ধর্ষণ মহামারি প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে

  • ৬-জানুয়ারী-২০২০ ১০:৪৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দেশ এগিয়ে গেছে। বিশ্বের দরবারে এখন বাংলাদেশের নাম সমুজ্জ্বল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদেশের অর্থনীতি এখন অনেক দেশের কাছেই অনুস্মরণীয়। অন্যদিকে সবক্ষেত্রেই আলোচিত হচ্ছে। দেশ থেকে সন্ত্রাস বিদায় নিয়েছে বলা যায়। জঙ্গিবাদকে কঠোরতায় দমন করা হয়েছে। এত সব অর্জনের মধ্যেও একদল বুনো জানোয়ার দেশের ওপর কালিমা লেপনে ব্যস্ত। অবশ্য এই বুনো জানোয়ারের দল সারা বিশ্ব জুড়ে বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে। দিনকে দিন ধর্ষণ, শ্লীলতাহানীর মাত্রা বেড়েই চলেছে। সহিংসতার ঘটনাও ঘটতে শোনা গেছে পরিবারে। আমাদের দেশেও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে এই মহামারি। কঠোর আইন, প্রচার-প্রচারণা ও উচ্চ আদালতের নানা ধরনের নির্দেশনার পরও সারা বিশ্বই যেন এখন এই বলয় ছিঁড়ে বের হতে পারছে না। গতকালও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে রাজধানীর কুর্মিটোলায় নির্মমভাবে ধর্ষণ হতে শোনা গেছে। এটা খুবই মর্মান্তিক। 

বাংলাদেশে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যেখানে ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যা আশঙ্কাজনক আর  ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। অন্যদিকে ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। এদিকে ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ নারী। নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭০ জন। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ হত্যার শিকার হয়েছেন ১৭ জন। আবার যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত বছর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ১৬৭ জন নারী। তাদের মধ্যে নির্যাতনে নিহত হন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন তিনজন। আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৪২৩ জন নারী। গত বছর ২০০ জন নারী স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হন।

২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। এর বাইরে অ্যাসিড নিক্ষেপ, ফতোয়া এবং সালিশি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন অনেক নারী। গত বছর তিনজন নারী ফতোয়ার কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মধ্যে একজন পরে আত্মহত্যা করেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে আমাদের দেশের  বিচারহীনতার সাংস্কৃতিকে দায়ী করেন। তবে রাষ্ট্র ও সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার আরও অনেক উপাদান আছে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটে তার একটি অংশ জানা যায় না। এ বিষয়ে কোনো মামলা হয় না। আর যেগুলোর মামলা হয় বিশেষ করে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সেখানে শতকরা মাত্র তিন ভাগ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত অপরাধী শাস্তি পায়। আর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শাস্তি হয় মাত্র শূন্য দশমিক তিন ভাগ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের কোনো ঘটনায় বিচার হয় না।’ 

ধর্ষক তারা ধর্ষিতার চেয়ে শক্তিশালী। এসব বাদ দিলেও পরিবেশ ও সৃষ্টিগতভাবেই পুরুষ পেশীগত শক্তিশালী। এজন্য নারীদের সামাজিকভাবে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পাড়ায় মহল্লায় সব স্তর থেকেই জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। শিশুকাল থেকেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও নৈতিকতার শিক্ষা জোরালভাবে পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। বাবা-মাকে তার সন্তানের প্রতি, সন্তানের কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। মাদক দমনের জন্য সমাজের প্রতিটি স্তর থেকেই কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি স্তর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই এই মহামারি দমন সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, রোগের চিকিৎসা হাসপাতালে সম্ভব, কিন্তু তা যদি মহামারি আকার ধারণ করে তবে ডাক্তারের পাশাপাশি সমাজকে সচেতনভাবে প্রতিরোধে অংশ নিতে হয়। 

Ads
Ads