লন্ডনে জ্বলেনি বিএনপির লাল-সবুজ বাতি

  • ২৯-Aug-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দেশজুড়ে ভোটের হাওয়া দিন দিন জোড়ালো হচ্ছে। ক্ষমতাসীন অাওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের মিশন সামনে রেখে মাঠে নেমেছে বহু আগেই। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীরা সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে বিচ্ছিন্নভাবে ভোটের মাঠে পদচারণা চালালেও দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও চুড়ান্ত হয়নি।

প্রায় একযুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির অবস্থা এখন ত্রিশঙ্কুল। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের মাসুল গুনতে গুনতে খাদের কিনারে পৌছে গেছে দলটি। যার মুখের কথাই ছিল দলীয় সিদ্ধান্ত, বিএনপির চেয়ারপারসন সেই খালেদা জিয়া এখন দূর্নীতি মামলায় সাজা পেয়ে সাড়ে ছয়মাস ধরে কারাবন্দি। নিকটবর্তী সময়ে তার জামিনের আশা নেই বলেই মনে হচ্ছে। স্থায়ী কমিটি নামে বিএনপির একটি নীতি নির্ধারণী ফোরাম থাকলেও টিনের তলোয়ারের মতোই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেই কোনো ক্ষমতা। দেশের অন্যতম প্রধান এ রাজনৈতিক দলের নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য লন্ডনের লাল বা সবুজ বাতি জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় থাকতে হয়। আগামী নির্বাচনে লড়াই নাকি বর্জন, সেই সিদ্ধান্ত জানাতে এখনও জলেনি কোনো বাতি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা সেই পাঁচ জানুয়ারির মতো ভোট বর্জনের পথে হাঁটতে না চাইলেও দলের শীর্ষনেতাদের প্রায় সবাই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে তারা নিজেদের যুক্তি ও বিশ্লেষণ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছেও তুলে ধরেছেন। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে লন্ডনের লাল বা সবুজ বাতি, কোনোটাই এখনও জ্বলে ওঠেনি। লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

নির্বাচনে নামার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করতে আরও কয়েকটা দিন তারেক রহমান অপেক্ষা করতে চান। সরকারের কাছ থেকে সংলাপে বসার সম্ভাবনা এখনও ছাড়েননি তিনি। তারেকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা নেতারা জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনে করছেন, শেষমুহূর্তে সরকার নমনীয় হবে এবং নির্বাচনকে সর্বদলীয় করে তোলার স্বার্থে খালেদা জিয়ার জামিন ও তার দেশে ফেরার শর্তেও ইতিবাচক হয়ে ওঠবে।

নির্বাচনের প্রশ্নে তারেকের সময়ক্ষেপনের কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা দায়ি করছেন, আলোচিত একটি মামলাকে। সরকার হঠাৎ করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়কে সামনে নিয়ে এসেছে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, সেপ্টেম্বরেই চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় হবে। মামলাটির অন্যতম আসামী তারেক রহমান। মামলার রায়ে তারেকসহ ফেঁসে যেতে পারেন বিএনপি’র কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। বিশ্লেষকদের দাবি, বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ঝুলে আছে, গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের উপরই। আর এ কারণেই তারেক রহমান ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছেন।

আগামী নির্বাচন নিয়ে দলের এই কৌশলটি গণমাধ্যমকে জানাতে নারাজ বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, আগেভাগে নির্বাচনকে ঘিরে দলের পরিকল্পনা জানিয়ে দিলে সরকার কৌশলী হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে দিলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়তে পারে। তাই এ নিয়ে মুখ না খুলতে নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য বলেন, সরকার যে আবারও পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে গদিতে বসার সব আয়োজন করে রেখেছে তা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন কিংবা সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই। বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল থেকে নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে চাইবে না সরকার। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের ফাঁদে পা দেবে। তৃণমূল নেতাদের চাপ থাকলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকাটাকেই ভালো মনে করছে কেন্দ্রীয় নেতারা।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত ঢাকা শহরের একটি আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ওই নেতা বলেন, দল ভাঙার তো কম চেষ্টা হয়নি। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেও এই অপচেষ্টা থাকবে। ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বহু ঝড়ঝাপ্টা আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। বিএনপির মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রায় সবাই হামলা-হামলায় বিপর্যস্ত। এতকিছুর পরও বিএনপি এখনও ঐক্যবদ্ধ আছে। তাই এ নিয়ে দুর্ভাবনা বা টেনশনের কোনো কারণ নেই।

দলের কেন্দ্রীয় ওই নেতা আরো বলেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখাই তারেক রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে দলের সঙ্গে যারা বেইমানি করেছেন, তারা কর্মীদের কাছে এখনও অপমানিত হচ্ছেন। ওয়ান ইলেভেনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া নেতারা নিজেদের পরিণতি দেখেছেন। এখন বিএনপির কৌশল হলো, যেকোনও পরিস্থিতিতে দলকে ধরে রাখা।

গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পরেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। রায় নেতিবাচক হবে ধরে নিয়েই দলের কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, তফসিল ঘোষণার পরপরই দেশের বিচারব্যবস্থাকে দলীয়করণ করার বিষয়টি তুলে ধরে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পাঁচটি যৌক্তিক দাবি সরকারকে জানানো হবে। দাবি পূরণের আলটিমেটামও দেয়া হবে। সরকার দাবি পূরণ না হলে বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেবে। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে সরকার পতনের একদফা অান্দোলনের ডাক দিবে দলটি।

Ads
Ads