কৃষিজমি বাঁচাতে হবে

  • ৭-Nov-২০১৯ ১০:৩২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। এ তিন-চতুর্থাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষি বিপণন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে। বাংলাদেশে বর্তমানে অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং নগরায়ণের ফলে ক্রমেই কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও দোকানসহ বিভিন্ন রকমের স্থাপনা। এদিকে জলাধার, বন, পাহাড় রক্ষায় আইন ও নীতিমালা থাকলেও সরকারের মনিটরিংয়ের অভাবে এর তোয়াক্কা করছেন না কেউ। দ্রুত ভূমি রক্ষায় সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ না করলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে মধ্য আয়ের দেশে শিল্পের বিপ্লব থাকবেই। এ ক্ষেত্রে কৃষিজমির ওপর প্রভাব পড়ার খুব সম্ভাবনা থাকে। কৃষি ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে এ প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপনের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে বলেছেন, যেখানে-সেখানে শিল্পকারখানা করতে দেওয়া হবে না। দেশের প্রয়োজনে আমরা শিল্পায়ন করব। আমরা উন্নত হব, শিল্পায়নে যাব। কিন্তু কৃষি ও কৃষককে ত্যাগ করে নয়। কৃষিকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের শিল্পায়ন করতে হবে। কারণ কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। খাদ্য দেয়, পুষ্টি দেয়, সবকিছু করে। তাই আমাদের কৃষিজমি বাঁচাতে হবে। ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে হবে। কৃষি জমি নষ্ট করা যাবে না।

বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের জন্য চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশই হুমকির মুখে। বাণিজ্যিক কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৯৬ বিঘা কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। রূপান্তরিত জমির পুরোটাই অকৃষি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জলাশয় ভরাট করে প্রতিদিন মোট কৃষিজমি কমছে ৯৬ বিঘা। পাশাপাশি তামাক চাষের কারণে প্রতিদিন ৯ হাজার একর কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে।

অথচ এ দেশের মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর। বিভিন্ন গবেষণার তথ্যানুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বাড়ছে। আর প্রতিবছরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক হাজার হেক্টর জমি। পরিসংখ্যান বলছে, মোট ৮ দশমিক ৫২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি আছে। এ জমিতেই দেশের কৃষকরা কৃষিপণ্য উৎপাদন করে থাকেন এবং দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয় এ জমিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য দ্বারা। প্রতিবছর দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদ যোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৪০ বছরের এ জমির পরিমাণ কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের জন্য কৃষিজমি অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি। তাদের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক। প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভাগওয়ারি অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। এ বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে ৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রতিবছর অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে।

প্রস্তাবিত কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে কৃষি জমিতে আবাসন, শিল্পকারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনোরকম অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। জমি যে ধরনেরই হোক না কেন, তা কৃষিজমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। দেশের যেকোনো স্থানের কৃষিজমি এ আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে এবং কোনোভাবেই তা ব্যবহারে পরিবর্তন আনা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই উর্বর জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া যাবে না। যেকোনো ধরনের জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। আইনে বিচার ও দ- হিসেবে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘনকারী বা সহায়তাকারীর অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদ- বা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবে। এ আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য হবে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা বা বন ও মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মামলা করতে পারবেন। তারপরও আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। নগরায়ণের কারণে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে ইটের ভাটা। রাজধানীসহ সারা দেশে পরিকল্পনাহীনভাবে ইটভাটা গড়ে উঠছে। পরিবেশ অধিদফতরের হিসেবে দেশে ইটখোলা আছে ৪ হাজার ৫১০। এগুলোয় প্রতিবছর পোড়ানো হয় অন্তত ৩ হাজার ২৪০ কোটি ইট। ইটপ্রতি মাটির পরিমাণ গড়ে তিন কেজি ধরলেও সাড়ে ১৩ কোটি টন মাটি লাগে, যে কারণে বছরে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমি (দুই ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি কাটা হলেও) ফসল উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়। কৃষিবিদ ও মৃত্তিকা গবেষকরা বলেছেন, ৬ হাজার ইটখোলার দখলে রয়েছে (প্রতিটি গড়ে সোয়া আট একর) প্রায় ৫০ হাজার একর আবাদি জমি। আইন লঙ্ঘন করে স্থাপন করা হচ্ছে অপরিকল্পিত শিল্প কারখানা। বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার রাজধানী পার্শ্ববর্তী হওয়ায় যত্রতত্র গড়ে উঠছে আবাসন প্রকল্পসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রকল্পে কৃষিজমি গ্রাস করায় এ এলাকায় দ্রুত কমছে আবাদযোগ্য জমি। নতুন আবাসন এলাকাগুলো আবাসনের উপযোগী করে তোলার জন্য মাটি ভরাট করতে হয়।

পরবর্তী সময়ে এ জমিগুলো আর চাষাবাদের যোগ্য থাকে না। সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশের কৃষিজমি শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে অকৃষিতে পরিণত হয়েছে। তা ছাড়া ঢাকা-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী-মুন্সিগঞ্জ-মানিকগঞ্জসহ আশপাশের জেলাগুলোতে দ্রুত কৃষিজমি কমছে। আগামী ৫ বছর পর ঢাকার আশপাশে কৃষিজমি বা কোনো জলাশয় থাকবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। রাজধানীর গ্রাম হিসেবে এক সময় পরিচিত ছিল ডেমরা, কোনাপাড়া, সারুলিয়া, শনিরআখড়া, মান্ডা, মুগদা, পূর্ব রাজারবাগ, মিরপুরসহ বেশকিছু এলাকা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এখন এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
মধ্যমআয়ের এই দেশে শিল্প বিপ্লবকে সঙ্গে রেখেই কৃষিজমিকে রক্ষা করতে সরকারের যে চেষ্টা তা ইতোমধ্যেই প্রশংসিত। দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও যেন অনাবাদি পড়ে না থাকে সেজন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি।

শিল্পকারখানা করার দরকার হলে সেখানে আমরা প্লট দিয়ে দেবো। তিনফসলি জমিতে কখনই শিল্পকারখানা হবে না। আমাদের কৃষিজমি বাঁচাতে হবে, মানুষকে খাওয়াতে হবে। আর খাদ্য চাহিদা কোনোদিন শেষ হয় না। জনসংখ্যা বাড়বে, খাদ্যের চাহিদাও বাড়বে। কাজেই একটি দেশের জন্য, একটি সমাজের জন্য কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখনো অনেকাংশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষিজমি নষ্ট করে কোনো স্থাপনা বা শিল্পকারখানা করা যাবে না।

Ads
Ads