সৌরভকে আমাদের অভিনন্দন

  • ১৯-Oct-২০১৯ ১১:১৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

ভারতের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি বরাবরই কলকাতার রাজপুত্র। গর্ব। সেই প্রথম থেকেই। সুতরাং তিনি যখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান হলেন, তখন কলকাতায় একটা বাড়তি উচ্ছ্বাস থাকবে, আবেগের বাড়াবাড়ি থাকবে, এটা স্বাভাবিক ঘটনা। পাশাপাশি সৌরভ বিসিসিআইয়ের প্রধান হওয়ার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলের উচ্ছ্বাসটাও বেশি। এর পেছনেও রয়েছে ক্রিকেট ইতিহাস। ক্রিকেটবোদ্ধাদের মতে, তিনি সত্যিই একজন মহান ক্রিকেটিও ব্যক্তিত্ব, যার থেকে আমরা দেশবাসী অনেক কিছু শিখেছি। ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য শুধু নয়, সমগ্র ক্রিকেটের জন্য তিনি যা করেছেন, তা  সত্যিই কোনোদিন ভোলার নয়। তার দৌলতেই ভারতীয় ক্রিকেট দল পেয়েছিল কিছু অভাবনীয় প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের; যার মধ্যে বীরেন্দ্র সেহওয়াগ, আশিস নেহেরা, জাহির খান, যুবরাজ সিং, হরভজন সিং ও ভিভিএস লক্ষণ  ছিল অন্যতম। দাদা, প্রিন্স অফ ক্যালকাটা, বেঙ্গল টাইগার, গড অফ অফসাইড নামে খ্যাত চ-ীদাস গাঙ্গুলি ও নিরুপা গাঙ্গুলির সন্তান সৌরভ চ-ীদাস গাঙ্গুলি তার বাম হাতের কারিশমায় মুগ্ধ করেছেন ক্রিকেট আমোদীদের। ১৯৯৬ সালের ২০ জুন।

টেস্ট অভিষেক হয় তার। ওয়ানডে ছাড়া টেস্টেও গড়েছেন রেকর্ড। তিনি সমগ্র বাঙালির গর্ব। যদিও ছোটবেলায় সৌরভ ফুটবল খেলতে ভীষণ ভালোবাসতেন । তিনি ও তার দাদা স্নেহাশীষ গাঙ্গুলি একই সাথে বড় হয়ে ওঠেন চ-ীদাস পরিবারে । তার দাদাই আসলে ক্রিকেট খেলতেন কিন্তু পরে সৌরভকেও তার বাবা চ-ীদাস গাঙ্গুলি দশ বছর বয়সে, কলকাতার একটা নামী ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করে দেন। সৌরভ গাঙ্গুলি তার প্রাথমিক শিক্ষা নেন, কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুল থেকে এবং সেই স্কুলেরই ক্রিকেট একাডেমিতে তিনি যোগদান করেন একজন ক্রিকেট প্লেয়ার হিসাবে । তিনি তার জীবনের প্রথম ক্রিকেট সেঞ্চুরি করেন ওড়িশার আন্ডার-১৫ দলের বিরুদ্ধে । সেই খেলায় তার অসাধারণ পারফরমেন্স, তাকে করে দেয় সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ।  এরপর ধীরে ধীরে সৌরভ গাঙ্গুলির ক্রিকেট খেলা সকলকে মুগ্ধ করতে থাকে এবং দিকে দিকে তার খেলার চর্চা ছড়িয়ে পরতেও শুরু করে খুব তাড়াতাড়ি। অবশেষে তার সব প্রতীক্ষার অবসান হয় ১৯৮৯ সালে, যখন তাকে বেঙ্গল ক্রিকেট দলের হয়ে খেলার জন্য নির্বাচন করা হয় । কিন্তু অন্যদিকে, ঠিক সেই বছরই তার দাদা স্নেহাশীষ গাঙ্গুলিকে বেঙ্গল ক্রিকেট দল থেকে অপসারিতও করা হয় । ১৯৯০ ও ১৯৯১ এই দুই বছর, রঞ্জি ট্রফিতে দারুন পারফরমেন্স করার ফলে তাকে প্রথমবারের জন্য ভারতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে খেলার জন্য সুযোগ দেওয়া হয়, ১৯৯২ সালে । সেই বছর ভারতের সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের একটা ও.ডি.আই সিরিজ অনুষ্ঠিত হয় । কিন্তু ডেবিউ ম্যাচে সৌরভ মাত্র ৩ রানে আউট হয়ে যান । যার ফলে তাকে ভারতীয় ক্রিকেট দল থেকে অপসারিত করা হয় । দল থেকে বাদ পরার পর আবার সৌরভ গাঙ্গুলি রঞ্জি ট্রফি খেলতে শুরু করেন ।

১৯৯৩-১৯৯৪ ও ১৯৯৪-১৯৯৫ এই দুই সিজনে, তিনি ডোমেস্টিক ক্রিকেটে ব্যাপক রান করেন ধারাবাহিকভাবে । তাছাড়া দলীপ ট্রফিতেও তিনি ১৭১ রানের একটি সুন্দর ইনিংস খেলেন, যার ফলে পুনরায় তাকে ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট সিরিজে খেলার সুযোগ দেওয়া হয় ।

প্রথম টেস্টে সৌরভ কিন্তু মোটেই খেলার সুযোগ পাননি, তিনি মাঠের বাইরে পরিবর্ত খেলোয়াড় হিসাবেই বসে ছিলেন গোটা প্রথম টেস্ট ম্যাচ । দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচেও তিনি প্রায় অনিশ্চিতই ছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে নভজিৎ সিং সিধুর শারীরিক অসুস্থতা, তাকে দলে খেলার সুযোগ করে দেয় ।  সেই টেস্ট ম্যাচেই আবার রাহুল দ্রাবিড়ও সুযোগ পান, প্রথমবারের জন্য ভারতের হয়ে খেলার । তারা দুজনেই তাদের প্রথম ডেবিউ ম্যাচে, সুন্দর দুটো সেঞ্চুরি করেন, ইংল্যান্ডের লর্ডস ক্রিকেট ময়দানে । সেই সিরিজের শেষ টেস্টেও সৌরভ সুযোগ পান । এরপর ইংল্যান্ডের তৃতীয় টেস্ট খেলা অনুষ্ঠিত হয় ট্রেন্ট ব্রিজে, যেখানে তিনি আবারও একটা সেঞ্চুরি করেন (১৩৬ রান)। বিদেশের মাটিতে পরপর দুটো ঝড়ো ইনিংস খেলার পর, সৌরভের জায়গা পাকাপাকিভাবে ভারতীয় ক্রিকেট দলে হয়ে যায়।  ১৯৯৭ সালে সৌরভ শ্রীলঙ্কার মাটিতে ১১৩ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন আর সেইসাথে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাহারা কাপে পর পর ৪টি ম্যাচে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হিসাবে সম্মানিত হন। এছাড়াও ১৯৯৯ সালে সৌরভ গাঙ্গুলি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৮৩ রান করেন এবং ২০০৭ সালে ভারতের চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও তিনি ২৩৯ রান করেন।

২০০০ সালে ভারতের অধিনায়ক হওয়ার পর, তিনি ভারতীয় ক্রিকেট টিমের ভবিষ্যতই বদলে দেন। তার অধিনায়কত্বের সময়কে আমরা ভারতীয় ক্রিকেটর স্বর্ণযুগ হিসাবে ধরতে পারি। বিদেশের মাটিতে কীভাবে জিততে হয়, সেটা হয়তো গাঙ্গুলি ছাড়া এত ভালোভাবে কেউই এর আগে শেখাতে পারেনি বলেই মনে করেন অনেকে। আগে বিদেশি খেলোয়াড়দের চোখ রাঙানি দেখে অনেক ভারতীয় ক্রিকেটাররাই জবাবে কিছু বলতে পারতো না । কিন্তু এখানেও সৌরভ গাঙ্গুলিই প্রথম শিখিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে বিদেশি খেলোয়াড়দের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে তাদের পাল্টা জবাব দিতে হয়।

সেই সৌরভের পুরো ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা যখন নিজেদের প্রিয় ক্রিকেটারের নাম বলেছেন, তখন একটা জায়গা সৌরভের জন্য বরাদ্দ থাকত। সৌরভ নিজেও বারবার বলেছেন, ঢাকায় খেলতে এলে তার নাকি কখনোই মনে হতো না যে তিনি বিদেশে খেলতে এসেছেন। সুতরাং সৌরভের বিসিসিআই প্রধান হওয়া যেন অনেকের কাছে এ দেশেরই কারো সাফল্য। এটা নিয়ে উচ্ছ্বাসটাও তাই কলকাতার চেয়ে কম নয় এখানে।

গেল বুধবার ইডেন গার্ডেনের সন্ধ্যা। গণমাধ্যমের গমগম উপস্থিতি। সৌরভের বিসিসিআই প্রধান হওয়া নিয়ে কলকাতা কতটা আনন্দে, মাত্রা কতটা সেটা বোঝা যাচ্ছে। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের অফিসে (সিএবি) নিজ কক্ষে সৌরভ ঢুকলেন কোনোমতে ভিড় ঠেলে। সেখানে সৌরভ মিডিয়াকে বললেন বিসিসিআই প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারটি নিয়ে। বিসিবি সভাপতির অভিনন্দন-বার্তা পেয়েছেন, সেটা তিনি নিজেই জানালেন। ভারতীয় বোর্ড প্রধান হিসেবে বিসিবির সঙ্গে সুসম্পর্ক যে তার অগ্রাধিকার সেটিও বলতে ভুললেন না, ‘১০০ বার বাংলাদেশকে সহযোগিতা করব। বাংলাদেশকে সহযোগিতা না করলে আর কাকে করব। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সুযোগ আছে। আইসিসির আলোচনাতেও সহযোগিতা করতে পারি। কিছুদিন পরেই তো এখানে টেস্ট ম্যাচ খেলতে আসছে বাংলাদেশ। তখন বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হবে।’

আগামী মাসে ভারতের মাঠে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। দুই টেস্টের একটি ভেন্যু সৌরভের ঘরের মাঠ ইডেন গার্ডেন। ইডেনে টেস্ট আয়োজনকে স্মরণীয় করে রাখতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নতুন সভাপতি ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগও নিয়েছেন। কলকাতা টেস্টটাকে উৎসবের আমেজে রাঙিয়ে তোলার সব চেষ্টাই করছেন তিনি।

বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে সব সময়ই আগ্রহী সৌরভ। খোঁজ-খবর সব সময়ই রাখেন। যেমন জিজ্ঞাসা করলেন পেসার তাসকিন আহমেদের কথা, ‘আচ্ছা তোমাদের ওই ছেলেটা কোথায়। ওই যে ডান হাতে জোরে বল করে। হ্যাঁ হ্যাঁ তাসকিন। চোট থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছে তো নাকি!’ সৌরভের মতে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ভুগেছে বোলিংয়ের কারণে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করেন তিনি, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটে খুব ভালোমতোই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বোলিং আক্রমণটাকে ঠিক করতে হবে। বিশ্বকাপে ওটাই বাংলাদেশকে ডুবিয়েছে।’

সৌরভ পৃথিবীর একমাত্র ক্রিকেটার যিনি পরপর ৪টে ম্যাচে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হন । দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটার এবি ডিভিলিয়ার্স পর তিনিই পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান, যিনি দ্রুততম ৯০০০ ও.ডি.আই রানের অধিকারী । তিনি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ক্রিকেটের ইতিহাসে, প্রথম একজন ব্যাটসম্যান যিনি ৩টি সেঞ্চুরি করেন। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে তার রানের রেকর্ড এখনো অবধি কোনো ক্রিকেটার ভাঙতে পারেনি (১১৭ রান) । তিনি পৃথিবীর সেই ৫ জন ক্রিকেটারের মধ্যে একজন, যার নিজের ১০০০০ রান, ১০০টা উইকেট আর ১০০টা ক্যাচ নেওয়ার রেকর্ড আছে । ২৬ মে, ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপে তিনি  শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৮৩ রান করেন। তিনি তার জীবনের প্রথম ডেবিউ টেস্টে ভারতের হয়ে সেঞ্চুরি করেন এবং শেষ টেস্টে করেন শূন্য রান । 
সৌরভ ১৯৯৭ সালে অর্জুন পুরস্কার, ২০০৪ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার, ২০০৪ সালে রামমোহন রায় পুরস্কারে ভূষিত হন। এবার তিনি হলেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান। বর্ণাঢ্য ক্রিকেট জীবনাধিকারী সৌরভ গাঙ্গুলির জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

Ads
Ads