দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয় কারা

  • ১০-Oct-২০১৯ ১০:৫৪ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

দেশের স্বার্থ যখন নষ্ট করে এদেশের মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছিল পাকিস্তানি স্বৈরাচার সরকার, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সেই শোষণের বিরুদ্ধে বুক টান করে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। রক্তচোষা হায়েনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ও শত্রুর মোকাবিলায় ‘যা কিছু আছে, তাই নিয়ে’ দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রেডকোর্স ময়দানের সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এদেশের কোটি জনতা। সেই বঙ্গবন্ধুকন্যাই আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বিশ্বের দরবারে ঈর্ষান্বিত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। গত ২৯ আগস্ট ‘দ্য স্পেক্টেটর ইনডেক্স’-এ প্রকাশিত বিশ্বের ২৬টি শীর্ষ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায় বাংলাদেশ জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) অর্জন করেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ পর্যন্ত এ দেশের সবচেয়ে সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ১০ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সারা বিশ্বে সবার ওপরে। এ সময় বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮৮ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীন ও ভারতের চেয়েও বেশি। চীনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭৭ শতাংশ ও ভারতের ১১৭ শতাংশ। অন্যান্য দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ৯০, মালয়েশিয়া ৭৮, অস্ট্রেলিয়া ৪১, মেক্সিকো ৩৭, ইতালি ৮, জার্মানি ১৫, মিসর ৫১ এবং ব্রাজিল ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে। তখন বাংলাদেশ হবে ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। বর্তমানে অবস্থান ৪১তম। ২০৩৩ সালে আমাদের পেছনে থাকবে মালয়েশিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ। আগামী ১৫ বছর দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশ থাকবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০১৯ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে ১৯৩টি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার উল্লেখ আছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ১২টি দেশকে টপকে গেছে। আগামী ১৫ বছরে টপকে যাবে আরও ১৭টি দেশ।

প্রবৃদ্ধির ধারাতেই থেমে থাকেনি বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। নতুন নতুন পরিকল্পনা রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের। সম্প্রতি তিনি ভারত সফরে গেলে ৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে একটি চুক্তিতে রয়েছে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রফতানি। এর মাধ্যমে দেশ রফতানি শিল্পে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে দেশে শুরু হয়েছে অপরাজনীতি। এদেশের মানুষকে বোকা বানাতে নানামুখী ষড়যন্ত্র তৈরি করেছে তারা। ভুল বোঝাতে ব্যস্ত রয়েছেন তাদের অনেকে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই চুক্তিকে ‘দেশবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন। গতকাল ‘ভারতকে উজাড় করে দিয়েছে সরকার’ বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন তিনি। এর মধ্যে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে হত্যাকা-ের বর্বরতাকেও ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন এসব অপরাজনীতিবিদ। অথচ এক পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া তথ্য মতে, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এখন ১০ লাখ টন এলপিজি সরবরাহের ক্ষমতা রয়েছে। এর বিপরীতে দেশে চাহিদা রয়েছে মাত্র ৭ লাখ টনের।’

এলপিজি রফতানি উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিষ্ঠান ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক আজম জে চৌধুরী জানিয়েছেন,  এখন ৪০ থেকে ৫০ টনের মতো এলপিজি রফতানি করা হচ্ছে। প্রথম বছরে তারা ৫ থেকে ১৫ হাজার টন গ্যাস রফতানি করতে চান। যদি তাই হয় তবে রফতানির পরও দেশে মজুদ থাকবে আড়াই লাখ টনেরও বেশি এলপিজি। উদ্যোক্তা সূত্রে জানা আমরা জেনেছি, বেশকিছু দিন আগে থেকেই ত্রিপুরায় এলপিজি রফতানি করছেন তারা। এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘মোংলা বন্দর দিয়ে এলপিজির কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি অংশ ঘোড়াশালে নিয়ে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে বোতলজাত করে দেশের মধ্যেই সরবরাহ করি। আর অন্য অংশটি রোড ট্যাংকারে করে ত্রিপুরা পাঠাই। সেখানে যে প্ল্যান্ট আছে সেখানেই বোতলজাত করা হয়।’

জানা গেছে, সব মিলিয়ে সরকার ৫৬টি এলপিজি প্ল্যান্ট নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি বেসরকারি উদ্যোক্তা এলপিজি সরবরাহ করছে। এদের অনেকেই বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। কিন্তু চাহিদা না থাকায় সক্ষমতার পুরো উৎপাদন করতে পারছেন না। তাই তাদের রফতানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে শর্ত হচ্ছে দেশের চাহিদা পূরণের পর রফতানি করবে তারা। এভাবে এলপিজি রফতানি করা গেলে আমাদের দেশে বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবেÑ এটা মোটাদাগে অনুভবযোগ্য।

এছাড়া আমদানিনিয়ম অনুযায়ী যেকোনো উদ্যোক্তা যেকোনো পণ্য আমদানি করে পুনঃরফতানি করতে পারেন। দেশের পোশাক কারখানার উদাহরণ রয়েছে। আমরা বিদেশ থেকে কাপড় এনে সেলাই করে আবার বিদেশেই পাঠাই। এক্ষেত্রেও তাই; আমাদের বেসরকারি কোম্পানি এলপিজির কাঁচামাল আনবে, এরপর তারা প্রক্রিয়া করে ত্রিপুরায় বিক্রি করবে। এখানে সরকারের কোনো বিষয় নেই।

গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তার সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার প্রসঙ্গে সরাসারি জানিয়ে দিয়েছেন তার অবস্থান। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে, এটা হতে পারে না। প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, ভারতে আমদানি হবে আমদানি করা গ্যাস। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিরও কোনো অবকাশ নেই।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বিদেশ থেকে এলপিজি এনে প্রক্রিয়াজাত করে ভারতে রফতানি করব। এতে করে আমাদের ভ্যালু এড হবে। সেই গ্যাস আমরা রফতানি করব। এটা প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। বরং আমাদের রফতানির তালিকায় নতুন একটি পণ্য যুক্ত হবে।’

Ads
Ads