এমপিদের অবৈধ আয় বন্ধ করতে শেখ হাসিনার কাছে মুচলেকা দিতে হবে

  • ৩১-Oct-২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

মধ্যম আয়ের দেশের পথে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু গড় আয় ১৭৫১ মার্কিন ডলার। তবে আমাদের সংসদ সদস্যদের আয় গড় আয়ের চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বেশি। ৫ বছরের কম সময়ের ব্যবধানে সংসদ সদস্যদের (এমপি) আয় বেড়েছে ৩২৪ শতাংশ। প্রতিনিয়ত মানুষের মধ্যে আয় বৈষম্য বাড়ছে। এমপিদের দেয়া নির্বাচনী তথ্য বিবরণীতে এমন খবর পাওয়া গেছে। এদিকে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর কয়েকদিন বাকি। নির্বাচনে চুড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণে সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ করছে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচনী টিকেট পেতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগীতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগের ডজন ডজন প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। জোর তদবির বা লবিং শুরু করেছে দলীয় হাইকমান্ডের নেতাদের কাছে। কিন্তু বিগত নির্বাচনগুলো থেকে এবারের নির্বাচনে এ হার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদের মধ্যে অবৈধ সম্পদের মালিকরাও আছেন বেশ দাপটের সঙ্গে। ‘নির্বাচন করতে জনপ্রিয়তা না থাকলেও টাকার জোরে সব জয় করে ফেলা সম্ভব’এমন ধারণাও তাদের মধ্যে প্রবল।  

লক্ষীপুরে আওয়ামী লীগের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী নাকি নির্বাচনে তার সঙ্গে থাকার জন্য কর্মীদের মোটর সাইকেল ও বাড়ি করতে টাকা পয়সা বিলাচ্ছেন। এমন খবরও উঠে আসছে বিভিন্ন সামাজিক ও গণমাধ্যমে। তবে তাদের এসব টাকার সঠিক উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। এছাড়া গত নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে প্রদত্ত সম্পদ বিবরণীতে প্রার্থীদের যে সম্পদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বর্তমানে অনেক সংসদ সদস্যের তার থেকে কয়েকশগুণ বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন; এমন নজিরও রয়েছে ভুরি ভুরি। তাদের এ অর্থের কাছে জনগণকে নিয়ে কাজ করা রাজনৈতিক নেতারাতো নির্বাচনের মাঠে নৎসি। তাদের অর্থের কাছে ভেসে যাবে মানুষের জন্য কাজ করা নেতা ও তার অনুসারীরা। 

এজন্য এখন থেকে যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক সংসদ সদস্য প্রার্থীর নির্বাচন কমিশনে প্রদর্শিত সম্পদ বিবরণীর উপর লিখে দেন যে,  “এসব সম্পদের বাহিরে তার ও পরিবারের অঘোষিত সকল সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে।”এমন নিয়ম চালু করলেই কেবল নির্বাচন থেকে কালো টাকার মালিক ও পেশী শক্তির ব্যবহারকারীদের নির্বাচন থেকে হটানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন সচেতন সমাজ। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করলে নির্বাচনে কালো টাকার দৌরাত্ম কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কালো টাকা ও পেশী শক্তি এক অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে থাকে। যেখানেই কালো টাকার গন্ধ সেখানেই পেশি শক্তির উত্থান ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু বিগত দিনে দেখা গেল, নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কালো টাকার মালিক ও পেশী শক্তির অধিকারীদের ক্ষমতা খর্ব করতে নানা পন্থা অবলম্বন করে থাকে। এমনকি প্রতিটি নির্বাচনে একজন প্রার্থী কত টাকা খরচ করতে পারবেন; তাও নির্ধারণ করে দেওয়া আছে নির্বাচনী আইনের মাধ্যমে। নির্বাচনের পরে হিসেব দাখিলের বিধানও আছে তাতে। তবুও এসব পন্থা কতটুকু কার্যকর তা এখন প্রশ্ন সাপেক্ষ ব্যপার বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে এসব কালো টাকার মালিক ও পেশী শক্তির অধিকারীদেরই অনেক বেশি সক্রিয় দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এমপি প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের হিসাবের খাতায় এমন মুচলেকা হয়তো নিতে পারেন না। তবে তাদের কাছ থেকে দলীয় সভানেত্রী হিসাবে এমন মুচলেকা আদায় করতে পারলে দেখা যাবে অনেক প্রার্থীই নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে দৌঁড়ে পালাবে। 

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিটি আসনেই কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ জন করে এমপি প্রার্থী আছেন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই অবৈধ টাকার মালিক। হঠাৎ ধনী বনে যাওয়া এই লোকগুলোর কারণে নির্বাচনী পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে যদি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মুচলেকা নিতে পারেন যে, এমপি হওয়ার পর অস্বাভাবিক হারে কোনো আয়ের হিসাব পাওয়া গেলে তা সরকারি কোষাগারে চলে যাবে, তাহলে অনেকেই টাকার মায়া ত্যাগ করতে না পেরে নির্বাচনী মাঠ থেকে পালিয়ে যাবে। 

আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, এমপিদের সততা নিয়ে মানুষ এখন প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের নেত্রী (শেখ হাসিনা) যদি নির্বাচনের আগেই সবার কাছ থেকে এই মুচলেকাটা আদায় করে নিতে পারেন তাহলে কতজন প্রকৃতপক্ষে সৎ সেটা বুঝা যাবে। আমি সারাজীবন ধরে রাজনীতি করেও ২০ কোটি টাকার মালিক হতে পারলাম না। কিন্তু এমন অনেকেই আছেন যারা কোনোদিন রাজনীতির মাঠে ছিলেন না, হঠাৎ করে আওয়ামী লীগার বনে গিয়ে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। 

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য সচিব রাশিদুল আলম ভোরের পাতাকে বলেন, এই প্রস্তাবটি এর আগে কেউ কখনো দেয়নি। আমরা নেত্রীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। তিনি যদি মনে করেন অসৎ লোকদের এভাবে আটকিয়ে দিবেন তাহলে আমরা খুশিই হবো। 

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বে এখন উন্নয়নের রোল মডেল। দুর্নীতিবাজদের ঠাঁই এর আগেও আওয়ামী লীগে হয়নি। এবারও নেত্রী (শেখ হাসিনা) সৎ, যোগ্য ও মেধাবীদের মনোনয়ন দিবেন। যদি তিনি মনে করেন এমন মুচলেকা প্রয়োজন আছে তাহলে তা করতেই পারেন। আমরা যারা আদর্শিকভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার জন্য, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করি তাদের এমন মুচলেকা দিতে আপত্তি থাকবে না। কারণ সৎভাবে যা আয় করা যায় তা দিয়েই জীবন ধারণ করা সম্ভব। আর দেশে এখন আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে। দুর্নীতি করে টাকা আয় করার মাধ্যমে যারা আওয়ামী লীগের মধ্যে ঢুকে পড়েছে এবং নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করছে তাদের বিষয়ে এখনই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।

Ads
Ads