আ: লীগার সেজে সরকারের শত শত কোটি লোপাট করছেন জামাতি রফিক

  • ২০-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: উৎপল দাস ::

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) স্থায়ী সদর দপ্তর নির্মাণে গৃহীত র‌্যাব ফোর্সেস সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে গনপূর্ত অধিদফতর। রাজধানীর আশকোনায় বাস্কবায়নাধীন এই প্রকল্পটির আওতায় ১৪ তলার ভিতসহ ১৩ তলাবিশিষ্ট অফিস ভবন নির্মাণ ও ১২ তলার ভিতসহ ১২ তলাবিশিষ্ট ব্যাচেলর অফিসার্স কোয়ার্টার নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ১০ তলাবিশিষ্ট ফোর্স ব্যারাক,  ৮ তলাবিশিষ্ট এমটি শেড কাম উপ-পরিচালক মেস নির্মাণ, ১০ তলাবিশিষ্ট আবাসিক কোয়াটার ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা করা এই প্রকল্পটির কাজ শুরুর আগেই অনিয়ম ও দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে র‌্যাবের পক্ষ থেকে কাজের দরপত্র ইজিবির মাধ্যমে দেয়ার তাগিদ দেয় র‌্যাব সদর দপ্তর। কিন্তু কর্ণপাত করেননি গনপূর্ত কর্তৃপক্ষ। ৫ থেকে ১০ শতাংশ উর্দ্ধধরে প্রকল্পের কাজ ভাগ করে দেন নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে। বিনিময়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন নিয়ে নেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান গনপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো, রফিকুল ইসলাম। 

একই অনিয়ম করেন উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পেও। এই প্রকল্পটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাথে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে গনপূর্ত অধিদফতর। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসিক সমস্যা সমাধানে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ‘উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্প’ হাতে নেয়। পরে ২০০৬ সালে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। এই প্রকল্পকে চারটি সেক্টরে (১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮) ভাগ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১৮ নম্বর সেক্টরে অ্যাপার্টমেন্ট কাজ বাস্তবায়ন করছে রাজউক। বাকিগুলো তিন আবাসিক সেক্টরের কাজ বাস্তবায়ন করছে গনপূর্ত অধিদফতর।  একই প্রকল্পে রাজউক যেখানে ৫ থেকে ১০ শতাংশ নিম্নদরে কাজ করছে সেখানে গনপূর্ত অধিদফতর কাজ বাস্তবায়ন করছে ৫ থেকে ১০ শতাংশ উর্দ্ধধরে। এথানেও নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে কাজ দিয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সরকারি অর্থের বেশী ব্যয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। যার পুরোটাই প্রধান প্রকৌশলীসহ তার সহযোগি কর্মকর্তারা বিলিবণ্টন করে নিচ্ছেন। 

এতো গেল দু’টি প্রকল্পের কথা। গনপূর্ত অধিদফতর বাস্তবায়নাধিন বড় প্রকল্পগুলোর প্রতিটিতেই এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করে নিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। আর লোপাটের এই টাকার ভাগ যেমন তার প্রিয় অধিনস্তরা নিচ্ছেন। যেকারণে সরকারের শত শত কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলেও কেউ টু শব্দটিও উচ্ছারণ করছেন না। কমিশনের এসব টাকা গ্রহণে তিনি ও তার সহযোগিরা অবলম্বন করেন অনেক সতর্কতা। নিজস্ব লোকদের নামে চেক নিয়ে তাদের মাধ্যমে টাকা উঠিয়ে নিজেদের হিসাব পূর্ণ করেন। বিশস্ত পাঁচ কর্মকর্তা প্রধান প্রকৌশলীর ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করছেন।  এরা হলেন- ঢাকা সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সোহরাওয়ার্দী, সিটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত উল্লাহ, ঢাকা গনপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক চৌধুরী, ঢাকা গনপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্নেন্দু শেখর মন্ডল এবং শেরেবাংলা নগর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু।      

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১ টাকা থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজ ইজিবি টেন্ডারের মাধ্যমে দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। গনপূর্ত অধিদফতরে সরকারের এই নির্দশনা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজের কিছু অংশ ইজিবির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করলেও ৩০ কোটি টাকার উপরের বড় কাজগুলোর প্রায় সবগুলোই ম্যানোয়াল ওটিএম’র মাধ্যমে নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।  

সিভিল কাজের বাইরে ইলেকট্রিক্যাল (ইএম) কাজেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এই প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে লিফট ক্রয় কাজে তার দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন ডিভিশনের আওতাধীন থাকা প্রকল্পে লিফট ক্রয়ের টেন্ডার দেয়ার এখতিয়ার ওই ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর থাকলেও প্রধান প্রকৌশলী তাদের এখতিয়ার রুদ্ধ করে দিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলীদের টেন্ডার দিতে না দিয়ে তাদের কাছ থেকে চাহিদাপত্র নিয়ে সব চাহিদা একসাথে করে পূর্তভবন থেকে তিনি নিজেই টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করেন। মতিঝিল, উত্তরা, আজিমপুরসহ বিভিন্ন ডিভিশনের প্রায় তিনশ’ লিফট ক্রয়ের কাজ নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এদিকে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বাজেট থাকে গনপূর্ত অধিদফতরে। এসব কাজও ইজিবি ছাড়াই নিজম্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দিয়ে দেন নির্ধারিত কমিশনের মাধ্যমে। আর ঠিকাদাররাও ভ’য়া বিল ভাউচার করে কাজ না করেই উঠিয়ে নেন টাকা।
 
পূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার জানিয়েছেন, নিজের মেয়াদে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম শুধুমাত্র টেন্ডারে অনিয়ম ও জালিয়াতি করেই সরকারের কয়েক শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া বদলী বানিজ্য, ভ’য়া প্রকল্প বানিয়ে টাকা লোট, কর্মকর্তাদের কর্মচারিদের সুবিধাজনক স্থানে পোস্টিং, এবং বিএনপি-জামায়াত পুর্ণবাসন কাজ করে কামিয়েছেন আরও কাড়ি কাড়ি টাকা। অবৈধ সম্পদ পাহাড় গড়েছেন। দেশ বিদেশে কিনেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। অবৈধ এই টাকায় তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধান্দাও করছেন বলে জানা গেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে টাকা দিয়ে নিজের পক্ষে লবিং করাচ্ছেন।  

প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জামায়াতের সাবেক আমীর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের ভাগ্নে হিসেবে সমধিক পরিচিত। ব্রাম্মনবাড়িয়ার নবীনগরেও তার গ্রামের বাড়িটি একনামে রাজাকার বাড়ি হিসেবে সবাই চেনেন। জোট সরকারের আমলে নিজামীর বাসায় অবাধ যাতায়াত ছিল তার। যুদ্ধাপারাধী মামার তদবিরেই তিনি তৎকালীন গনপূর্ত মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের সানিধ্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেসময় বিএনপি ও জামায়াতের তার ঘনিষ্টতার কারণে পদোন্নতিপ্রাপ্তও হন তিনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় পর সুবিধা নিতে ভোল পাল্টে বনে যান আওয়ামী লীগার। কিন্তু অন্তরে ধারন করা স্বাধীনতা বিরোধীতার বীজ তাকে স্ববিরোধী করে তুলে। নিজ দফতরেই আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রকৌশলীদের সংগঠণ বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা পকৌশলী পরিষদের নেতাদের লাঞ্চিত করেন তার লোকজন দিয়ে। দফতরে টানানো বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত ফেস্টুন ব্যানার ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে অসম্মান করেন জাতির পিতাকে। তার এসব অপকর্ম এবং জামায়াত প্রীতির অনেক ঘটণা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও এসেছে। কিন্তু কিছুতেই হয়নি। টাকার জোড়ে সব অপকর্ম ধামাচাপা দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন তিনি। 

এবিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ অভিযুক্ত পাঁচ কর্মকর্তার সাথে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদেও স্বাক্ষাত পাওয়া যায়নি। 

Ads
Ads