রেলের দুর্নীতি : সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে দুদককে

  • ২২-জানুয়ারী-২০২০ ১০:৩৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দুর্নীতিই যে রেলকে ডোবাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ রেলওয়েকে দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে এর উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রেলকে জনবান্ধব করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে বিনিয়োগ করছেন পর্যাপ্ত অর্থ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে রেলের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের আখের গোছানোর দৃষ্টান্ত। রেল থেকে দ্রুত দুর্নীতি দূর করা সম্ভব না হলে রেল যে সাবেকি অবস্থায় পড়েছিল সেখানেই তার অবস্থান দৃঢ় হয়ে থাকবে। একচুলও নড়বে না। কিন্তু আমরা জানি সরকার রেলের এ অবস্থা দেখতে চায় না। রেলকে আধুনিকায়ন করে সর্বগ্রাহ্য করে তুলতে ইচ্ছুক। এদেশের মানুষও চায় যাতায়াতে আরামদায়ক এ মাধ্যমটি উন্নতি করা হোক। যাদের দুর্নীতির কারণে রেল বছরে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছে তাদের চরম শাস্তি দেওয়া হোক। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তা ভালভাবে স্পর্শ করুক রেলকে। এখাতে যারা পায়ের উপর পা তুলে নিশ্চিন্তে দুর্নীতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত তাদের সহসা পাকড়াও করে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হোক। 

রেলের দুর্নীতি কতটা বেপরোয়া পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা গত মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবর থেকে অনুমান করা সম্ভব। দেশের পশ্চিম অঞ্চলে রেলে ছোট কাজে অবিশ^াস্য বড়ো ব্যয় ধরা হয়েছে। এতে পকেট ভারি হয়েছে পশ্চিম রেলের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির। এ ঘটনায় অবশ্য দুদক রেল ভবন থেকে নথি জব্দ করেছে। দুদকের এই তৎপরতায় আমরা সাধুবাদ জানাই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়-   

কাজ ছোটো, কিন্তু ব্যয় অবিশ্বাস্য বড়। হিসাবের পুরো চিত্রই বলে দিচ্ছে লুটপাটের সুনামি। এছাড়া কোথাও নামেমাত্র কাজ হয়েছে। আবার কোথাও কাজের অস্তিত্বই নেই। গায়েবি এসব কাজের বিপরীতে বিল উত্তোলন করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন এসব কাজের নথি রেলভবন থেকে জব্দ করে অনুসন্ধান করছে।
খবরে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে বহু কাজ টেন্ডার ছাড়াই পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের তৃতীয় শ্রেণির ঠিকাদার। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানা হয়নি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এসব দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হওয়ায় পশ্চিম রেলওয়েতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতির এ সিরিজ প্যাকেজে রয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। পশ্চিম রেলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েক কর্মকর্তা সিন্ডিকেট দুর্নীতির এ মহাযজ্ঞের নেতৃত্বে ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একটা ছোটো অফিসের টয়লেট মেরামত করে এক ঠিকাদার বিল নিয়েছেন প্রায় ২৮ লাখ টাকা। বারান্দার টিন বদল ও অফিসের টয়লেট মেরামত করে আরেক ঠিকাদার বিল নিয়েছেন ৭৩ লাখ টাকা। পশ্চিম রেলের এমন দুই শতাধিক গায়েবি খাতে ৭০০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

প্রশ্ন হলো সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মধ্যে পশ্চিমাঞ্চল রেলের অসাধু ব্যক্তিরা কি করে এত বড়ো দুর্নীতি করার সাহস পেল। এ রকম ঘটনা যে রেলের অন্যস্থানে ঘটছে না তাই বা কি করে অবিশ^াস করি আমরা। রেল সারা বিশে^ই যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। বলা চলে সবচেয়ে আরামদায়ক। চলাচলে যথেষ্ট নিরাপত্তাও পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রেলকে পঙ্গু করার কাজ শুরু হয় বিএনপি সরকারের সময়ে। বহু রুট বন্ধ করে দেওয়া হয় এই সরকারের সময়। এতে নতুন নতুন বিনিয়োগ করা তো হয়নি বরং দুর্ভাগ্যজনকভাবে রেলকে সংকুচিত করে পঙ্গু বানানো হয়। এতে দেশের মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সড়ক পথে। সড়কপথে যাতায়াতের চাপ বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনাও ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। সড়ক পথের চেয়ে রেলপথ অনেক নিরাপদ তা সাধারণ একজন মানুষও জানেন। আর এটা জানেন বলেই তিনি রেলপথেই যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে সর্বাগ্রে বেছে নেবেন। কিন্তু রেলপথের যে দুরবস্থা সকাল ৯টার ট্রেন ছেড়ে যায় কয়েক ঘণ্টা পরে। ট্রেনযাত্রার সময় সূচি ঠিক না থাকায় মানুষ সময়ক্ষেপণ না করে সড়ক পথকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়। এরপরে রয়েছে ট্রেনের গতি। এত ধীর গতিতে ট্রেন চলে যে যাত্রীরা সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ট্রেনে উঠে তাদের সময় নষ্ট হচ্ছে এটা তারা অনুধাবন করেন। ফলে এ কারণেও বাধ্য হয়ে বাসে চড়েন যাত্রীরা। দুর্নীতিসহ এই অবস্থার অবসান কবে শেষ হবে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারকে আর কালবিলম্ব না করে রেলের অযোগ্য, দুর্নীতিবাজদের এখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে জনগণের বৃহত্তরও স্বার্থে।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে যে দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। আশা করি, দুদক এসব উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। দুর্নীতিবাজরা কোনোভাবেই যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের না হয়ে যেতে পারে তার দিকেও দুদককে নজর রাখতে হবে। রেলের দুর্নীতি অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে দুদককে। 

Ads
Ads