যার টাকা বেশি তাকেই টেন্ডার ম্যানেজ করতেন খালেদ

  • ২০-Sep-২০১৯ ০৩:১৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

‘চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে খাতির আছে। যে টাকা বেশি দিতে পারে আর কি... সেই কাজ পায়। আমি টাকা দিয়ে কাজ নিচ্ছি। এই যেমন একটা কাজের জন্য প্রধান প্রকৌশলীকে দিলাম ১৯ কোটি টাকা।’ নিজের অবৈধপথে অর্থ উপার্জনের এমন বর্ণনা দিয়েছেন গ্রেপ্তারকৃত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

জিজ্ঞাসাবাদে নিজের সম্পদ, অর্থ উপার্জন, ক্যাসিনো ব্যবসার তথ্য অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। তাকে গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

খালেদ মাহমুদের বর্ণনায় টেন্ডারবাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের কয়েক দুর্নীতিবাজ নেতার সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন তিনি। খালেদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা প্রণয়ন এবং অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাসিনো কারবারের অর্থ প্রভাবশালী মহলের অনেকের পকেটেই যেত। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা থেকে সরকারি কর্মকর্তারাও এ অর্থপ্রাপ্তি থেকে বাদ যেত না। কে কী পরিমাণ অর্থের ভাগ পেতেন সে সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন খালেদ মাহমুদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘আমি গত আট বছরে ঢাকায় ৮০-৯০টি হাইরাইজ বিল্ডিং করেছি। এসব টেন্ডার আমি পেয়েছি। সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ থাকে অফিসের হাতে। কে টেন্ডার পাবে কে কী করবে এসব তো তারা নির্ধারণ করে। এত পারসেন্ট দিতে হবে এমন একটি বিষয় থাকে। তাদের (সরকারের সেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান) একটি কাজ পেতে ৫ কোটি টাকাও দিতে হয়েছে।’

কীভাবে টেন্ডার বাগিয়ে নেন সেই বর্ণনা দেন এভাবে, ‘ক্যাপাবল লাইসেন্স থাকে যেগুলোয় তারা অংশ নেয়। আমার লাইসেন্স ক্যাপাবল। এখন ই-টেন্ডার হয়। ই-টেন্ডারের তথ্যও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানার সিস্টেম আছে। সেভাবেই তারা জানালে তার পর কাজ হয়। এটা তো ধরেন এখন ওপেন সিক্রেট।’

সূত্র জানায়, খালেদ মাহমুদ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আগারগাঁও অফিসের এক কর্মকর্তাকে ৫ লাখ টাকা দেন। কারণ তার ৫০ লাখ টাকার একটি বিল আটকে রেখেছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে এ টাকা না দিয়ে তার কোনো উপায় ছিল না বলে জানান তিনি।

সূত্র আরও জানায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের টেন্ডারে ব্যাপক আধিপত্য ছিল খালেদের। চট্টগ্রামের রেলওয়ের একটি টেন্ডার নিয়মবহির্ভূতভাবে ঢাকায় আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন ধরনের কমিশন থাকে বলে জানান খালেদ। কোথাও ৫ শতাংশ কোথাও ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করে এই কমিশন।

সূত্র জানায়, অস্ত্র সম্পর্কে খালেদ বলেন, ‘আমার দুজন বডিগার্ড। একজন চলে যাওয়ায় আরেকজনকে নিয়েছিলাম।’

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুবলীগ নেতাদের অপকর্ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বৈঠকে যুবলীগের কয়েক নেতাকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যুবলীগ ঢাকা মহানগরের এক নেতা যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে। আরেকজন দিনের বেলাতেই তিন গাড়িভর্তি অস্ত্রবাজসহ প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলে। সদলবলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরে। এসব বন্ধ করতে হবে। যারা অস্ত্রবাজি করে, যারা ক্যাডার পোষে, তারা সাবধান হয়ে যান, এসব বন্ধ করুন। তা না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরও দমন করা হবে’Ñ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা বক্তব্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে খালেদ মাহমুদকে জিজ্ঞাসবাদে প্রাপ্ত তথ্যে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খালেদ অনেক ধরনের তথ্যই দিচ্ছে। সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে রাজধানীর কমলাপুরে খালেদের টর্চার সেলে পাওয়া গেছে নির্যাতন চালানোর অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। কমলাপুর ইস্টার্ন টাওয়ারে অবস্থিত ওই টর্চার সেলে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার অত্যাধুনিক মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়। কেউ খালেদের কথার অবাধ্য হলেই এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন।

অস্ত্র ও মাদক মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে খালেদ

অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে পাঁচটি মামলা করেছে র‌্যাব। গতকাল গুলশান থানায় তিনটি এবং মতিঝিল থানায় দুটি মামলা করা হয়। গুলশান থানার তিনটি মামলার বাদী হয়েছেন র‌্যাব-৩ এর ওয়ারেন্ট অফিসার গোলাম মোস্তফা এবং মতিঝিল থানার দুটি মামলার বাদী হয়েছেন র‌্যাব-৩-এর ডিএডি কামরুজ্জামান।

পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, গতকাল বিকালে অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় ৭ দিন করে মোট ১৪ দিনের রিমান্ড চেয়ে খালেদকে আদালতে পাঠানো হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আদালতে এ আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আমিনুল ইসলাম।

দুটি মামলায় মোট ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। অস্ত্র মামলায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদা আক্তার। মাদক মামলায় তিন দিনের রিমান্ড দেন মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনুর রহমান।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে ছিলেন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আজাদ রহমান। এছাড়া আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহমুদুল হক রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত তাদের আবেদন খারিজ করে দেন। হাতকড়া পরা খালেদকে গতকাল রাত ৮টা ২৫ মিনিটে কাঠগড়ায় তোলা হয়।

এর আগে, বুধবার রাতে রাজধানীর গুলশান-২ এর ৬৯ নম্বর রোডের বাসা থেকে খালেদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এ সময় তার বাসা থেকে অস্ত্র, ইয়াবা, নগদ টাকা ও ডলার উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে র‌্যাব-৩-এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল দুপুরে খালেদকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়।

Ads
Ads