মিয়ানমার শুধু তালিকা নেয়, রোহিঙ্গা নেয় না

  • ১৬-Oct-২০১৯ ১০:১৯ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দুই বছর পেরিয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট বলে স্বীকৃত। রাখাইনের ২০১৭ সালের ওই নৃশংসতাকে গণহত্যা বলছে জাতিসংঘ। কক্সবাজারের বিপুল এলাকাজুড়ে ১৫ লাখের বেশি আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার কয়েক দফায় তালিকা প্রস্তুত করে বাংলাদেশকে দিলেও দুই বছরে সেই তালিকার কোনোটাই বাস্তবায়ন করেনি। একজন রোহিঙ্গাকেও তারা ফেরত নেয়নি। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার তারা আবারও নতুন করে আরেকটি তালিকা দিয়েছে।
২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয় বাংলাদেশের। চুক্তিকে প্রতিদিন ৩০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা জানায় মিয়ানমার।

তিনমাস পর এই সংখ্যা পুনরায় পর্যালোচনা করার কথাও জানায় তারা। যেদিন থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শুরু করবে, তার পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে প্রক্রিয়াটি শেষ হবে বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও জানান। ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ নামের ওই চুক্তিটির বিষয়ে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে বাংলাদেশের পক্ষে মো. শহিদুল হক এবং মিয়ানমারের পক্ষে মিন্ট থোয়ে স্বাক্ষর করেন। এর পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় দুদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য ৮০০০ রোহিঙ্গার একটি তালিকা মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লে. জেনারেল চ সোয়ের সাথে বৈঠকের পর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘সীমান্তের জিরো-লাইনে যে ৬৫০০-এর মতো রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে আসার জন্য অপেক্ষা করছে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার উপর জোর দেয়া হয়েছে।’ প্রথম দফার এই তালিকায় ১৬৭৩টি পরিবারের ৮০৩২ জন রোহিঙ্গার নাম ছিল। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম তারিখ ঠিক হয়েছিল। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হয়। এরপর চীনের সরাসরি মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার

সর্বশেষ এ বছরের ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করে। এর আগে একটি তালিকাও প্রস্তুত হয়। যেহেতু মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ যে চুক্তি করেছে, সেখানেও খুব স্বাভাবিকভাবেই শরণার্থীদের ‘স্বেচ্ছায়’ ফিরে যাওয়ার বিষয়টি রয়েছে, তাই কেউ ফিরে যেতে রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন ভেস্তে যায়। এই প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের যে তালিকা দিয়েছিল, তা থেকে মিয়ানমার মাত্র ৩ হাজার ৪৫০ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার সবুজ সংকেত দিয়েছিল। এমন অবস্থায় গত মঙ্গলবার মিয়ানমারকে ৫০ হাজার রোহিঙ্গার নতুন তালিকা দিলো বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন একথা জানান। মিয়ানমারও আবার সেই তালিকা নিয়েছে। কিন্তু তারা কি রোহিঙ্গা ফেরত নেবে? প্রশ্নটি কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকসহ ঘোরাফেরা করছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনেও। 

কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জোট, পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যম বাংলাদেশের পাশে আছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনেকটা আড়ালে রাখার কারণেই প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একধরনের কূটনৈতিক নাটক খেলেছে। 

গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি হয়। তবে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলরের কার্যালয়ের ইউনিয়ন মন্ত্রী চিয়াও তিন্ত সোয়ে প্রত্যাবাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন রুখতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনসহ যেসব বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে সে সম্পর্কে মিয়ানমার অবগত রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই সমস্যাগুলো সমাধান করা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন শর্ত আরোপ করলে প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় পন্থাকে উপায় হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ এ সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উপায়ের কথা সব সময় বলছে। কিন্তু মিয়ানমার যে আসলেই প্রত্যাবাসন চাইছে না, সেটা তারা দুই দফায় প্রমাণ করেছে। কারণ, রাখাইনে এখনো প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ ফেরেনি।

যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা উন্মুক্ত ও চেষ্টা অব্যাহত থাকায় বিশ^দরবারে প্রশংসা কুড়িয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দুই বছর উপলক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের উদাত্ত সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখনো বৈষম্য অব্যাহত থাকায় কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারকে অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, এটা মিয়ানমার ও বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাসহ রাখাইনের সব জনগোষ্ঠীকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেরা উপায়। রোহিঙ্গারা যাতে স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণভাবে ও টেকসই উপায়ে রাখাইনে তাদের আদি নিবাসে বা পছন্দসই জায়গায় ফিরে যেতে পারে, সে ব্যাপারে মিয়ানমারকে উৎসাহ জোগাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।’

বাংলাদেশের কূটনীতিকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ব্যর্থ প্রমাণ করে মিয়ানমার ও তার সমর্থকরা এ দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও দুই বছরের মাথায় এসে কক্সবাজারের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে রোহিঙ্গাদের এত ব্যাপক পরিসরে আশ্রয় নেওয়াটা দিনদিন কঠিন সমস্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে নিরাপত্তা। 

Ads
Ads