আওয়ামী লীগের মীরজাফরদের চিহ্নিত করতে হবে

  • ৩১-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

নির্বাচনে কোনো দলের বড় জয়ের ক্ষেত্রে এতদিন আমরা ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি বা ভূমিধ্বস বিজয় টার্ম ব্যবহার করতাম। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়কে 'ভূমিধ্বস বিজয়' বললে পুরোটা বোঝানো যায় না। নতুন শব্দ দরকার।

অনেকরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে আমরা পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্যোগটিই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। সুনামির সামনে আমরা সত্যি অসহায়। সুনামি যেমন নির্বিচারে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এবারের বাংলাদেশের নির্বাচন তেমনি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে বালির বাঁধের মত ভেসে গেছে বিএনপি আর ঐক্যফ্রন্টের সব প্রতিরোধ।

 ১০ বছর পর ঐক্যফ্রন্টের ঘাড়ে চড়ে বিএনপি নির্বাচনে এসেছে বটে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টকে আমার কখনো সিরিয়াস মনে হয়নি। একবারও মনে হয়নি তারা জিততে চায়। বিএনপি একটা কাজই মনোযোগ দিয়ে করেছে, সেটা হলো মনোনয়ন বাণিজ্য। 

বিভিন্ন দফায় প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা বিএনপি পেয়েছে মাত্র ৫টি আসন। বিস্তারিত লেখার আগে একনজরে ফলাফলের দিকে চোখ বোলানো যাক। জাতীয় সংসদের আসন মোট ৩০০টি। এবার নির্বাচন হয়েছে ২৯৯ আসনে। এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে গাইবান্ধা-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে। বাকি ২৯৮ আসনের মধ্যে মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি আসন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ একাই পেয়েছে ২৫৫টি আসন। মহাজোটের বড় শরিক জাতীয় পার্টি পেয়েছে মোট ২২টি আসন। এরমধ্যে একটি আসন জাতীয় পার্টি পেয়েছে নিজেদের যোগ্যতায়, মানে মহাজোটের বাইরে গিয়ে। এছাড়া মহাজোটের অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি পেয়েছে ৩টি, জাসদ (ইনু) পেয়েছে ২টি, বাংলাদেশ জাসদ পেয়েছে ১টি, জাতীয় পার্টি-জেপি পেয়েছে ১টি, ত্বরিকত ফেডারেশন পেয়েছে ২টি এবং মহাজোটে সর্বশেষ যুক্ত হওয়া যুক্তফ্রন্ট তথা বিকল্পধারা পেয়েছে ২টি আসন।

মহাজোটের মূল প্রতিপক্ষ ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে মোট ৭টি আসন। বিএনপির ৫টির বাইরে ড. কামালের দল গণফোরাম পেয়েছে ২টি আসন। আর ৩টি আসনে জিতেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য!! অবিশ্বাস্য!!!

যে ফলাফল, তাতে নির্বাচন কেমন হয়েছে সে আলোচনা অর্থহীন। তবে কয়েকটা বিষয় নিশ্চিত। শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মত এবং চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। আরেকটা বিষয় নিশ্চিত দশম সংসদের মত একাদশ সংসদও একই ধরনের বিরোধী দল পেতে যাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সরকারেও থাকবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। শেখ হাসিনা ঐকমত্যের সরকারে ঐক্যফ্রন্টের কাউকে আমন্ত্রণ জানালেও আমি অবাক হবো না। বিএনপি তো ভেসে গেছেই, জামায়াত একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, এটাই সুখের কথা।

নিবন্ধিত ৩৯টি দলই এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তার মানে নির্বাচন শতভাগ অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা; তা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে অনেক আলোচনা হবে। সব তথ্য না জেনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ ব্যাপারে মন্তব্য করা কঠিন। নির্বাচনের দিন অন্তত ১০ জনের প্রাণ গেছে। প্রত্যেকটি মানুষের জীবন মূল্যবান।

ফলাফলের অভিনবত্বে মৃত্যুগুলো আলোচনার বাইরে চলে গেছে। এই ঘটনাগুলো বাদ দিলে সাধারণভাবে নির্বাচনে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে ঐক্যফ্রন্ট দিনভর নানা অভিযোগ করেছে। আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা, এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি বা বের করে দেয়া হয়েছে- এ ধরনের অভিযোগ ছিল। স্থানীয়ভাবে ঐক্যফ্রন্টের অনেক প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে ঐক্যফ্রন্ট কথা রেখেছে, তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ছিল। নির্বাচন শেষে তারা পুরো নির্বাচন বাতিলের দাবি করেছে।

ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৭টি আসন পেয়েছে, এটা অবিশ্বাস্য বটে। তবে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসছে এটা অনুমিতই ছিল। তবে যা হয়েছে, তা বুনো অনুমানকেও হার মানিয়েছে। নির্বাচনের মাঠ সমতল ছিল না, পুলিশ-প্রশাসন সরকারি দলের পক্ষে ছিল- এ অভিযোগ মিথ্যা নয়। কিন্তু তাতে কি ফলাফলের কোনো আকাশ-পাতাল ফারাক হতো? বিএনপি যদি ৫টি না পেয়ে ১০৫টি আসনও পেতো, তাতেও কি কিছু যেতো আসতো?

১০ বছর পর ঐক্যফ্রন্টের ঘাড়ে চড়ে বিএনপি নির্বাচনে এসেছে বটে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টকে আমার কখনো সিরিয়াস মনে হয়নি। একবারও মনে হয়নি তারা জিততে চায়। বিএনপি একটা কাজই মনোযোগ দিয়ে করেছে, সেটা হলো মনোনয়ন বাণিজ্য। ৩০০ আসনে ৮০০ প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়ে বাণিজ্যের বিষয়টি তারা পরিষ্কার করে দিয়েছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো কিছুতেই বিএনপির কোনো পরিকল্পনার ছিটেফোটাও ছিল না। ইশতেহার দিয়েছে যেনতেনভাবে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগেও বিএনপির একাধিক নেতা তাদের নিশ্চিত ভরাডুবির পূর্বাভাস দিয়েছেন। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে তাদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের ফাঁস হওয়া টেলিফোন কথোপকথনেও অন্তর্কোন্দল আর হতাশার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল।

বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান আমাকে বলেছেন, তাদের হারারও যোগ্যতা নেই। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান আরো হতাশ, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এটা প্রমাণের জন্য সরকারি দলকে কারচুপি করে বিএনপিকে কিছু আসন দিতে হবে, নিজেদের যোগ্যতায় জিতে আসার সামর্থ্য নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ কারচুপি করে বিএনপিকে সম্মানজনক আসন দেয়ার মত উদারতা দেখায়নি।

১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের মধ্যে যেমন মাটি কামড়ে পড়ে থাকা বা মরিয়া ভাব থাকার কথা, তার বিন্দুমাত্রও ছিল না। বিএনপির প্রার্থীদের অনেকে একদিনের জন্যও প্রচারণায় নামেননি। কোথাও কোথাও বিএনপি প্রার্থীদের পোস্টার লাগাতে দেয়নি বা ছিঁড়ে ফেলেছে, এ অভিযোগ সত্যি। আবার বিএনপির অনেক প্রার্থী পোস্টার ছাপেনইনি, সেটাও তো সত্যি। পোস্টার না ছেপে যদি আপনি লাগাতে না দেয়ার অভিযোগ করেন, প্রচারণা না চালিয়ে ঘরে বসে থাকেন; তাহলে কি ভূত এসে আপনার বাক্সে ভোট দেবে।

নির্বাচনের দিন কোনো কোনো কেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি, এটা হয়তো সত্যি। কিন্তু অনেক কেন্দ্রে তো তারা এজেন্ট দেননি বা এজেন্ট দেয়ার মত লোক খুঁজে পাননি, এটাও কিন্তু সত্যি। হয়রানির ভয়ে বিএনপির অনেক কর্মীই এজেন্ট হতে চাননি বা হলেও পরে পালিয়ে গেছেন।

বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের সব আয়োজন দেখে মনে হয়েছে, তারা নির্বাচনে এসেছেন অভিযোগ করতে। লাগাতার ভাবে তা করেছেনও। তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ছিলেন চূড়ান্ত অভিযোগটি করতে। আর সেটি হলো, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনের পর তা করেছেনও। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারা একবারও পরিষ্কার করে বলেননি, জিতলে তাদের নেতা মানে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন।

ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন তো নির্বাচনই করেননি। তিনি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, ঐক্যফ্রন্ট জিতলেও তিনি কোনো দায়িত্ব নেবেন না। নির্বাচনের তিনদিন আগে ড. কামাল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জামায়াত নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হবে জানলে তিনি ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিতেন না। আত্মবিশ্বাসী শেখ হাসিনার ঝলমলে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির পাশে ঐক্যফ্রন্টকে বড্ড ম্লান মনে হয়েছে। এমন ছন্নছাড়া দলকে মানুষ কেন ভোট দেবে?

বিএনপিকে মানুষ কেন ভোট, এই প্রশ্নের কোনো পরিষ্কার উত্তর জানা ছিল না তাদের কাছে। এই প্রশ্নের উত্তরে তারা আওয়ামী লীগের খারাপ কাজের বিশাল ফিরিস্তি দিয়ে কাজ সেরেছে। তার মানে তারা নেগেটিভ ভোটের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু নেগেটিভ মনোভাব দিয়ে পজেটিভ কিছু পাওয়া যায় না। পায়নি। গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের তাক লাগানো উন্নয়নের কোনো জবাব ছিল না বিএনপির কাছে। মানুষ সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের পক্ষেই জনগণ রায় দিয়েছে। বরং গত ১০ বছরে পেট্রল সন্ত্রাস বিএনপিকে আরো জনবিচ্ছিন্ন করেছে।

অন্ধকার কেটে যাচ্ছে, পূব আকাশে উকি দিচ্ছে সূর্য। সেই সূর্য যেন আলো ছড়ায় বাংলাদেশে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ যেন বিশ্বকে আরো অনেক চমক দেখায়। খালি একটাই শঙ্কা, যে ভয়ঙ্কর সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি, জামায়াত, ঐক্যফ্রন্ট, রব, মান্না, কাদের সিদ্দিকী, তারেক রহমান, খালেদা জিয়া খড়কুটোর মত ভেসে গেছেন; সেই জোয়ারে যেন গণতন্ত্র, মানবাধিকারও ভেসে না যায়। নির্বাচনী ইশতেহারে শেখ হাসিনা যে ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি যেন জনগণকে নতুন বাংলাদেশ উপহার দেন। সে বাংলাদেশ হোক উন্নত, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক। নতুন বাংলাদেশে আইনের শাসন থাকুক, মানবাধিকার থাকুক, দুর্নীতি না থাকুক, দারিদ্র্য না থাকুক। 

তবে আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমতায় আসায় এখন সবাই আওয়ামী লীগ সাজার চেষ্টা করবে। তারা সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতেই আওয়ামী লীগ সাজবে। এখন আওয়ামী লীগের মধ্যে এসব মীরজাফরদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগেরই অনেক হেভিওয়েট নেতা নিজেদের নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, কিছু একটা ঘটে যাবে। গণেশ উল্টে যাবে এমনটা একটা ভাব নিয়ে নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়েছেন। তাদের যেন ভবিষ্যতে আর দলে মূল্যায়ণ না করা হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আর এবার যারা নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় ছিল তারাই শেখ হাসিনার প্রকৃত সৈনিক। সময় এসেছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এসব প্রকৃত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ণ করার। তবে কোনো মীরজাফর যেন আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধা নিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বিশেষভাবে।

Ads
Ads