জিয়া-এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বলা আইনত অবৈধ

  • ৯-Sep-২০১৯ ১০:১২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় এক সময় মনে করা হতো অনুন্নত দেশের মানুষরা গণতন্ত্রের উপযুক্ত নয়। উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক নেই। এই তত্ত্ব অনুসরণ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় তারা সামরিক অভ্যুত্থানে সহায়তা করে। বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসকের উদ্ভব হয়। শুধু তা-ই নয়, উন্নয়নের জন্য পুঁজির অবাধ বিকাশ দরকার বলেও তারা মনে করতো। গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানে সম্মতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র, আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। কঙ্গোতে প্যাট্রিক লুমুম্বাকে হত্যা, চিলিতে আয়েন্দেকে উৎখাত ও হত্যা করে সেসব দেশে সামরিক শাসকদের উত্থান হয়। পাকিস্তান এই তত্ত্বের জোরালো প্রয়োগ শুরু করলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হই। বঙ্গবন্ধুর শাসন তথাকথিত ইসলামী, সামরিক শাসনের উস্কানিদাতা আমেরিকা ও তাদের সহযোগীরা মেনে নিতে পারেনি। কেননা, তিনি সচেতনভাবে সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ফলে সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয় এবং সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে। ক্ষমতায় থাকার জন্য জিয়া বারবার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালিদের সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতা করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতেও কুণ্ঠিত হননি। 

জিয়ার মৃত্যুর ঠিক আগে আগে শেখ হাসিনা ফিরলেন ঢাকায় এবং পরবর্তী সময় তাকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। পুঞ্জিভূত ক্রোধ দমনের জন্য জিয়া বেশকিছু কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তার আগেই নির্মমভাবে তিনি নিহত হন। পরে ক্ষমতা দখলে নেন আরেক সামরিক জান্তা জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনিও তার সামরিক বাহিনী দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়নের ছুরি চালাতে থাকেন, নীতি অনুসরণ করেন জিয়ার। সেনাবাহিনীকে পরিণত করেন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উৎখাতে নেন যাবতীয় পদক্ষেপ। 

জিয়া-এরশাদের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়। তাদের সরকারের মূল দায়িত্বে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের বসানো হয়। এভাবে পেশির সঙ্গে অর্থের যোগ করে সেনা সদস্যদের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ও বিত্তবান করে তোলা হয়। নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তারা দুজনই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বহুমুখী প্রক্রিয়া গ্রহণ করেন। শুধু ক্ষমতায় থাকাকালীন নয়, চাপের মুখে ক্ষমতা থেকে নেমেও এরশাদ সমর্থকরা নানা অপকর্মের মাধ্যমে প্রমাণের চেষ্টা করেন যে, সামরিক শাসকই সর্বোত্তম। যে কারণে ১৯৯১ সালে পার্লামেন্ট স্থায়ী হতে না হতে বাংলাদেশের ৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সশস্ত্র হাঙ্গামার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বৃদ্ধি পায় ডাকাতি, হত্যা, ছিনতাই।

এই সামরিক সরকারের একজন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে গৃহীত হয় শোকপ্রস্তাব। যেখানে এরশাদকে ‘সফল রাষ্ট্রনায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। শোক প্রস্তাবে বলা হয়, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সফল রাষ্ট্রনায়ক এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবককে হারাল। এ সংসদ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ, বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে।’ অথচ ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণকে অবৈধ ঘোষণার মতো হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণকেও অবৈধ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জারি করা সামরিক শাসন, ওই সময় থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত জারি করা সামরিক আইন, সামরিক বিধি, সামরিক আদেশসহ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সব আদেশ ও নির্দেশকে সংবিধান-পরিপন্থী এবং অবৈধ ঘোষণা করা হয়। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায়টি দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে জ¦লজ¦ল করছে। এরই মধ্যে শোকপ্রস্তাবে এমন একটি উচ্চারণ বেদনাদায়ক। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য সেই বেদনায় সৃষ্ট ক্ষততে মলমের মতোই কাজ করে। তিনি এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে আনা শোকপ্রস্তাবের আলোচনায় নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘আদালতের রায় অনুযায়ী সাবেক সেনা শাসক জিয়াউর রহমান এবং এইচ এম এরশাদের শাসনামল অবৈধ। এ দুজনের কাউকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা বৈধ নয়। এই রায়ের মধ্যদিয়ে দেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ হয়েছে।’ 

বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় এরশাদের পর প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি এসে আমরা পৌঁছেছি। এর মধ্যে আর সামরিক সরকারকে দেখতে না হলেও একবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলার সচেতন জনগণের কারণে তা হয়ে ওঠেনি। 

সামরিক শাসন যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার জের শুধু সরকারকেই নয়, আমাদেরও টেনে চলতে হচ্ছে। আর তাদের কাউকে সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে খোদ সংসদে স্বীকৃতি দেওয়া সমীচিন নয়।

Ads
Ads