‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান: আমরাও একমত

  • ১১-Dec-২০১৯ ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ
Ads


:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

হুমায়ুন আজাদ তার ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম (দ্বিতীয় সংস্করণ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘জয় বাংলা এমন একটি স্লোগান যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণকে তাদের মুক্তিসংগ্রামে প্রবলভাবে প্রেরণা যুগিয়েছিল। এর আগে বাঙালি কখনো এত তীব্র, সংহত ও তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান দেয়নি, যাতে একটি পদেই প্রকাশ পেয়েছে রাজনীতি, সংস্কৃতি, দেশ, ভাষার সৌন্দর্য ও জাতীয় আবেগ।’ আর মুনতাসির মামুন সম্পাদিত ‘কিশোর মুক্তিযুদ্ধ কোষ’ এ বলা হয়েছে, ‘জয় বাংলা স্লোগান ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির প্রেরণার উৎস। সফল অপারেশন শেষে বা যুদ্ধ জয়ের পর অবধারিতভাবে মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে জয় উদযাপন করত।

তবে কখন কীভাবে এই স্লোগানটির উৎপত্তি হয়েছিল তা সুনিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২০১১ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলনে বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের জয়বাংলা স্লোগান নজরুলের কবিতা থেকে নেওয়া।’ ২০১৫ সালে নজরুলের ১১৬তম জন্মবার্ষিকীতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো বলেন ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় যে জয় বাংলা স্লোগান দিতাম সেটি কবি নজরুলের একটি কবিতা থেকে বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন।’ ৮ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা ‘আ স ম আব্দুর রবের সাক্ষাৎকার’ থেকে জানা যায়, ৭ মার্চ ১৯৭০-এ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভার ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে প্রথম ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করেন। 

বিভিন্ন তথ্য জানাচ্ছে, ’৬৯-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমেদ ও চিশতী হেলালুর রহমান ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন। ২০০৭ সালে আফতাব আহমাদ স্মরণে শামসুদ্দিন পেয়ারা সম্পাদিত ‘নক্ষত্রের দিন শেষ হয়’ গ্রন্থের বিভিন্ন লেখায় এ কথাই বলা হয়েছে। ‘জয়বাংলা স্লোগাননে বেঁচে থাকবে আফতাব’ শিরোনামে গ্রন্থের ভূমিকায় শামসুদ্দিন পেয়ারা লিখেছেন, ‘জয়বাংলা স্লোগাননটির একক উদগাতা ছিল আফতাব’।  ওই গ্রন্থের ‘তিন যুগের বন্ধু’ নিবন্ধে মুহাম্মদ জালাল স্লোগানটি প্রথম উচ্চারণ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘(১৯৬৯-এর) সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখে মধুর ক্যান্টিনে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।  মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে সভা চলছে। বাইরে আফতাব ভাই অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন।  চিশতি হেলালুর রহমানকে ডেকে শলা পরামর্শ করলেন।  চিশতি ভাইকে মধুর ক্যান্টিনের এক প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিলেন।  নিজে অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুললেন ‘জয় বাংলা’।

অপরপ্রান্ত থেকে চিশতি ভাই ‘জয় বাংলা’ বলে সাড়া দিলেন।  এভাবে আফতাব ভাইয়ের তৈরি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান  স্লোগানে পরিণত হয়।  জয় বাংলা স্লোগানটি প্রথম উচ্চারিত হওয়ার সময়, যতদূর মনে পড়ে, আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম। আবার নাও থাকতে পারি। হয়তো পরে এসে শুনেছি।  তখনকার মিছিল-মিটিংয়ে আমরা নেই- এমন খুব কমই ঘটেছে।  কাজেই, কোন ঘটনাটি আমাদের সামনে ঘটেছে, কোন ঘটনাটি পরে এসে শুনেছি- পরে সুনির্দিষ্ট করে মনে করতে পারিনি। এ ধরনের বিভ্রম সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।’

‘জয় বাংলা’র আগে বর্ষীয়ান জননেতা মাওলানা ভাসানী ‘স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ’, ‘আযাদ বাংলা জিন্দাবাদ’ প্রভৃতি স্লোগান ব্যবহার করতেন। ১৯৭১-এর মার্চ থেকে জনসভা, মিছিলে এবং প্রচারণার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষরসংগীত ছিল ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহ্মদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ হয়েছিল ‘জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে। আজও স্লোগানটি সমানভাবে রাজনৈতিক স্লোগান হিসাবে ব্যবহার হয়। 

গতকাল বাঙালির রক্তে শক্তি সঞ্চারণকারী এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে আসছে ১৬ ডিসেম্বর থেকে সর্বস্তরে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত বলে অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি এ এম কামরুল কাদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রুলের শুনানিতে এই অভিমত দিয়েছেন। ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা চেয়ে দুই বছর আগে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বশির আহমেদ। রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল দেন। সে সময় ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান কেন ঘোষণা করা হবে না, তা রুলে জানতে চান হাইকোর্ট। ওই রুলের ওপর শুনানিতে গতকাল এই অভিমত দেওয়ায় স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ভাসিত আপামর জনসাধারণ গৌরবান্বিত হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ‘জয় বাংলা।’

Ads
Ads