‘আইন মেনে চালাবো গাড়ি, নিরাপদে ফিরবো বাড়ি’

  • ১-Nov-২০১৯ ১০:২২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

মহাসড়কে একের পর দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সড়ক, সংযোগ-সড়ক এমনকি অলিগলিও বাদ পড়েনি। চলতি বছরের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তা কৃষ্ণা রায় চৌধুরী বাংলামোটরের ফুটপথে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু ফুটপথও তাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাসের চাপায় এক পা হারিয়ে দীর্ঘ ৪৮ দিন পর হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন তিনি। এ ঘটনায় ওই ঘাতক বাস ট্রাস্ট পরিবহনের মালিকপক্ষ সামান্য কিছু টাকা দিয়ে দফারফা করতে চেয়েছিল। এরআগে গত বছর বাড্ডায় এক শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পিসে চলে গেলে সরব হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করে প্রশাসনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন সড়কের অনিয়ম। সে সময় তাদের অনেকগুলো দাবির মধ্যে বাসচাপায় হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের দাবি জানান। দীর্ঘ আন্দোলনের পর তাদের দাবি মেনে নিয়ে একটি সড়ক আইন পাস করা হবে বলে জানানো হয়। গতকাল সড়কে ৭৯ বছরের পুরানো মোটরযান অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন কার্যকর করা হয়েছে, যে আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালকের কারণে মৃত্যু হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। আর যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাকা- ঘটায়, তাহলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- রাখা হয়েছে। বিআরটিএ থেকে গতকাল বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতেও এ নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। তার আগে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আইনটি কার্যকর করতে নির্দেশনা দেন।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম গতকাল নতুন আইনটি নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আইনটিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে ১ নভেম্বর থেকে এটি কার্যকর করতে আর কোনো বাধা নেই। এর আগে দীর্ঘদিন থেকে আইনটি মন্ত্রণালয়ে কার্যকরের অপেক্ষায় ঝুলে ছিল। গত বছর ঢাকায় বাসচাপায় দুই ছাত্র-ছাত্রীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে আগের আইন কঠোর করে ২০১৮ সালে এই আইনটি করা হয়েছিল। সে সময় নিরাপদ সড়ক, ঘাতক বাস চালকদের বিচার করাসহ ৯ দফা দাবিতে চারদিন ধরে রাজধানীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের ৯ দফা দাবিগুলো হলো- ১. বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ড্রাইভারকে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই বিধান সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। ২. নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। ৩. ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবেন না। ৪. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না। ৫. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভারব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৬. প্রত্যেক সড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিডব্রেকার দিতে হবে। ৭. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। ৮. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগনাল দিলে থামিয়ে তাদের নিতে হবে। ৯. শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

এসব দাবির পর গত বছর আগস্টে আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ এর গেজেট প্রকাশ হয়। এই আইন অনুযায়ী, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে এ সংক্রান্ত অপরাধ দ-বিধি ১৮৬০ এর এ সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে দ-বিধির ৩০৪ বি ধারাতে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবে। আইনের ১১৪ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮) প্রযোজ্য হবে। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পরও আইনটি কার্যকর না হওয়ায় আদালতে রিট আবেদনও হয়েছিল।

আইনটি প্রণয়নের পর থেকে তার প্রবল বিরোধিতা করে আসছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনার মামলায় নতুন আইনে শাস্তির মাত্রা ‘অযৌক্তিক’ বেশি। এরপর গত ২৫ সেপ্টেম্বর পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে উপ-কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইন সংশোধনের সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের কাছে দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে পরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব তখন নাকচ করে দেন। এরপরই আইনটি গতকাল কার্যকর করা হল।

যদিও ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবেন না’ বলে যে দাবি রেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা তা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সচেষ্ট হবেন। এ নিয়ে আইন রয়েছেই, প্রয়োজন বাস্তবায়ন। যেটা হচ্ছে না বলেই প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পাওয়া গিয়েছে গাড়ির ফিটনেস না থাকা।  এদিকে টাউন সার্ভিসসহ বিভিন্ন বাসে অতিরিক্ত যাত্রী এখনো তোলা হয়। স্টপেজ ছাড়াই যাত্রী ওঠানামার জন্য থামানো হয়। সেক্ষেত্রে আমাদেরকেই সচেতন হতে হবে। আমরা যদি না নামি বা উঠি তবে গাড়ি কিন্তু দাঁড়াবে না। 

‘আইন মেনে চালাবো গাড়ি, নিরাপদে ফিরবো বাড়ি’ যেমন মেনে চলে গাড়ি চালাতে হবে, ঠিক তেমনই যাত্রী হিসেবেও আমাদের জানের নিরাপত্তায় সঠিক স্টপেজে দাঁড়াবো, নিরাপদে পার হবো- এমন কিছু মানসিকতায় আনা অতি আবশ্যক।

Ads
Ads