শেখ রাসেল, শোকার্ত অনুভূতির অমর নাম

  • ১৮-Oct-২০১৯ ০৯:৪৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর পর যে নামটি আবেগে ও ভালোবাসায় মোহাবিষ্ট করে রেখেছে, সে নামটি শেখ রাসেলের। পৃথিবীতে খুব অল্প সময় কাটিয়েছিলেন শেখ রাসেল। গুনে-গুনে দশটি বছর আর অল্প কটি মাস। তারপর পেরিয়ে গেছে তারচেয়েও অনেক বেশি, অনেকগুলো বছর। সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে চারগুণেরও বেশি। পনেরো আগস্ট না ঘটলে আজ মধ্য পঞ্চাশে পা রাখতেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সবার পরে পৃথিবীতে আগমন তার, কিন্তু প্রস্থান সবার আগে। খুব অল্পসময়ই তিনি কাটাতে পেরেছেন এদেশের ধুলো-মাটির সান্নিধ্যে।

রাসেল ছিল শেখ হাসিনার বা হাসুপার অতি কাছের। অবসর সময় কাটত তাকে নিয়ে। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলে রাসেলের মুখের হাসি মুছে যায়। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল তার আব্বাকে খুঁজত। আর তখন তার মা বেগম মুজিবও ব্যস্ত স্বামীর মামলা-মোকদ্দমা সামলাতে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। ফলে রাসেলের যতœ না পাওয়ারই কথা। কিন্তু শেখ হাসিনা তার কাছে থেকেছেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ির আঙিনা জুড়ে কবুতর ঘুরে বেড়াত। আর রোজ সকালে রাসেলকে কোলে নিয়ে বেগম মুজিব তাদের খাবার দিতেন। রাসেল বড় হতে থাকলে খেলার সাথী হিসেবে কবুতরের পেছনে ছোটা আর নিজে হাতে করে খাবার দেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু ওকে কখনো কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারেননি কেউ। যেন পোষা পাখির প্রতি বাল্যকাল থেকে তার অন্তরে মমতা জেগে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকার সময়গুলো পিতার অভাব ভুলিয়ে রাখার জন্য পরিবারের সকলের চেষ্টা থাকত নিরন্তর। বাসায় পিতার জন্য কান্নাকাটি করলে বেগম মুজিব তাকে বোঝাতেন এবং তাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন।

পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় এদেশ দেখেছে অনেক, বদলেছে তার চেয়েও বেশি। পঁচাত্তরের ঘাতকের ফাঁসি দেখেছে বাংলাদেশ, দেখেছে লাফিয়ে-লাফিয়ে তার প্রিয় হাসু বুবুর হাত ধরে ওপরে উঠতে উন্নয়নের সূচক। প্রায়ই গানটা বাজতে শুনি, ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত ... ...’। শুনি আর ভাবি যে পরিবারের প্রতিটি সদস্য তাদের মেধা আর আত্মত্যাগে আবদ্ধ করেছেন গোটা জাতিকে তাদের এই কনিষ্ঠতম সদস্যটি আজ মধ্য পঞ্চাশে আমাদের পাশে থাকলে আমরা কোথায় থাকতাম। বঙ্গবন্ধুতো বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন পঞ্চাশের আগেই আর পঞ্চাশ পেরুতে না পেরুতেই জাতির পিতা।

শেখ রাসেলের অগ্রজ শেখ কামাল পেরুতে পারেননি পঁচিশের কোটাও। অথচ এরই মাঝে কমিশন নিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই। ছাত্রলীগের রাজনীতি করবেন বলে ছেড়েছিলেন উর্দি, দায়িত্ব নিয়েছিলেন পরিবেশ রক্ষার। জন্ম দিয়েছিলেন আবাহনী ক্রীড়া চক্রের, দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এনেছিলেন আধুনিকতার ছোঁয়া। স্বাধীন দেশের প্রথম মঞ্চ নাটক কিংবা বিটিভির প্রথম ধারাবাহিক নাটক, সেখানেও সেই শেখ কামালই। আর অন্য অগ্রজও শেখ জামাল- তিনিও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধকালীন কমিশন্ড অফিসার আর তারপর স্যান্ডহার্স্টের মত বিশ্ব সেরা মিলিটারি অ্যাকাডেমির ক্যাডেট।

সাতই মার্চ রেসকোর্সে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠার আগে বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিবের পরামর্শ নিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন কি বলবেন তিনি উন্মুখ জাতির উদ্দেশ্যে। জ্বরে তখন বঙ্গবন্ধুর গা পুড়ে যাচ্ছিল। চাপে ছিলেন নানা মুনির, মত ছিল নানা রকমের। বঙ্গমাতা তাকে বলেছিলেন নিজের ভেতরের কথা শুনতে। বঙ্গবন্ধু সেদিন করেওছিলেন তাই। ফলাফলটা স্পষ্ট। মানবজাতি পেয়েছে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ আর আমরা আমাদের সবুজ পাসপোর্ট। এই ছিল এদেশের জন্য এই পরিবারের গৃহকত্রীর অসংখ্য-অজস্র অনুচ্চারিত অবদানের একটি উদাহরণ।
একবার ভাবুনতো, এমন পরিবারের যিনি উত্তরাধিকার, সেদিন যদি ঘাতকের দল শেষ মুহূর্তে তাকে চিনতে না পারত, আজ যদি তিনি থাকতেন আামাদের মাঝে, শেখ হাসিনার পাশে তার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য, কোথায় দাঁড়াতে পারত আজকের বাংলাদেশ? সেই বাংলাদেশকে কল্পনা করার শক্তি আমার নেই। শুধু জানি মধ্য পঞ্চাশের একজন শেখ রাসেলের আজ শেখ হাসিনার পাশে প্রয়োজন ছিল খুব বেশি।

পঁচাত্তরের পনের আগস্ট ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যটিকে হত্যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের তালিকাটিকে প্রলম্বিতই করেনি বরং তারা বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষকে বঞ্চিত করেছে আরো তাড়াতাড়ি আরেকটু এগিয়ে যাওয়া থেকে। পঁচাত্তরের সামনের সারির ক্রীড়ানকদের বিচার আমরা দেখেছি। ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে পঁচাত্তরের নেপথ্যের কুশীলবরা। একটি বিশেষ কমিশন গঠনের মাধ্যমে এদের চিহ্নিত করে, আইন সংশোধন করে হলেও প্রয়োজনে মরণোত্তর বিচারের আওতায় আনা আজ তাই শুধু বাঙালির দাবি-ই নয়, বরং অধিকার।

Ads
Ads