ড. কামাল কি সত্যিকরের সংবিধান প্রণেতা?

  • ২৯-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারার সভাপতি বি. চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে যুক্তফ্রন্ট। তবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিনটিতেই যুক্তফ্রন্ট সভাপতি বি. চৌধুরী কামাল হোসেনের সংবিধান প্রণেতা হওয়ার বিষয়ে নির্জলা মিথ্যাচার করেছেন।

বৈঠক শেষে বি. চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরামের সভাপতি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য এই সভায় আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এই লক্ষ্যে পরবর্তী কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য আমরা একটি সাব কমিটি গঠন করার ব্যবস্থা নিয়েছি। দ্রুত তারা এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে জানাবেন।’

নিজের বক্তব্যে কামাল হোসেনকে সংবিধান প্রণেতা হিসেবে উল্লেখ করেন বি. চৌধুরী। এটিই প্রথম নয়। এর আগেও ড. কামাল হোসেন নিজে এবং তাঁর অনুগতরা তাঁকে সংবিধান প্রণেতা হিসেবে পরিচিত করানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাংলা ইনসাইডারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংবিধান কোনো একক ব্যক্তির অবদান নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকনির্দেশনা ও রূপরেখা অনুযায়ী একটি দলবদ্ধ প্রয়াসে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। তাই বি. চৌধুরীর বক্তব্যকে ইতিহাস বিকৃতি বললেই যথার্থ হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসনামলেই সংবিধানের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে এসেই সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেন তিনি। ’৭২ এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিনই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম, ড. কামাল হোসেনকে সংবিধানের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। আজকে বলা হচ্ছে ড. কামাল হোসেন নাকি সংবিধান প্রণেতা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে ড. কামাল হোসেনসহ সদস্যদের মনোনীত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই।

ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত এই কমিটিতে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, আবদুর রহিম, আবদুর রউফ, লুৎফুর রহমান, আবদুল মোমিন তালুকদার, আবু সাঈদ, মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ, ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম, বাদল রশীদ, আসাদুজ্জামান খান, মোশাররফ হোসেন আকন্দ, আবদুল মমিন, শামসুদ্দিন মোল্লা, আবদুর রহমান, এ. রহমান, ফকির শাহাবুদ্দিন আহমেদ, আবদুল মোন্তাকিম চৌধুরি, খোরশেদ আলম, সিরাজুল হোক, দেওয়ান  আবুল আব্বাস, হাফেজ হাবিবুর রহমান, আবদুর রশীদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ খালেদ, রাজিয়া বানু, ক্ষিতীশচন্দ্র মণ্ডলের মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিরা। এরা প্রত্যেকেই সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

ড. কামালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হওয়ার বিষয়টিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাতে গিয়ে এখন তাঁকে সংবিধান প্রণেতাই বানিয়ে দিয়েছেন কামাল হোসেনের অনুগতরা। কিন্তু সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হওয়া ও সংবিধান প্রণেতা হওয়া এক বিষয় নয়। আর ড. কামাল হোসেন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন কারণ তিনি তৎকালীন আইনমন্ত্রী ছিলেন। ড. কামাল ব্যাতীত অন্য কেউ যদি তখন আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতেন তবে সভাপতি দায়িত্বটি তথাকথিত সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন না পেয়ে অন্য কেউ পেতেন।

সংবিধান প্রণয়ন কমিটি বাংলাদেশ সরকারের ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অনুসৃত নীতিমালা এবং ১৯৬৬ সালে উত্থাপিত আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করে। এই নিয়ে আওয়ামী লীগের ফোরামে এবং পার্লামেন্টারি পার্টিতে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন গণপরিষদের সদস্যগণের বিবেচনার জন্য সংবিধানের খসড়া উপস্থাপন করেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন স্পিকারের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে কিছু অমূল্য কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যদি এই এসেম্বলি ভবনও না থাকতো, তবে গাছতলায় বসে আমাদের মেম্বাররা সংবিধান রচনা করতেন - এই সুনিশ্চিত আশ্বাসটুকু দিতে পারি।... এই সংবিধানে মানবিক অধিকার থাকবে যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারে।... আমরা একটি গণমুখী সংবিধান তৈরি করতে চাই যে, আপনি যতক্ষণ নিরপেক্ষ থাকবেন, আমাদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন।... আপনি কোন দল বড় কোন দল ছোট তা দেখবেন না; কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিচার ও ইনসাফ করবে।’

অবশেষে পূর্ণ আলাপ-আলোচনা, বিতর্কের পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও গণপরিষদ সদস্যগণ ১৪ ডিসেম্বর সংবিধানে সাক্ষর করেন। সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকেই সংবিধান কার্যকর হয়।

নিজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে জনগণকে একটি আধুনিক ও মানবিক সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর জীবনের অসংখ্য অর্জনের মুকুটে এই অর্জনটি আরেকটি উজ্জ্বল পালক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নায়ক যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তেমনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও মূল ভূমিকা বঙ্গবন্ধুরই।

বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেন সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাঁরা বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেন এবং আইনের শাসন, মানবাধিকার প্রভৃতি বিষয়ে বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু এরাই গতকাল নিজেদের অনৈতিক চেহারা দেখিয়ে ফেললেন। আমাদের সমাজে যারা কথায় কথায় জ্ঞান দেয়, মানুষকে নীতি-নৈতিকতার পাঠ শেখায়, তাঁরাই যখন নিজেদের পরিচয় প্রদানের ক্ষেত্রে, নিজের কাজের ক্ষেত্রে অসততার পরচিয় দেন তখন সাধারণ জনগণের যে আর কাউকে বিশ্ব্বাস করার উপায় থাকে না সে কথা বলাই বাহুল্য।

Ads
Ads