আমিনুর রহমানের অপকীর্তিই জনতা ব্যাংককে ডুবিয়েছে। তার সময়ে বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ, এননটেক্স, ক্রিসেন্টসহ জনতা ব্যাংকের সব বৃহৎ ঋণ কেলেঙ্কারি আমিনুর রহমানের হাতে সংঘটিত হয়েছে। টানা ৭ বছর ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার দায়িত্ব পালনের সময়টিই ব্যাংকটির অন্ধকার যুগের সূচনা করেছে। এস এম আমিনুর রহমানই হলেন জনতা ব্যাংক লুটের ‘মাস্টারমাইন্ড’।

সূত্র বলছে, জনতা ব্যাংকের আজকের পরিস্থিতির শুরুটা ছিল বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি দিয়ে। সরকারি-বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন বিসমিল্লাহ গ্রুপের কর্ণধাররা।

২০১১ ও ২০১২ সালে সংঘটিত এ কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে ধরা পড়ে ২০১৩ সালে। তার আগেই নিরুদ্দেশ হন বিসমিল্লাহ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী ও চেয়ারম্যান নওরীন হাসিব। এর পর থেকেই তাদের ব্যাপারে কোনো খোঁজ নেই ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর কাছে।
বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল পাঁচ ব্যাংক জনতা, প্রাইম, যমুনা, প্রিমিয়ার ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু এ কেলেঙ্কারির সূচনা হয়েছিল জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি এস এম আমিনুর রহমানের হাত ধরেই এ কেলেঙ্কারির সূত্রপাত হয়। মূলত বড় কমিশনের বিনিময়ে বিসমিল্লাহ গ্রুপকে  ঋণ দিয়েছিলেন আমিনুর রহমান। গ্রুপটির কেলেঙ্কারির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তিনি। দুদকের অনুসন্ধানে বিষয়টি ধরা পড়লেও অজ্ঞাত কারণে পরবর্তীতে ধামাচাপা পড়ে যায়।

বিসমিল্লাহ গ্রুপ সবচেয়ে বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে। ব্যাংকটির করপোরেট শাখা, মগবাজার শাখা ও এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে নামসর্বস্ব চারটি কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ৬৭৮ কোটি ৪৪ লাখ ও নন-ফান্ডেড ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গ্রুপটির কোম্পানি এমএস হিন্দোল ওয়ালি টেক্সটাইল মিলসের নামে ১৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, শেহরিন টেক্সটাইল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নামে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ, শাহরিজ কম্পোজিট টাওয়েলের নামে ২৯৮ কোটি ৩ লাখ ও আলফা কম্পোজিটের নামে ১৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের এ কেলেঙ্কারি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বরে বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডি ও চেয়ারম্যানসহ ৫৪ জনকে আসামি করে ১২টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে গ্রুপটির এমডি, চেয়ারম্যানসহ ১৩ জনকে সবকটি মামলার আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে অন্য ৪১ জন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন জনতা ব্যাংকের তিন শাখার ১২ জন, প্রাইমের নয়জন, প্রিমিয়ারের সাতজন, যমুনার পাঁচজন ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের আটজন ব্যাংকার। কিন্তু বেঁচে যান জনতা ব্যাংক এমডি আমিনুর রহমান।

বিসমিল্লাহ গ্রুপের চেয়েও পাঁচগুণ বড় কেলেঙ্কারির জš§ দিয়েছে এননটেক্স গ্রুপ। এস এম আমিনুর রহমানের মেয়াদেই জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন গ্রুপটির কর্ণধার মো. ইউনুছ বাদল। ২০০৭ সালে গাড়ি চোর চক্রের হোতা হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া ইউনুছ বাদলকে রাতারাতি বিশিষ্ট শিল্পপতি বানিয়ে দিয়েছে আমিনুর রহমান। 

জুভেনিল সোয়েটার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসায় নামেন ইউনুস বাদল। ২০০৪ সালে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি ব্যাংকিং সুবিধা নেওয়া শুরু করে। ওই শাখার বেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। তখন পর্যন্ত ইউনুস বাদলের যাত্রা ছিল খুবই সীমিত পরিসরে। ২০১০ সালে এসে ভাগ্যের দুয়ার খুলে যায় তার। সে বছরের ২৫ আগস্ট গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডের নামে ৮০ কোটি টাকা ঋণ পান তিনি। এরপর শুধুই বাড়তে থাকে তার ঋণের পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ঋণের অর্থ উপযুক্ত খাতে ব্যয় না করে অন্যত্র স্থানান্তরের অভিযোগও আছে ইউনুস বাদলের বিরুদ্ধে।

২০১৫ সাল শেষে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৯ কোটি টাকায়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেওয়া দেশের শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৭৫ নম্বরে রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। 

২০১০ সালে ৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরের বছরই জনতা ব্যাংক থেকে ৫৭১ কোটি টাকা বের করেছেন ইউনুস বাদল। এরপর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে ২০১২ সালে ৮১৬ কোটি, ২০১৩ সালে ১ হাজার ১৯৯ কোটি, ২০১৪ সালে ৫৬০ কোটি ও ২০১৫ সালে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন তিনি। ইউনুস বাদলের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২০১১ সালে সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে জনতা ব্যাংকের এমডি এস এম আমিনুর রহমান। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১২-১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে দেওয়া হয় ১৫১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সকে ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভি নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি ও সপ্রভ স্পিনিংকে ৪৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেভেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেওয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। এভাবে মাত্র ৭ বছরের ব্যবধানে এননটেক্স গ্রুপকে ৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা বের করে দিয়েছেন জনতা ব্যাংকের তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমান। বিতরণকৃত এ ঋণ থেকে তিনি বড় অংকের কমিশন নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ আছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এননটেক্স গ্রুপের কাছ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। সোনালী ব্যাংকের হলমার্কের মতোই জনতা ব্যাংকের জন্য এননটেক্স গলার কাঁটা হিসেবে আটকেছে। শুধু বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলঙ্কারি কিংবা এননটেক্সই নয়, বরং জনতা ব্যাংকের ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যার কেলেঙ্কারিতেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন সাবেক এমডি আমিনুর রহমান। অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে যে ১০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যে স্থান পেয়েছে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী দুই প্রতিষ্ঠান রিমেক্স ফুটওয়্যার ও ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টস লিমিটেড। এর কর্ণধার দুই সহোদর এমএ আজিজ ও এমএ কাদের। ঋণের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে তারা বের করে নিয়েছেন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এ দুই সহোদর এখন জনতা ব্যাংকেরও শীর্ষ ঋণখেলাপি। রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান এমএ আজিজ। চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ারও চেয়ারম্যান তিনি।

প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার এ কেলেঙ্কারিও শুরু হয়েছিল তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমানের হাত ধরে। এছাড়া ২০১৫ সালে জনতা ব্যাংকের দুটি শাখায় হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১১টি প্রতিষ্ঠান এ জালিয়াতি করে। এর মধ্যে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ৬৫৫ কোটি এবং স্থানীয় কার্যালয় শাখায় ২৬৬ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়। ২০১১ থেকে পরবর্তী তিন বছরে এ কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত জামানতও নেই। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জামানতের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানোর মাধ্যমেও গ্রাহককে বেশি ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন শাখার কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ঋণকেলেঙ্কারির সঙ্গেও তৎকালীন এমডি আমিনুর রহমান যুক্ত ছিলেন।

জনতা ব্যাংকের তথ্য মতে, এস এম আমিনুর রহমান জনতা ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব গ্রহণের সময় ২০০৮ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু ৭ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৪ সালে তিনি ব্যাংকটির ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রেখে যান। আমিনুর রহমানের বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। তার দায়িত্ব পালনের সময়ই ২০১২ সালে রেকর্ড ১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা লোকসান গুনে জনতা ব্যাংক।
এ বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করেও এস এম আমিনুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

Ads
Ads