আবরার হত্যাকাণ্ড: নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন সতর্কবার্তা

  • ১৩-Oct-২০১৯ ১০:৩৪ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। তারই একটি কক্ষে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই কয়েকজন মিলে বর্বরভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। বড় ভাই এভাবে প্রাণ হারানোই ঢাকায় পড়তে অনাগ্র প্রকাশ করেছেন আবরার ফায়াজ। শুধু ফায়াজ নয়, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে মন্তব্যেও দেখা গিয়েছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অনীহা। ‘অস্থিতিশীল ছাত্ররাজনীতি’কে দায়ী করেছেন তারা। দায়ী করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে। তাহলে কি একটি ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে? নাকি এই অনীহার মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করা বিকারগ্রস্ত কিছু অস্থির, উন্মাদরা প্রশ্রয় পেয়ে যাচ্ছেন? মাথা ব্যথা হতেই পারে, তার সমাধান মাথাকে রেখেই উপযুক্ত চিকিৎসা করা। প্রতিষেধক ঠিকমতো প্রয়োগ হলেই সেরে যাবে ছাত্র রাজনীতির ওপর ভর করা অপরাজনীতি। খুঁজে বের করতে হবে এই সব অসুর মানসিকতার শিক্ষার্থীদের। আর তার জন্য প্রয়োজন আমাদের সন্তানদের সাহস। যে সাহসই একদিন পরাধীন রাষ্ট্রে ভাষা রক্ষার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল আপামর জনসাধারণকে। যাদের যৌবনদীপ্ত বুলেটের সামনে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আমরা পেয়েছিলাম লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা। 

গত শনিবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আবরার ফাহাদের একমাত্র ছোট ভাই ঢাকা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবরার ফায়াজ জানিয়েছেন, তিনি আর ঢাকায় পড়বেন না। ফায়াজ বলেন, ‘আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল। ও ছিল আমার অভিভাবক। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক এমন ছিল যে মা-বাবার কথা তেমন মনেই হতো না।’ যে রাতে ফায়াজের ভাই আবরারকে প্রাণ দিতে হয় ওই দিন রোববার দুই ভাই-ই ছিলেন গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। বাড়ি থেকে আবরার ফাহাদ ঢাকায় ফেরার সময় ছোট ভাই ফায়াজ ঘুমিয়ে ছিলেন। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ফায়াজ সেদিন সকালের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ভাই যাওয়ার সময় মা ডেকেছিল। কিন্তু শুয়েই ছিলাম। তারপরও ভাই বলল, তাড়াতাড়ি ঢাকায় চলে আসবি। এটাই ছিল ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা ও দেখা।’ ‘কলেজে (ঢাকা কলেজ) আর যাব না। কোনো ভয় না, আসলে সত্যি কথা যেটা, ঢাকাতে নিয়ে যাওয়া-ভর্তি, সব ছিল ভাইয়ের ইচ্ছায়। ও সব কেয়ার করত। রুমে পানি না থাকলে ভাইই দিত। ও নেই, সেখানে কী করে থাকব।’ উল্লেখ করে ফায়াজ আরও বলেন, ‘ভাই ছিল, দুজন ছিলাম। এখন একা। ঢাকা আর না, কুষ্টিয়াতে পড়াশোনা করব। এটাই পরিকল্পনা।’ এমন বক্তব্যে গতকাল রোববার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘ফাহাদের ভাই যদি ঢাকা কলেজে পড়তে অনিরাপদ মনে করেন, তাহলে আমরা তাকে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত। তাকে সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে সবসময় তার পাশে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আমরা মনে হয়, এতো বড় ঘটনা, এতো বড় আঘাতের কারণে হয়তো এখনই ঢাকায় আসতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয় ফায়াজ।’ ‘ফাহাদের ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কেউ মাফ পাবে না।’ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ক্যাম্পাসে র‌্যাগিং অপরাধ। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিবাদ আসতে হবে, অভিযোগ করতে হবে। আমাদের সময়ও এ ধরনের র‌্যাগিং হতো। যারা একটু শক্তিশালী ছিল, যারা প্রতিবাদ করতো, তাদের র‌্যাগ দেওয়া হতো না। নিরীহরা প্রতিবাদ না করলে তাদের র‌্যাগ দেওয়া হতো। তবে, প্রতিবাদ করলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। ব্যবস্থা না নিলে আমরা সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।’ 

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সার্বক্ষণিক চেষ্টা করছে, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে অপরাধমুক্ত রাখতে। যেখানেই অপরাধ সংগঠিত হোক না কেন, সেখানেই হানা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন। অপরাধীকে ধরতে কোন দল তা না দেখারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি হুশিয়ারি করে দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো দল টল আমি বুঝি না। পরিষ্কার কথা, কোনো দল আমি বুঝি না।’ এরপর গত শনিবার নিয়মিত অভিযানের প্রথম দিনেই বুয়েট প্রশাসন শাখা ছাত্রলীগের অফিসসহ তিনটি কক্ষ সিলগালা করে দেন। যদিও ২০১৬ সালের শেষ দিকে বুয়েটের সিএসই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ওয়ানস্টপ অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম (ইউ রিপোর্টার) নামে গড়ে তোলা সার্ভারে গত আড়াই বছরে ১০৩টি অভিযোগ প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে উল্লেখ করেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, গত রোববার রাতে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর বেশ কিছু নতুন অভিযোগও জমা পড়ে। সেই পেজটি গত বুধবার বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দিয়ে বৃহস্পতিবার সংস্থার চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক সত্যতা নিশ্চিত করেন। এমন এক পরিস্থিতিতে বুয়েট প্রশাসনকে এই সব কিছু খতিয়ে দেখা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যদিও দায়িত্ব ছিল আরও আগে থেকেই। কারণ অপরাধ অপরাধই। আর অপরাধী কখনোই ক্ষমা পেতে পারে না। 

দেশে আলোচিত কয়েকটি মামলার উদাহরণ টেনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচার শেষ, এখন রায়ের অপেক্ষায় আছে। আগামী ২৪ অক্টোবর রায় হবে। শিশু রাজন হত্যার বিচার হয়েছে। ফাহাদ হত্যা মামলাটিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে র‌্যাগিং ও যৌন নির্যাতনসহ সব নিপীড়ন বন্ধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি বলেছেন, ‘এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রোধে বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে। গতকাল রোববার তিনি বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো হবে যাতে কোনো শিক্ষার্থী অন্যের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত না হয়।’ 

যদিও আগে থেকেই এইসব দায়িত্ব ছিল বর্তমানে নড়েচড়ে বসা মন্ত্রণালয়গুলোর। আইনমন্ত্রী যেহেতু নিজেই র‌্যাগিং সম্বন্ধে জানেন, সুতরাং তারও এ বিষয়ে কিছু কর্তব্য ছিল। বুয়েট প্রশাসন এখন যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা আগেই নেয়া উচিৎ ছিল। তারপরও আগে যা হয়নি তা আবরার হত্যাকাণ্ডের পর হচ্ছে, এটা সবার জন্য নতুন দিনের সতর্কবার্তা, শক্ত পরিকল্পনা তৈরির জন্য নির্দেশনাও। এই বার্তায় রয়েছে আমাদেরকে সব সময় সচেতন থাকতে হবে। চোখ খোলা রাখতে হবে। আইনের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে যেখানেই অপরাধ সেখানেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিতকরণের মাধ্যমে অপরাধকে রুখতে হবে। এটা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। ছোটখাট কোনো অনিয়মকেই অগ্রাহ্য করা যাবে না। তাহলেই বড় ঘটনার পথ উন্মুক্ত হয়ে যাবে। 

Ads
Ads