দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত বাংলাদেশ

  • ৯-Nov-২০১৯ ১১:০৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একটা সময় ছিল, ঘূর্ণিঝড় এসে তছনছ করে দিত দেশ। লন্ড-ভণ্ড পরিবেশে খুঁজে পাওয়া যেত অনেক মানুষের লাশ। সে লাশের বহরে থাকত বৃদ্ধ, শিশু, নারীরাও। নামমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র করা হতো। সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করত আশ্রিতরা। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের হাল ধরার পরপরই দুর্যোগ মোকাবিলায় নানা পরিকল্পনা হাতে নেন। দুর্যোগপ্রবণ এলাকাতে তৈরি করার নির্দেশ দেন আশ্রয়কেন্দ্র। যেগুলো সুষ্ঠুভাবে তৈরি হয়। দুর্যোগ-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিনিয়োগ, দুর্যোগের পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন, দুর্যোগের প্রস্তুতি ও উদ্ধার কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবীদের নিবেদিত প্রচেষ্টাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাংলাদেশকে বিশ^দরবারে রোল মডেল করে গড়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের পরিবর্তে টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনানীতি বাংলাদেশকে এই গর্বের স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকে কেন্দ্র করেও সরকার ব্যপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সব ধরনের সমস্যা ও আশঙ্কার ওপর নির্ভর করে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। 

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও ভৌগোলিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, টর্নেডো, বজ্রপাত, ভূমিধসের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাংলাদেশের অত্যন্ত বেশি। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সাইক্লোনটি আঘাত হেনেছিল ১৯৭০ সালে। তাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সে সময় দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা ১৯৭২ সালে সাইক্লোন প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) প্রস্তুত করেছিলেন। বর্তমান সরকার এই মডেলই অনুসরণ করছে। 

জার্মানওয়াচ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০১৭ অনুযায়ী ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বে ১১ হাজার ৫০০ আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ হয়েছে। এতে প্রায় ৫ লাখ ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯ নম্বরে। অথচ ২০১৪ ও ১৫ সালে পরপর দু’বার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬ নম্বরে। 

বর্তমানে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় আকারের মানবিক সংকটের ঘটনা বাড়ছে। তাই এ অঞ্চলে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অসামরিক-সামরিক সমন্বয়ের গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সার্বিক জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, আনসার-ভিডিপি, বাংলাদেশ স্কাউটস, বিএনসিসির সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। গত কয়েক বছরে ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ পরিচালনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২৩৬ কোটি টাকার সরঞ্জাম কিনে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও অন্যান্য সংস্থাকে দিয়েছে। পাশাপাশি যানবাহন দুর্ঘটনা, অগ্নিকা-, ভবন বা সেতু ধস, সন্ত্রাসী আক্রমণের মতো ‘মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ’ মোকাবিলার জন্যও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। 

গতকাল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানতে পারে জেনে তার আগের দিনই সাত জেলার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত বলে ঘোষণা দেন দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। একই সঙ্গে ২২ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরণের ছুটি বাতিল করা হয়। ১৩ জেলায় স্থানীয় সরকার বিভাগের ছুটি বাতিল করা হয়। গতকাল আকাশ পথেও সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কক্সবাজার, মংলা বন্দরসহ সব বন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। বরিশালে অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। তাদেরকে ‘জোর করে’ আশ্রয় কেন্দ্র নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া নৌ-যুদ্ধ জাহাজও প্রস্তুত রাখা হয়েছে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য।

আওয়ামী লীগও দুর্যোগ মোকাবিলায় আগে থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করতে এবং জনগণের সুরক্ষা দিতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করার প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছে।’ ঘূর্ণিঝড়টি যাতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক না হয়ে ওঠে সেজন্য সকলকে সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

Ads
Ads