মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার সামনে ইতিহাসের অমরত্বের হাতছানি

  • ২-Oct-২০১৯ ০২:২৩ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: পীর হাবিবুর রহমান ::

মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা দুর্নীতি ও বেআইনি কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন শুরু থেকেই আমি একে দেশের জনগণের সঙ্গে স্বাগত জানিয়ে একটি কথাই বলে আসছি, এই যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হতে হবে বিজয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের যেমন বিকল্প ছিল না, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশে জীবিত প্রত্যাবর্তন ছাড়া স্বাধীনতা যেমন পূর্ণতা লাভ করছিল না, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া সামনে যেমন কোনো পথ খোলা ছিল না, তেমনি মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে রাজদুর্নীতির দুয়ার খুলে দিয়ে রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণের কুফলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায় ও অপরাধপ্রবণতা যে হারে বেড়েছে তার কবর রচনা করে আইন-বিধিবিধানের আলোকে সুশাসনের সুবাতাস বইয়ে দিয়ে আদর্শিক রাজনীতি ও সমাজ পুনরুদ্ধারে এ যুদ্ধ জয়ের কোনো বিকল্প নেই।

গণতন্ত্রের সংগ্রামের চেয়েও বঙ্গবন্ধুকন্যা-ঘোষিত এ যুদ্ধ জয় অনেক কঠিন। দিনে দিনে দেনা বহু বেড়ে গেছে।

বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ দুর্নীতি গোটা রাষ্ট্রকে দানবের মতো কামড়ে ধরেছে। বহুবার বলেছি, এ দুর্নীতির শনির রাহু কালাপাহাড়ের রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্ক যাত্রার আগেই এ যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

তাঁর নির্দেশে র‌্যাব পরিচালিত অভিযানে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় বেআইনিভাবে ঢাকা, চট্টগ্রামে কীভাবে ক্যাসিনো ও জুয়াড়িদের রমরমা বাণিজ্য অবৈধভাবে দম্ভের সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে তার বীভৎস রূপ বেরিয়ে এসেছে। ফ্রীডম পার্টি থেকে যুবদলের রাস্তার কর্মী কীভাবে আওয়ামী যুবলীগের পদবি বাণিজ্যের মাধ্যমে একজন খালেদ মাহমুদ ক্যাসিনোসম্রাট হয়েছেন দেশবাসী সেটিকে দেখেনি। এসব অপরাধের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একদল অসৎ পুলিশসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন যেভাবে জড়িয়ে ছিলেন সেই সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। অবৈধ বেআইনি বাণিজ্যের বস্তাভর্তি টাকার ভাগ যে কত জায়গায় গেছে সেই সম্পর্কেও মানুষের ধারণা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শেখ হাসিনা যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ক্যাসিনো-বাণিজ্যে হাত দেওয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মী রক্ত, শ্রম, মেধা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তে গড়া সংগঠন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী কতটা সেই মহান নেতার নির্লোভ আদর্শিক রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ঘাতকের হাতে জীবন দেওয়ার আগে পিতৃহৃদয় নিয়ে অনেক আকুতি করেছেন, ধমক দিয়েছেন এমনকি ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ঘাতকের বুলেট তার স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দিয়ে গোটা বাংলাদেশকে সামরিকতন্ত্র, রাজনৈতিক শক্তি, এমনকি সিভিল প্রশাসন থেকে দিনে দিনে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অঢেল বিত্তবৈভব, অর্থসম্পদ ও ভোগবিলাসের পথে দুর্নীতিকে তৃণমূল পর্যন্ত ক্যান্সারের ভাইরাসের মতো সর্বগ্রাস রূপ দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দুর্নীতির কলঙ্ক নিয়ে দেশ ছেড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা এই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি পুলিশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের দিকেও মানুষের অভিযোগের তীর আগাগোড়াই বাড়ছে।

আমলাদের বিরুদ্ধে সব সরকারের আমলে কমবেশি অভিযোগ রয়েছে। আগেও বলেছি এখনো বলছি, আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির জমানায় এমনকি তাঁর হত্যাকান্ডের পরবর্তী সময়েও দীর্ঘদিন রাজনীতিবিদদের পাঞ্জাবিতে কলঙ্কের কালি স্পর্শ করেনি। নিরাভরণ সাদামাটা জীবনযাপন ত্যাগবাদী মনোভাব, আর গণমুখী চরিত্রের রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল। সামরিক শাসকদের হাত ধরে ব্যবসায়ী সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানীদের সঙ্গে প্রশাসনিক সিন্ডিকেট যুক্ত হয়ে যে দুর্নীতির চারা রোপণ করেছিল গণতন্ত্রের জমানায় রাজনীতিকদের হাত ধরে প্রশাসনের সহায়তায় তা পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার বলেছেন যে, তাঁর পরিবার বলতে দেশের বাইরে থাকায় ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তাদের সন্তানরাই পরিবারের সদস্য। তিনি আরও বলেছিলেন, অনেককে কেনা গেলেও শেখ হাসিনাকে কেনা যায় না। জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে সেখানেও সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ। তাঁর দলের কাউকে যদি পাওয়া যায় তার রেহাই নেই। তিনি মানুষের মনের ভাষা পাঠ করে অবলীলায় বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজদের কারণে সৎ মানুষদের ঘরেও কষ্ট বেদনা ও অশান্তি এতটাই জমাট বাঁধে যে তাদের সন্তানরা ভাবে যে অমুকদের এটা আছে, আমাদের এটা নেই, হাপিত্যেশ হয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নিয়ে যায়, নয় তো জীবনকে অন্তহীন বেদনায় অভিশপ্ত করে তোলে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, এই অভিযান তৃণমূল পর্যন্ত যাবে। অনেকে আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন যে, মুজিবকন্যার এই যুদ্ধে এতটাই আবেগাপ্লুত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শেখ হাসিনার এই যুদ্ধকে আমি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা এক কথায় দেশ বাঁচানোর যুদ্ধ বলে মনে করি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এমনকি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই যুদ্ধে মুজিবকন্যাকে বিজয়ীর বেশে দেখতে চায়। চাঁদাবাজ সাইদ কমিশনারকে কারা আশ্রয়-প্রশয় ও হৃষ্টপুষ্ট করেছে? মির্জা আব্বাসের যুবদলের এক টাকার কর্মী জি কে শামীমকে কে যুবলীগের পদবি দিয়েছে? কারা গণপূর্তের একচ্ছত্র ঠিকাদারি, বাণিজ্য, তার হাতে কীসের বিনিময়ে তুলে দিয়েছে? বেগম খালেদা জিয়ার দেহরক্ষী লোকমান মোসাদ্দেক হোসেন ফালুর কর্মী ছিলেন। ফালু বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অনুগত থাকলেও বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনাকে নিয়ে যেখানে কখনো কোনো কটাক্ষ করেননি, সেখানে তার হাত ধরে আসা বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙচুর করা লোকমানকে কারা দাপটের সঙ্গে মোহামেডান ক্লাবের অধিপতি করেছে? কারা তাকে সেখানে অবৈধ ক্যাসিনো-বাণিজ্য করে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করার সুযোগ দিয়েছে? মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা ১১ বছর ক্ষমতায়, সেখানে জাতির পিতার ছবি ভাঙচুর করা লোকমান কীভাবে বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক হয়? বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আত্মস্বীকৃত খুনি ও ফাঁসিতে ঝুলে কবরে শায়িত কুখ্যাত ঘাতকের পরিবারের এক সদস্য কেমন করে লোকমানের সহচর হিসেবে মোহামেডানের পরিচালকই নয়, বিসিবির পরিচালক হয়ে যায়? একসময় ব্যবসায়ীরা শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে রাজনীতিবিদদের আর্থিক সহায়তা ও অনুদান দিতেন। শুভাকাক্সক্ষীর এই দান নেতারাও সংগঠন ও দলের জন্য ব্যয় করতেন। অন্যদিকে রাজনীতিবিদরা নানা সংগ্রামর পথে নির্বাচনের লড়াইয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে রিক্ত নিঃস্ব হতেন। পরে সামরিক শাসক ও তাদের দলগুলোর হাত ধরে ব্যবসায়ীরা মনোনয়ন কিনে নিয়ে সংসদে আসা এবং রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। আর দল ক্ষমতায় থাকলে সেই বিনিয়োগ অধিক মুনাফার সঙ্গে তুলে নেন। পরবর্তীতে একালের রাজনীতিবিদদের একটি অংশ কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের নেতা হয়ে বা পদবি পেয়ে এমপি হয়ে বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ পেয়ে তদবির-বাণিজ্য, কমিশন-বাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এমনকি দলের কমিটি-বাণিজ্য করে বঙ্গবন্ধুর রক্তে ভেজা উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের মূল সংগঠন থেকে বিভিন্ন সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনকেও বাণিজ্যিকীকরণের পথে লোভ ও পাপাচারে ডুবিয়ে বিষাক্ত করে দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুগত দলের নিবেদিত যেসব নেতা-কর্মী অর্থ দিতে পারেন না নেতাদের উপঢৌকন দিতে সামর্থ্য রাখেন না তারা কোনো জায়গায় কমিটিতে ঠাঁই পান না। বঙ্গবন্ধুকন্যা বহুবার বলেছেন, আমাদের কর্মীরা অভিমানে ঘরে বসে আছে কিছুই পায়নি। অন্যদিকে সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশকারীরা এসে অর্থবিত্ত-সম্পদ গড়ছে। অনুপ্রবেশকারীরা কাদের হাত ধরে এসেছে, কাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে তা চিহ্নিত না করে আইনের আওতায় আনা না গেলে অভিযান শতভাগ সফল হবে না। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে কঠোর অবস্থান নিয়ে আজকে তাকাতে হবে তাঁর সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দায়িত্বশীল নেতৃতের দিকে যারা কমিটি-বাণিজ্য করেছে এবং দুর্নীতিতে নিজেদের কীভাবে জড়িয়েছে, তাদের কোন কোন নেতা সংগঠনকে কমিটি ও পদবি-বাণিজ্যে নিলামে তুলেছেন। কাদের ১০ বছর আগে আর্থিক টানাপোড়েন ছিল, কারা এই ১০ বছরে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া তৃণমূল থেকে ঢাকা ও বিদেশে অর্থসম্পদ গড়েছেন। শুধু দলের নেতা-কর্মীই নয়, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের কারা কারা বেতন বৃদ্ধির পরও নামে-বেনামে অর্থসম্পদ গড়েছেন। মন্ত্রিসভা থেকে প্রশাসনের কারা কারা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে লুটপাটে যুক্ত হয়েছেন, কারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, সম্পদ গড়েছেন। এমপিদের কারা কারা নিজেদের এলাকায় অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েছেন। দেশের ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজার কোন জুয়াড়িরা লুটে নিয়ে গেছে। ক্ষমতা হারালে রাজনীতিবিদরা দেশ ছাড়েন, এলাকা ছাড়েন, অথচ একই অপরাধে যুক্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা মাফ পেয়ে যান। চাইলেই অনুমতি ছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের গ্রেফতার করা যাবে না। এ আইন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করায় শুরুতেই যে চিত্র উঠে আসছে তাতে বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেকে এবং তাদের সমর্থক তথাকথিত সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা উল্লাসের সঙ্গে বড় বড় কথা বলছেন। আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখছেন না। ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতিকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন, কীভাবে ভবন খুলে ব্যবসা-বাণিজ্য টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন, কীভাবে প্রশাসনকে যুক্ত করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মহোৎসব করেছেন। এ দেশে কোনো সরকার বা সরকারপ্রধান দুর্নীতির বিরুদ্ধে এভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। শেখ হাসিনার হারানোর কিছু নেই। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট দলের ভিতরের ও বাইরের বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র ও হত্যাকান্ডে গোটা পরিবার হারিয়েছেন। শেখ রেহানা বোনের বিপদে পাশে দাঁড়ালেও দলের ক্ষমতার পাদপ্রদীপে কখনো কোথাও দেখা যায় না। তাদের দুই বোনের চার সন্তান পশ্চিমা শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজ নিয়ে মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখছেন। একজন ব্রিটেনের মূলধারার রাজনীতিতে পার্লামেন্টে নিজেকে আলোকিত করেছেন। দুর্নীতির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী যে দৃঢ় মনোভাব নিয়েছেন, যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন, সেখানে তাঁর আশপাশে থেকেও যদি কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থবিত্ত গড়ে থাকেনÑ দলের মন্ত্রিসভা থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি হয়ে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতির বিষে বিষাক্ত হয়ে থাকেন, আমরা আশাবাদী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে তাঁর হাত কাঁপবে না। তেমনি এই যুদ্ধ শুধু আওয়ামী লীগের ভিতরে থাকা লুটেরাদের বিরুদ্ধেই নয়, সরকারের বাইরে থাকা বিরোধী দলের যারা অতীতে দুর্নীতি করে দেশে-বিদেশে অর্থসম্পদ গড়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ। এই কঠিন যুদ্ধ সরকার ও বিরোধী দলের অপরাধজগৎকে ষড়যন্ত্রের এক মোহনায় মিলিত করার আশঙ্কা থেকে যায়। কিন্তু এ যুদ্ধ জাতির পিতার কন্যা দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার জনগণের পক্ষে দুর্নীতিবাজ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এখানে একদিকে দেশের জনগণ তাদের সামনে শেখ হাসিনা, বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ চক্র। দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিতদের আস্ফালন একটু বেশিই থাকে। সূর্যের তাপের চেয়ে বালির তাপের গরম একটু বেশি থাকে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ শক্তি জনগণের আদর্শিক শক্তির সামনে একদম অসহায়, দুর্বল। দলের মধ্যেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল আদর্শিক সৎ, নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের নিয়ে গণমানুষের দল আওয়ামী লীগকে এবং তার সব সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর উপযুক্ত সময়। ১০ বছর আগে যাদের দলের ভিতরে-বাইরে টানাপোড়েনের জীবন ছিল, সেসব নারী-পুরুষ যারা এই ১০ বছরে দামি গাড়ি, দামি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, দামি দামি পোশাক ও ভোগবিলাসের জীবনে মত্ত হয়েছেন তাদের আইনের আওতায় আনার সময়। দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেট সংখ্যায় অনেক কম। জীবন সংগ্রামে নিবেদিত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শেখ হাসিনার ৩৯ বছরের রাজনীতি আন্দোলন ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ে অবহিত। বার বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি বাংলাদেশকে অর্থনীতির বিস্ময়কর উচ্চতায় নিয়েছেন। দেশের বিরাজমান সব খাতে দুর্নীতি সহনীয় পর্যায়ে এলে, দুর্নীতিবাজদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করালে গোটা দেশ ঠিক হয়ে যাবে। ব্যবসাবান্ধব শেখ হাসিনার পাশে দেশের বড় বড় শিল্পপতি থেকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও খেটে খাওয়া মানুষ থাকবে। সৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পাশে দাঁড়াবে। জনগণের শক্তিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক উত্তরাধিকারী বহন করা নেতৃত্বের জায়গায় শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনাই দৃশ্যমান। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা এ যুদ্ধে জয়ী হলে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিজয়ী হবে।

বঙ্গবন্ধুসহ লাখো শহীদের আত্মা শান্তি পাবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী শেখ হাসিনা ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন। সংবিধান ও আইনের শাসন সুসংহত হবে এ যুদ্ধজয়ের মধ্যে দিয়ে। সুশাসনের কাছে সবাই মাথা নত করে এই সত্য মেনে নেবে যে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।

শেখ হাসিনার সামনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের অমরত্ব লাভের যেমন হাতছানি, তেমনি দেশের রাজনীতি ও জনগণকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্তিলাভের সময়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানসিক অবস্থান থাকলে চিন্তা-চেতনা থাকলে বিবেকবানরা সব মত-পথের ঊর্ধ্বে এ যুদ্ধে শেখ হাসিনার পাশে থাকবেন। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী শেখ হাসিনা অপ্রতিরোধী শক্তি হিসেবে জনগণকে নিয়ে এ যুদ্ধে জয়ী হবেন।

ব্যর্থ ও সন্ত্রাসকবলিত সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমা শিক্ষায় বহু বিবাহে অভিজ্ঞ ইমরান খান জাতিসংঘে নাকি এক ভাষণে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের একদল পাকিস্তানপ্রেমী তথাকথিত সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীর উল্লাস দেখছি। ইমরানের চাচা নিয়াজি ও টিক্কা খানরা একাত্তরে যে গণহত্যা চালিয়েছে সেই রক্তে বাংলাদেশের মাটি এখনো ভিজে আছে। ইমরান খানের ভাই-চাচারা যে আড়াই লাখ মা-বোনকে গণধর্ষণ করেছে সেই ক্রন্দন এখনো আমাদের বাতাস ভারি করে রাখে। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে ইমরান খান যদি তার বাপ-চাচাদের অপরাধের জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষমা চাইতেন, তবে না হয় বাহ্বা দিলে আমি অবাক হতাম না। আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা যায়, আওয়ামী লীগের অনেক কিছুর নিন্দা করা যায়, কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধী হতে হতে জামায়াতের আঙিনায় চলে গেলে নিজের আত্মাটাও মরে যায়। ’৭১-এর রক্তে বাঁধা বন্ধনেই ভারত আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধু। তিস্তার পানি নিয়ে, সীমান্ত হত্যা নিয়ে ভারতের কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা করা যায় কিন্তু ভারতবিরোধী হতে হতে পাকিস্তানের দিকে চলে গেলে নিজের অস্তিত্ব আর থাকে না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেশের একটি অংশ পাকিস্তান শাসনের দালালি করেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে দেশের একটি অংশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও পাকিস্তানের একদল প্রেতাত্মা বাস করে বলেই এখানে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলে পাকিস্তানের সংসদে ইমরান খানরা নিন্দার ঝড় তোলেন, এখানে তাদের দালালদের মন কাঁদে। স্বাধীন দেশে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো বাড়ির সন্তান যখন আওয়ামী লীগ জমানায় ক্রীড়া সংগঠনের নেতা হয়, কলাবাগান ক্লাবের ফিরোজরা কৃষক লীগের সদস্য হয়, তখন মুজিবকন্যাকে কঠোর হতেই হয়।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

Ads
Ads