যেভাবে আত্মহত্যার মিথ্যা ফুটেজ বানিয়ে 'আষাঢ়ে গল্প' ফাঁদে পুলিশ!

  • ২২-জানুয়ারী-২০২০ ০১:৩০ অপরাহ্ন
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা হেফাজতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক বাবুর (৪৫) মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নির্যাতনে বাবুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনদের দাবির পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, নিহতের গলায় কালো দাগ এবং পায়ে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্বজনদের দাবি, পুলিশ সিসিটিভির যে ফুটেজ দেখিয়ে আত্মহত্যার দাবি করছে, সেটিতে দেখানো ব্যক্তি বাবু নন। ঘটনা ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি ওই ফুটেজ তৈরি করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার বিচার দাবিতে গতকাল সোমবার সকালে বিএফডিসির সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বাবুর সহকর্মীরা।

তবে গতকাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, থানার হাজতখানায় আত্মহত্যা করেন বাবু। এর পরও কোনোভাবেই পুলিশ ঘটনার দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া কারো দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

গত রবিবার ভোরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল হাজতখানা থেকে বাবুকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, মৃতদেহের গলায় কালো দাগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাঁর মাথায় ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে এ আঘাত মৃত্যু ঘটানোর মতো নয়। মৃতদেহ থেকে নেক টিস্যু, ভিসেরাসহ আলামত সংগ্রহ করে হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট এলে সব মিলিয়ে পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনই মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না। এটি হত্যা না আত্মহত্যা তা পরে জানানো যাবে।’

বাবুর সাবেক স্ত্রী আলেয়া ফেরদৌসী অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভির যে ফুটেজ দেখানো হয়েছে তাঁর সঙ্গে বাবুর কোনো মিল নেই। কারণ ফুটেজের ওই লোকের পরনে জিন্স প্যান্ট ও অ্যাশ কালারের গেঞ্জি। আর বাবুর পরনে ছিল ট্রাউজার ও টি-শার্ট। সুতরাং ফুটেজটি সাজানো।’

এদিকে গতকাল সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিএফডিসির সামনের সড়ক অবরোধ করে বাবু ‘হত্যার’ বিচার চেয়ে বিক্ষোভ করেছেন বিএফডিসির সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অবরোধে অংশ নেওয়া বিএফডিসির ফ্লোর ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘মোটরসাইকেল চালনায় রত একটা সুস্থ মানুষকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়ার পর সেখানে কিভাবে তাঁর মৃত্যু হলো? থানার হাজতে তো তাঁর নিরাপদে থাকার কথা।’ জুনিয়র ক্যামেরা সহকারী মোতালেব হোসেন বলেন, ‘আমরা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আলী হোসেন খানের ফাঁসি চাই। কেন এমন ঘটল, তা জানতে চাই।’

বিএফডিসির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়নের নেত্রী ফিরোজা বেগম বলেন, ‘বাবুকে গ্রেপ্তার করা হলো শনিবার, তখনো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। মামলা হয়েছে রবিবার। মামলা হওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে। জানালার গ্রিলের সঙ্গে কেউ চাদর দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আবু বক্কর সরকারি কর্মকর্তা। ঢাকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেওড়াপাড়ার একটি কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, এমন চিঠিও আসছে। তাঁর সঙ্গে পুলিশ এমন আচারণ করল কিভাবে? আমরা এর বিচার চাই।’

এদিকে গ্রেপ্তার আসামি থানা হেফাজতে আত্মহত্যা করলে পুলিশ এর দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। গতকাল ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে ফুল দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। কমিশনার আরো বলেন, ‘তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) সোহেল রানা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘পুলিশি হেফাজতে যে কারণেই মৃত্যু ঘটুক না কেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্যদের কোনো গাফিলতি, বিচ্যুতি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁর বা তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

প্রসঙ্গত, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়া এবং ছবি তুলে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে এক নারী মামলা করার পর গত শনিবার এফডিসির ফ্লোর ইনচার্জ বাবুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাবু সেই রাতেই থানার হাজতে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য। স্বজনদের দাবি, অভিযোগকারী ওই নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বাবুর, যার কারণে সম্প্রতি স্ত্রীকে তালাকও দেন। বাবু ওই নারীকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। বিবাহিতা ওই নারী প্রতারণা করলে টাকা ফেরত চান বাবু। এতে পুলিশের সঙ্গে যুক্তি করে বাবুকে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে স্বজনরা।

Ads
Ads