গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুলের ভয়ঙ্কর দুর্নীতিচিত্র (পর্ব-১)

  • ২০-Oct-২০১৯ ১১:২৮ অপরাহ্ন
Ads

আঁতাতে কাজ মিলেছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পলাতক আসামিরও

:: জিএম রফিক ::

গণপূর্ত অধিদফতরের রংপুর জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির ভয়ঙ্কর চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে পুরানো দিনের ইতিহাসও। রাজধানী ঢাকা ডিভিশন-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন তার সঙ্গে আঁতাত করে কাজ পেয়েছেন দুর্নীতিবাজ ও চিহ্নিত ঠিকাদাররা। তার সঙ্গে আঁতাতের ফলে ২১ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত  পলাতক আসামিও পেয়েছেন কাজ। ২০০৮ সালে এদেরই একজন মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনের শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল নির্মাণের যে কাজ পান তা এই দুর্নীতির অকাট্য দলিল। আজ থাকছে এর প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে আসছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন সময়ের আশরাফুলের দুর্নীতিচিত্র। 

জানা যায়, কায়কোবাদ ও বিসিএস ১৫তম ব্যাচের প্রকৌশলী আশরাফুল আলম নিজেদের মধ্যে যোগসাজসে মানহীন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নির্মাণ করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালটি। যার যাবতীয় দুর্নীতি ও অনিয়ম এই প্রকল্পের আইএমইডি প্রতিবেদনে ধরা পড়ে। দুর্নীতি ও অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে একনেকের তদন্ত কমিটিও। যে তদন্তসূত্র মতে জানা গেছে, উচ্চ দর দেখিয়ে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ওই কর্মকর্তা। তিনি সে সময়ও রাজধানীর ডিভিশন-১ এর দায়িত্বে ছিলেন।

সূত্র জানায়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ২০১২ সালের ১২ জুন হাসপাতাল নির্মাণ কাজ পরির্দশন করেন। এসময় তারা ১০তলা বিশিষ্ট মূল হাসপাতাল ভবন, ডাক্তারদের জন্য ৬ তলা আবাসিক ভবন, স্টাফদের ৬ তলা আবাসিক ভবন ও নার্সদের ডরমেটরি নির্মাণ কাজে নানা ধরনের ত্রুটি দেখতে পান। পরে ওই প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরির্দশনের একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেন একনেকে। তাতে অভিযোগ আনা হয়, উচ্চ দর দেখিয়ে নিন্মমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে বাস্তবায়ন করা হয়েছে পুরো প্রকল্পটি। অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুভাষ চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে একনেক। কমিটির অন্য সদস্যারা হলেন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শফিউল বারী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি মো. আহসান, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক ডা. মো. আখতারুজ্জামান, পরিকল্পনা কমিশনের অর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের একজন প্রতিনিধি, গণপূর্ত অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা, স্থাপত্য অধিদফতরের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুবিভাগের উপপ্রধান ডা. মোহাম্মদ খাইরুল হাসান।

দুর্নীতি তদন্তে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত কমিটি সরেজমিন পরির্দশনকারী দলের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী বরাবর তদন্ত প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়। এতে তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেন। ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট একনেকে চূড়ান্ত প্রকল্পটি ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির বরাবারে অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স শাহ ইসলাম কনস্ট্রাকশনের অধীনে আরো ৪টি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী নির্মাতা হিসেবে চুক্তিপত্রে দেখানো হয়। এদের মধ্যে মেসার্স রফিক ট্রেডার্সকে চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, মেসার্স জ্যাকো কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স ইন্সটেন্সের নামে দেওয়া হয় স্টাফদের আবাসিক ভবন, মেসার্স খলিলুর রহমান নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বরাবরে বরাদ্দ দেওয়া হয় নার্সদের জন্য ডরমেটরি নির্মাণের কাজ। আরও জানা যায়, ঠিকাদার কায়কোবাদকে পেছনে রেখে তার লাইসেন্স ব্যবহার করে আশরাফুল আলম নিজের লোক দিয়ে যৌথভাবে চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের কাজ করেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদফতরের একটি সূত্র জানায়, আশরাফুল আলম বিএনপির সমর্থক, একনিষ্ঠকর্মী ও অর্থদাতা। তার বাড়ি বগুড়ায়। অথচ তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে চলেন। বর্তমানে নিজ কর্মস্থল রংপুরে অবস্থান না করে ঢাকায় অবস্থান করছেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকায় বদলি হয়ে আসার জন্য জোর তদবিরও চালাচ্ছেন প্রকৌশলী আশরাফুল। রাষ্ট্রীয় পদবি ব্যবহার করে কৌশলে ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে মানহীন সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকেন আশরাফুল আলম। গণপূর্তের শেরেবাংলা নগর ডিভিশন-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৯ এর ৬ আগস্ট পর্যন্ত (সংসদ ভবন) ৩ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে ৩শ জনকে ভাউচার ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেন। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে, মোটা উৎকোচের বিনিময়ে ধামাচাপা দেন আশরাফুল। এছাড়া তিনি ভুয়া বিল, ভাউচারে বিভিন্ন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে কাজ না করেই টাকা উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করেন।

সূত্র আরও জানায়, রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলে ওয়াহিদুল ইকবালসহ নির্দিষ্ট বেশ কয়েকজন ঠিকাদার রয়েছেন। যাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ব্যবসা করেন আশরাফুল আলম। সার্কেলে থাকার সময় আশরাফুল সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে প্রতিমাসে আপ্যায়ন বাবদ ৮০ হাজার টাকা করে আদায় করতেন। এছাড়া প্রতিটি প্রকল্পে ১৫ শতাংশ কমিশন নিতেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকোশলী থেকে পদোন্নতি পাওয়ার কিছুদিন আগে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঠিকাদারকে প্রায় ১শ কোটি টাকার কাজ দিয়ে কমিশন তুলে নেন তিনি। ফান্ডে অর্থ না থাকায় সেই ঠিকাদাররা এখন পড়েছেন চরম বিপাকে।

জানা যায়, আশরাফুল আলম প্রেষণে গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে কিছুদিনের জন্য জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে চাকরি করেছেন। যাতে তার আগের সবকিছু ধামাচাপা পড়ে। পরবর্তীতে পদোন্নতি নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্তে যোগ দেন। অবৈধ উপার্জনের টাকায় আশরাফুল আলম নিজ জেলা বগুড়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (বিপণি বিতান) গড়ে তুলেছেন। স্ত্রীর নামে ঢাকায় প্রায় দেড় কোটি টাকায় আলিশান ফ্ল্যাটও কিনেছেন। গুলশানে আরো দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। যার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে নিজ জেলায় সুবিশাল বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে আছে বড় অংকের এফডিআর। গড়ে তুলেছেন মাসিক সঞ্চয় ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সন্তানদের নামেও রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আছে কোটি কোটি টাকার আমানত। পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা করছেন তিনি।

এছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি ও কাছের আত্মীয়দের নামে রয়েছে কৃষিজমি ও ব্যবসা। মালয়েশিয়ায় হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণের অর্থপাচার করে সেকেন্ড হোম করেছেন সরকারি এই প্রকৌশলী। এসবের পাশাপাশি আশরাফুল আলমের নামে-বেনামে রয়েছে আরো প্রায় ১শ কোটি টাকার সম্পদ। প্রকৌশলী নেতাদের সখ্যতার প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতিবাজ আশরাফুল আলম কর্মস্থলে বিভিন্ন অনৈতিক ও আর্থিক কর্মকান্ডে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা আদায় করেন।

এমন ঘটনায় অভিযুক্তের বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মপন্থা কী হতে পারে তা জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ভোরের পাতাকে বলেন, ‘গণপূর্ত বিভাগের যে দুর্নীতি তা সম্প্রতি বিষয়ে বেশ আলোচিত। আমাদের কাছে এমন অনেক তথ্য আছে। ইতোমধ্যে আমরা মন্ত্রীর কাছে জানিয়েছি।’ প্রতিবেদন বিষয়ে তিনি বলেন, ক্রয়খাতে সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তিনি যদি এমন কাজ করে থাকেন এবং যোগসাজসে তিনি যদি কিছু করে থাকেন তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারেন। যোগসাজসে কাজ দেওয়াটা প্রথম দফার অপরাধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ কাকে দেওয়া হচ্ছে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা খুবই প্রয়োজন। কোনো অপরাধীকে বা তার প্রতিষ্ঠানকে বা তাদের কর্মকা-কে পর্যবেক্ষণ না করে, যাচাই-বাছাই না করে কাজ দেওয়া অভিযুক্ত প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দফার একটি অপরাধ। এক্ষেত্রে দুই দফায় তদন্ত হতে পারেÑ মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত এবং যেহেতু যোগসাজসের বিষয় জড়িয়ে আছে, সেক্ষেত্রে দুদকও তদন্ত করতে পারে।’ এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ও এর একটি সমাধান হওয়া উচিৎ বলে তিনি মনে করেন। গণপূর্ত প্রধান প্রকৌশলী শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজী নই।’ 

আশরাফুলের দুর্নীতি প্রসঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘বর্তমানে আমি ঢাকার বাইরে আছি। যেহেতু আমি এখনো বিষয়টি পুরোপুরি জানি না, সেহেতু মন্তব্য করতে পারছি না।’  

মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি তার কোনো প্রতিত্তোর করেননি। 

Ads
Ads