সাংবাদিকতা মহৎ পেশা : কলম জেগে থাকুক দেশের কল্যাণে

  • ৩০-Oct-২০১৯ ১০:২৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

পৃথিবীর কয়েকটি মহৎ পেশার মধ্যে অন্যতম সাংবাদিকতা। ‘সমাজের দর্পণ’ বলে অভিহিত সংবাদপত্র এবং বর্তমানে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল। ঘটে যাওয়া ঘটনা, ভবিষ্যতের বিশ্লষণও উঠে আসে সংবাদকর্মীদের কলমে। মানুষ সচেতন হয়। বিবেকবর্জিত হয়ে উঠলে একটি সংবাদ বিবেককে নাড়া দেয়। সংবাদকর্মীদের চোখ অপরাধ দমনেও সহযোগিতা করে। আর সেই মহৎ পেশায় কিছু অসাদু ব্যক্তির অনুপ্রবেশে পবিত্র পরিবেশ হয়ে উঠেছে অপবিত্র। বহুবার বহু সময় এসব বিষয়ে আলোচনা সমালোচনা হলেও সমাধা হয়নি। তবে এবার যদি কিছু হয়। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারিতে পড়েছে বেশ কিছু সাংবাদিক। আর বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও পৌঁছেছে অভিযোগ। তিনি ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনের অভিজ্ঞতা জানাতে গত মঙ্গলবার গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘এক সম্পাদক এক ব্যাংকের এমডিকে হুমকি দিয়েছেন’ বলেও জানিয়েছেন। 

সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা, দলীয় আনুগত্য, পেশাদারি, সম্পাদকের প্রাক-যোগ্যতা, গণমাধ্যমের রাজনৈতিক ভূমিকা ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে। এই আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে একটি সর্বজনমান্য নীতিমালা তৈরি করার দাবিও ওঠে। কিন্তু সেখানে দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিক সমাজ পক্ষ-বিপক্ষ দুইটি দলে ভাগ হয়ে যায়। অথচ এই মহৎ পেশার জন্য তৈরি হওয়া উচিৎ ছিল খুব কড়াকড়ি নীতিমালা। গত বছর সাভারে ‘অনেক চিহ্নিত সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ নামসর্বস্ব পত্রিকার পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। আবার কেউ কেউ কার্ড সংগ্রহ করে নিজেদের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক হিসেবে জাহির করে বেড়াচ্ছেন’ বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের উপস্থিতিতে স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ কথাগুলো তুলে ধরে অপসাংবাদিকতা রোধকল্পে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী হলুদ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, ‘হলুদ সাংবাদিকতা ও নীতিভ্রষ্ট সাংবাদিকতার জন্য পেশাদারদের ওপর কালিমা লেপন হচ্ছে। এদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’ কিন্তু তারপরও সেখানে থেমে নেই অপসাংবাদিকতা। শুধু সেখানে নয়, সারা দেশেই এমন অনেক সাংবাদিক রয়েছেন। যার কয়েকজনের তালিকা এখন গোয়েন্দাদের হাতে। তারা নজরদারিতে এসেছেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে একজন সম্পাদক। কিছু সাংবাদিক রয়েছেন ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতও আছেন এক শ্রেণির সাংবাদিক। নজরদারিতে থাকা সাংবাদিকরা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে অনেক সাংবাদিকের নামও প্রকাশ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে বা শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফোন করে মোটা অঙ্কের চাঁদাও চেয়েছেন। এ ধরনের কথোপকথনের রেকর্ডও গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। 

চলমান ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ বাদ যাবে না। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা হবে। ইতোমধ্যে তাদের সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জানা গেছে, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িত সাংবাদিকরা নিয়মিত টাকা নিয়ে আসতেন। অনেকে তাদের পক্ষে রিপোর্টও করেছে। আবার কারো কারো বিরুদ্ধে টাকা না পেয়ে রিপোর্ট করার তথ্য-প্রমাণ গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, ক্যাসিনো খেলতেন অনেক সাংবাদিক। এমন ছবিও তাদের কাছে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জাতীয় দৈনিকের এক সম্পাদক এক ব্যাংকের এমডিকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, টাকা না দিলে সব তথ্য ফাঁস করা হবে। তার জীবনটাই নাকি শেষ করে দেবে ওই সম্পাদক।’ বাংলাদেশে যেখানে এক হাজারের বেশি সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে, ৩২টির বেশি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চলছে, বাংলাদেশে ক্যাসিনো বসিয়ে জুয়ার আসর চলার খবর কেন কেউ আগে প্রকাশ করল না- সেই প্রশ্নও রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। আর ‘দুদকের কাছে ১০০ জনের তালিকা জমা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী’ পত্রিকায় প্রকাশিত এমন খবরের উল্লেখ করে এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান আরও কতজনের নামের তালিকা আপনার হাতে আছে? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কত জনের তালিকা আছে আমি এটা কেন বলবো। তবে এটুকু বলতে পারি, কোনো এক পত্রিকার সম্পাদক কোনো এক ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে ফোন করে বলেছে, কিছু একটা টাকা চায়, সেটা যদি না দেওয়া হয়, তবে তার বিরুদ্ধে এমন লেখা লিখবে, যে তার জীবটাই ধ্বংস করে দেবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সে নামটা নিশ্চয়ই শুনতে চাইবেন না এখন। সেটা বের হোক তারপরে জানবেন। ব্যাংকের এমডিকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে, চেয়ারম্যানকে বলতে যে, কত দিতে হবে। না দিলে তার বিরুদ্ধে লেগে যাবে। নামটাম সবই আছে। রেকর্ডও আছে।’ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘আপনারা এত খবর রাখেন, তো এইরকম আধুনিক আধুনিক সব যন্ত্রপাতি এসে গেছে, এত কিছু হলো, আপনারা কেউ খবর রাখলেন না? কেউ খবর পেলেন না? কোনোদিন কেউ তো নিউজ করলেন না। কীভাবে হয়?’

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দক্ষ পরিচালনায় বাংলাদেশকে শুধু এগিয়েই নিয়ে যাচ্ছেন না, এর সব ক্ষেত্র পবিত্র করছেন, সাফসাফাইয়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখেই সব ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করছেন। তিনি কোনো জঞ্জাল কোথাও দেখতে চান না। মানুষের দুর্ভোগ কোনোভাবেই তিনি বরদাস্ত করেননি, করবেনও না। আর তাই মহৎ পেশা সাংবাদিকতাকেও তিনি পবিত্র দেখতে চান।

Ads
Ads