উচ্ছৃঙ্খলমুক্ত হোক সব বিশ্ববিদ্যালয়

  • ১৪-Nov-২০১৯ ১০:৪২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের অভ্যস্তরা আবরারকে কয়েক দফায় পিটিয়ে হত্যা করে। এই ‘র‌্যাগিং প্রথা’ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে। কেউ সালাম না দিলে, দ্বিমত পোষণ করলে, তাদের সামনে হাসলে ইত্যাদি কারণে র‌্যাগিংয়ের নামে তারা নতুনদের নির্যাতন করা হয়। র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে প্রতি বছর অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য থেকে জানা যায়। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব ভূমিকায় থাকে, যেভাবে নীরবতা পালন করেছে বুয়েট প্রশাসনও। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত।’ ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল বলেন, ‘কোনো একক কারণে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়নি। তিনি (আবরার) শিবির করেন কি না, হত্যার পেছনে এটি একটি মাত্র (অন্যতম) কারণ।’ আমরা জানতে পেরেছি, অভিযুক্তরা র‌্যাগিংয়ের নামে নতুনদের আতঙ্কিত রাখতে এসব কাজ করেন। অথচ এসব বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন আগে কোনো অভিযোগ পায়নি। বিষয়টি মারাত্মক ‘শক্’ সৃষ্টি করে।  এই যে এত এত সংবাদ প্রকাশ হলো, নির্যাতিতরা পুলিশের কাছে না গিয়ে কেন তবে সংবাদ মাধ্যমে জানাল তাদের অভিযোগ? আমরা চাই সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় শিক্ষা ব্যবস্থা সুনামের সঙ্গে বহমান থাকুক। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এমন ঘটনা আর না ঘটুক। নির্যাতিতদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে মাঝে মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রেখে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মত বিনিময় চালু করে সঠিক নিরাপত্তা দেওয়া দরকার। কোনো অবহেলাতেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে কোনোভাবেই যেন আর প্রশ্নবিদ্ধ না করা হয়।

আবরার হত্যার ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী ৬ অক্টোবর দিনগত রাত ৩টার দিকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়। পরের দিন রাতে আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সন্দেহে ১৯ জনের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে তদন্তে নামে ডিবি। আর তার মাত্র ৩৮ দিনের মাথায় গত বুধবার অভিযোগপত্র আদলতে দিয়েছে পুলিশ। এত অল্প সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়াটা প্রশংসনীয়। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি রাত ১০টার পর থেকে আবরারের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ২টা ৫০ এর দিকে ডাক্তার তাকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে পেটানো হচ্ছিল।’ পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যায় যারা রড দিয়ে পিটিয়েছিল তাদের ফাঁসি হয়েছে। অভিযুক্ত কয়েকজন আবার খালাসও পেয়েছে। সেই মামলায় আমরা তেমনভাবে সিসিটিভি ফুটেজ পাইনি। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণের জন্য ট্রেডিশনাল তদন্ত বা চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। আবরার হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন, তদন্ত সহায়ক দল ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য প্রমাণ, ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপের তথ্য রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, পাশাপাশি ৮ জন আসামির বক্তব্যও হত্যাকাণ্ডের অনেক বিষয় প্রমাণ করে, যদিও এ ধরনের ঘটনায় চাক্ষুষ সাক্ষী থাকলেও সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসে না। কিন্তু আমরা যেভাবে চার্জশিট প্রস্তুত করেছি আশা করছি সবার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে। মনিরুল ইসলাম বলেন, আবরারকে হয়তো একটু আগে হাসপাতালে নিয়ে গেলে এমন নৃশংস পরিণতি হতো না। মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, আবরার হত্যায় সরাসরি অংশ নেন ১১ জন। বাকি ১৪ জন হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত রয়েছেন।’ এ ঘটনায় ২৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ। আসামি ২৫ জনের মধ্যে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। আবরারকে হত্যায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১১ জন। এরাই আবরারকে কয়েক দফায় মারপিট করেন। বাকি ১৪ জন বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

এখন আবরার মামলার বিচারিক রায়ও খুব দ্রুততার সঙ্গে জানানো হলে এবং আসামীদের অপরাধ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলে আগামীতে আর কেউ এমন পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধররা।  

Ads
Ads