মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে রাস্তায় হাজারো মানুষের অবস্থান 

  • ১৯-Sep-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

কলাপাড়ায় জীবন দিয়ে হলেও তিনফসলি জমি রক্ষার শপথ

:: মো. ছগির হোসেন, কলাপাড়া প্রতিনিধি ::

‘জীবন দেবো জমি দেবো না, লাশ হবো জমি দেবো না’ স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তিনফসলি জমি রক্ষার দাবিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে রাস্তায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে হাজার হাজার মানুষ। নতুন করে তিনফসলি জমি অধিগ্রহণ করার প্রতিবাদে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ধানখালী ও চম্পাপুর ইউনিয়নবাসী। মো. বাহারুল আলম সানু উকিলের সভাপতিত্বে গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় ধানখালী কলেজ বাজার রাস্তায় মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়। অবস্থান কর্মসূচিতে ধানখালী ও চম্পাপুর ইউনিয়নের শিশু, কিশোর, যুবক, বয়ঃবৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করেন। ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনফসলি জমিতে কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে না’- অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা এ ঘোষণা বাস্তবায়নের দাবি জানান। এ সময় উপস্থিত বক্তারা উপজেলার ধানখালী ও চম্পাপুর ইউনিয়নের একমাত্র তিনফসলি জমি, সুপেয় পানি ও বসতভিটা রক্ষায় যে কোনো মূল্যে অধিগ্রহণ বন্ধের ঘোষণা দেন। তারা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিনফসলি জমি অধিগ্রহণ বন্ধের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের সময় বেঁধে দেন। এ দাবি না মানলে ১ অক্টোবর থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিস ঘেরাও, মহাসড়ক অবরোধ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আমরণ অনশন কর্মসূচি, স্থানীয় সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধসহ লাগাতার কর্মসূচিরও ঘোষণা দেওয়া হয়। অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন মো. আনছার উদ্দিন মোল্লা, মো. ফরিদ তালুকদার, আ. মান্নান গাজী, মো. লতিফ গাজী, মো. মিজানুর রহমান, মো. সজল প্রমুখ।

বক্তারা ‘ফসলি জমি রক্ষা করলে কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ সেøাগান নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার ত্রি-ফসলি জমি নষ্ট না করে কয়লাভিত্তিক সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্দেশ্যে লোন্দা মৌজা থেকে ভূমি অধিগ্রহণ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে অন্যত্র সরকারি খাস ও অনাবাদি জমিতে স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সময় বক্তারা বলেন, প্রকৃতির দেওয়া অমূল্য রতন তিনফসলি জমি, সুপেয় পানি আর শত শত বছরের পুরনো বসতভিটা কেড়ে নিয়ে ধ্বংস করতে চাচ্ছে? ধ্বংসই করতে পারবে, সৃষ্টি করতে পারবে না তিনফসলি জমি। ফিরিয়ে দিতে পারবে না বসতভিটা। বিলীন হয়ে যাবে রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ আত্মীয়স্বজনদের পরিচয়।

প্রস্তাবিত অধিগ্রহণ এলাকার আওতাধীন ধানখালীর কৃষক মো. মনিরুল ইসলাম তার সাত একর জমিতে বারোমাসি ফসলি জমি চাষাবাদ করে বছরে ২ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করে এবং এই তিনফসলি জমি উৎপাদনের অর্থ দিয়ে সংসার পরিচালনাসহ ১ ছেলে ও ২ মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছে এবং তার ছেলে সাইফুল ইসলাম স্থানীয় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে চাকরি করেন। তারা মোটামুটি ভালোই আছেন। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাহন যদি জমি লইয়া যায় মোগো শান্তির সংসার ধ্বংস হইয়া যাইবে, কোনো হানে ঠাঁই পামু না’। 
ছৈলাবুনিযা গ্রামের কৃষক গুলজার আলী হাওলাদার। তার ১ একর চাষি জমিতে ধান, ডাল, বাদামসহ বিভিন্ন শস্য উৎপাদন করে ভালোই আছে বলে জানান। গুলজার আলী হাওলাদার বলেন, ‘মোরা এমনেই গরিব জমাজমি কোম হ্যার মধ্যে যদি এই জমি লইয়া যায় ভিক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নাই, জীবনডা এ্যাক্কালে শ্যাষ অইয়া যাইবে’। 
দেবপুর গ্রামের মো. আপ্তের আলীর ১৮ সদস্যের যৌথ পরিবারের সংসার। তার ৬ একর চাষি জমিতে ধানসহ বিভিন্ন প্রকার শস্য, শাক-সবজি উৎপাদন করে সুখ-শান্তির সংসার অতিবাহিত করছেন। আপ্তের আলী বলেন, ‘সেনাকল্যাণ সংস্থা যদি এই জমি লইয়া যায় মোরা না খাইয়া মরমু। আমাগো যাওয়ার কোনো পথ নাই। রাস্তায় বইতে হইবে, কেউ মোগো ভিক্ষাও দেবে না’

মূলত উপজেলার একমাত্র তিনফসলি ও সুপেয় পানির এলাকা ধানখালী ইউনিয়ন। যেখানে উৎপাদন হয় ধান, ডাল, তরমুজ, বাদাম, ভুট্টা, আলু, মরিচ, বাঙ্গী, সূর্যমুখীর চাষসহ সকল প্রকার শাক-সবজি। ওই এলাকার ৮০ ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। গ্রামগুলোর মাটি দো-আঁশ ও পলির মিশ্রণ হওয়ায় কৃষকরা ১২ মাসই কোনো না কোনো ফসল ঘরে তোলে। কৃষি কাজই গ্রামের জনসাধারণের জীবিকার একমাত্র উৎস, তাছাড়া জীবিকার জন্য অন্য কোনো কাজ তাদের জানা নেই। তাই যেখানে তরমুজ, বিভিন্ন প্রকার ডাল, তেলবীজ, মরিচ, বাদাম, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি উৎপাদন করে সন্তানদের লেখাপড়াসহ জীবন অতিবাহিত করছে। তাই ‘সেনাকল্যাণ ফিরে যাও, আশুগঞ্জ ফিরে যাও, আরপিসিএল ফিরে যাও’, ‘জীবন দেবো জমি দেবো না, লাশ হবো জমি দেবো না’ স্লোগান দিয়ে তিনফসলি জমি, সুপেয় পানি ও বসতভিটা রক্ষার দাবি দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন ওই দুই ইউনিয়নের মানুষ।

এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অতিরিক্ত সচিব রাম চন্দ্র দাস ‘ভোরের পাতা’কে বলেন, বিষয়টি পটুয়াখালীর জেলা প্রাশাসককে বলা হয়েছে। যে জায়গাতে ধানখালীর পাঁচজুনিয়া গ্রামে অধিগ্রহণের কথা চলছে, ওই জায়গায় তিনি নিজে গিয়ে দেখবেন, পরে টেকনিক্যাল যারা আছেন তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে কাজ করা যায় কি না বা কোনদিকে নেওয়া যায় সে সিদ্ধান্ত নেবেন।

Ads
Ads