কাকের মাংস কাকে খায় না: রাজনীতিকের মাংস রাজনীতিকরা খাবে! 

  • ১৮-Dec-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘কাকের মাংস কাকে খায় না’। অর্থাৎ মানুষের মধ্যেও যে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যসূচক শ্রেণি, বর্গ, পেশা আছে তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশে তখন ঐক্যবদ্ধ থাকে, যখন তাদের ওপর ভিন্ন শ্রেণি বা পেশার লোক ক্ষতিকারক হয়। ওইসময়ে তারা কেউ নিজেদের ক্ষতি নিজেরা করে না। কিন্তু এখন আর সেই প্রবাদটির যেন কোনো মূল্যই নাই। অর্থাৎ কাকের মাংস কাকে না খেলেও এখানে এই মানুষের মাংস মানুষ ঠিকই খায়- যখন নিজ স্বার্থের ওপর টান পড়ে। তার অর্থ হচ্ছে, চিরকার ‘মানুষ, মানুষ’ বা ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই’ ইত্যাদি বুলি আওড়ানো এই কাক শ্রেণির মানুষই যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করে এখন কাকের চেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণিতে নেমে এসেছে!

মানুষের মধ্যে থাকা এই শ্রেণিরই একটি সাংসদ। রাষ্ট্রের জন্য আইন প্রণয়নকারী তারা। তারা বিহনে রাষ্ট্রই অচল। সে গৌরবেই তারা নিশ্চয়ই পৌর মেয়র বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের সমান্তরালে বসবেন না, এই শ্রেণিগত চেতনার কারণেই। সে হচ্ছে ‘শ্রেণিগত চেয়ার’। কিন্তু যিনি একজন সাংসদ হবেন তার ওপরই যদি একজন টোকাই শ্রেণির লোক হাত তোলে তখন শ্রেণি সচেতন উচ্চমর্যাদার আরেকজন সাংসদের কেমন লাগবে? নিজ দলের হলে একেবারেই ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু অন্য দলের হলে? মর্যাদার দিক থেকে তো তিনিও তারই মতো সমমর্যাদার ‘সাংসদ’! ‘কাকের মাংস কাকে খায় না’- এ বিষয়ে তার যদি ন্যূনতম চেতনা থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রেও তার খারাপ না লেগে পারে না। কিন্তু রাজনীতির অবস্থা এমন হয়েছে যে, এখানেও ‘কাকের মাংস কাকে খায়’।
অথচ, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের কালে গোটা বাঙালি এক হয়ে গিয়েছিল এই ‘কাকের মাংস কাকে খায় না’ বলেই। আসল কথা হচ্ছে, বাঙালির পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে তখনই আর সে নিজের মাংস নিজে খায় না। প্রবল বন্যায় যখন যাবতীয় প্রাণীগুলোর চাহিদামতো ঠাঁই থাকে না, তখন সব প্রাণী একটি জায়গায় এক হয়ে থাকে। কেউ কারো ক্ষতি করে না। অর্থাৎ চরম বিপদে না পড়লেই বাঙালি আর ‘কাক’ থাকে না। ভাল্লুকও থাকে না। বাঘও থাকে না। তখন সে নিজের মাংস নিজেই গোগ্রাসেই গিলে খায়।

নয়তো এই যে, অতি উৎসাহী সমর্থক শ্রেণির লোকজন যখন আগামী দিনে যারা হয়তো সাংসদ হতে পারেন তাদের ওপর হামলা করলেও কেন অন্যরা চুপ থাকবে? কিংবা উল্টো তাদের লেলিয়ে দেবে? তখন তাদের হাতে ‘গণতন্ত্র’ নিরাপদ থাকবে কী করে? নাকি ওই ’৭১-এর মতো চরম বিপদকালীন সময়েই ‘গণতন্ত্র’ চেতনা ফিরে আসবে। এরপর যার যার স্বার্থে ডুবে গিয়ে সব ভুলে যাবে!

বিচ্ছিন্নভাবে সমর্থকে সমর্থকে মারামারি হলেও সেই মাইর প্রার্থীর ওপর গিয়ে যেন না পড়ে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। কেননা, তারাই হয়তো আগামী দিনের জনপ্রতিনিধি। কেউবা হতে পারেন মন্ত্রীও। মন্ত্রী হলে তো তিনি প্রধানমন্ত্রী লেভেলেরই। যখন ক্যাবিনেটে মন্ত্রীরা বসবেন সেখানে এক প্রধানমন্ত্রী দিয়ে তো তা বসতে পারে না। কাজেই বিষয়টি সবাই সবাইকে দেখবেন, সেটাই হবে শিষ্টাচার। কিন্তু এই শিষ্টাচারের বড়ই অভাব দেখছি আজ এই রাজনীতিকদের মধ্যেও। ফলে তারাও অতি উৎসাহী টোকাই শ্রেণির লোকের কাতারেও নেমে যেতে লজ্জিত হন না। তাকি শুধু ভোটের জন্যই?

এটা ঠিক, এখনও পর্যন্ত নির্বাচনে যে পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা উৎসবমুখরই বলতে হবে। কিন্তু এই উৎসব যেন গণতান্ত্রিকের মতো না হয়ে ধর্মতান্ত্রিকের মতো হয়ে না যায়। যেমন- মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদে শুধু মুসলমানরাই উৎসব করে। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষরা বড়জোর পরিচিত, বন্ধুবান্ধব শ্রেণির হওয়াতেই তাতে বিচ্ছিন্নভাবে কদাচিৎ অংশ নেয় মাত্র। সর্বজনীনরূপে নয়। কাজেই ইসি যে বললেন, নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ আছে, এই ‘উৎসব’ সেরকম সাম্প্রদায়িক উৎসব পরিবেশের মতো যেন না হয়ে পড়ে। তাহলে সেটা অসাম্প্রদায়িক উৎসবের মতো না হয়ে বিশেষ ‘সাম্প্রদায়িক উৎসবের মতোই হয়ে পড়বে। এতে একই দোষে দুষ্ট না হয়ে ইসি যেন বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখেন।

Ads
Ads