শিশুর প্রতি সহিংসতা : এখানেও বাস্তবায়ন হোক জিরো টলারেন্স নীতি 

  • ১৬-Sep-২০১৯ ০৯:৫০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান :: 

শিশুর প্রতি সহিংসতার মাত্রা প্রতিনিয়ত ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দুই বছরে এক হাজারের কাছাকাছি শিশু কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছে। আবার অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে জানায় না সন্তানের ওপর ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার কথা। শিশুর ওপর দিনান্তে বেড়ে চলা সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বর্তমান সরকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।  

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ২০ শতাংশ। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৫৩ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। শুধু নির্যাতনের শিকার হয়েছে মাসপ্রতি ৪৫৭ শিশু। আগের বছরের প্রতি মাসে শিশু নির্যাতনের সংখ্যা ছিল ৩৮১ জন। চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ আয়োজিত সম্প্রতি এক সভায় সেভ দ্য চিলড্রেনের ম্যানেজার রাশেদা আক্তার উপস্থাপিত এই গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৯৭ শিশু। ধর্ষণচেষ্টা করা হয়েছে ১০৪ জনকে। ১৬১ জনকে যৌন হয়রানি ও ২৮৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যা করেছে ১৩৩ জন। অপহরণ করা হয়েছে ১৪৫ জন শিশুকে। নিখোঁজ হয়েছে ১০৪ জন। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৯০ জন। পানিতে ডুবে মারা গেছে ৩৯৫ জন শিশু। শিশু অধিকার বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ৫ বছরের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণের শিকার ৯০ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। আর ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরাই বেশি নির্যাতনের শিকার। ঢাকা জেলার ৫টি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৫ বছরে (২০০২-১৬) ধর্ষণসংক্রান্ত ৫ হাজার মামলার বিচারে সাজা হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশের। এর তিন বছর আগে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলেছে, ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার তিন শতাধিক শিশুর অর্ধেকের বয়স ১২ বছরের কম। অনেকের বয়স ৬ বছরও পেরোয়নি। 

নানা রকম ভয়ভীতি প্রদর্শন, কম্পিউটার গ্রাফিকসে আপত্তিকর ছবি তৈরি করে তা দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল, জোর করে ধর্ষণের সময় ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ফের ধর্ষণ ও প্রতারণার ঘটনা ঘটেই চলেছে। গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে খুলনায় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা চালায় বিশ বছর বয়সী খালাতো ভাই শরিফুল ইসলাম। পুলিশ গ্রেফতারও করে। তার আগে জুনে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ৫ বছরে অন্তত ২০ ছাত্রী ও কয়েক ছাত্রীর মাকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন আরিফুল ইসলাম সরকার ওরফে আশরাফুল (৩০)। আর তিনি যেসব ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন তারা পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। কিছুদিনের মধ্যে গ্রেফতার হন একই জেলার এক মাদরাসা থেকে অধ্যক্ষ আল আমিন। যিনি দেড় বছরে মাদরাসার ১০ থেকে ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণ করার কথা স্বীকার করেন। দুই বছরের শিশুও ছাড় পায়নি সহিংসতা থেকে। জানুয়ারি মাসে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আয়েশামনিকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বর্ণনা দেয় ধর্ষক নাহিদের ১২ বছর বয়সী মেয়ে বুশরা। চলতি মাসের ৭ তারিখে যশোরের মণিরামপুরে বারবার ধর্ষণের শিকার যশোরে ধর্ষণের শিকার দশ বছরের এক শিশু সন্তান প্রসব করে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে গৃহকর্মীদের ওপরে নির্যাতন, বলাৎকার, সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ওপর মানসিক নির্যাতনের খবরও পাওয়া যায়। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মর্মামিন্তক ঘটনা প্রথমেই জানতে পারেন না অভিভাবকরা। জানতে পেরে অনেকে আইনের আশ্রয় নেন। কিন্তু দেশে প্রচলিত আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত জুলাই মাসে বলেছেন, ধর্ষণে জড়িতদের জামিনে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন উচ্চ আদালতের কথা বললে আমাকে বলতেই হয়, সেখানে এ পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন ধরনের। আমার কাছে অনেক তথ্য আছে যে বিচারিক আদালতে সাজা হয়েছে বা অত্যন্ত সেনসেশনাল (সংবেদনশীল) মামলা-মোকদ্দমায়ও দেখা গেছে, উচ্চ আদালতে ওই আসামিদের জামিন দেওয়া হচ্ছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করব।’ গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের আইপিডি সম্মেলনকক্ষে ‘বর্তমান শিশু অধিকার পরিস্থিতি ও করণীয়’ নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সময়ে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার পাশাপাশি শিশু নির্যাতন বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। তারা শিশু আইন-২০১৩ বাস্তবায়ন, ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত দেশ গড়ার নতুন কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাল্যবিয়ে রোধে প্রণীত আইন, নীতিমালা ও জাতীয় পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া অসাধারণ কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘শিশু অধিকারের বিষয়টি তৃণমূলে পৌঁছাতে না পারলে কোনো সফলতা আসবে না।’

আমরা চাই, শিশু সহিংসতা খাতেও জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর ও সফল হোক। এজন্য বছরজুড়ে উপজেলা পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি করতে হবে। গ্রামের কর্মজীবী মায়ের সন্তানের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করতে হবে। শিশু আইন সংশোধনের জন্য অংশীজনদের সঙ্গে বসে সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্টদের কাছে তুলে ধরতে হবে। শিশু নির্যাতন রোধে পারিবারিক, সামাজিক ও ধমীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। নিজেদের নিয়ে আমরা যেভাবে ভাবি, ঠিক একইভাবে সরকারের পাশাপাশি যদি দেশ নিয়ে ভাবি, তাহলে শিশু সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে দেরি হবে না। 

Ads
Ads