গ্রাম হবে শহর : সরকারের যুগান্তরকারী পদক্ষেপ সাফল্যমণ্ডিত হোক 

  • ৮-Sep-২০১৯ ০৯:৫৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েক দশক ধরে শহরের অর্থনীতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে বিরাট ব্যবধান খুব সহজেই চোখে পড়ত। তখনো গ্রামের মানুষের জীবনযাপন ছিল নিতান্তই দারিদ্র্য, অভাব আর অসচ্ছলতার সমন্বিত প্রকাশ। সে সময়ই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রাম এবং গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা ভাবতেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও বেবী মওদুদ-সম্পাদিত বঙ্গবন্ধুর উক্তি সংকলনগ্রন্থ ‘বাংলা আমার আমি বাংলার’ (১৯৯৮) ভূমিকায় লেখকদ্বয় লিখেছেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র স্বপ্ন ছিল বাংলার মানুষকে ঘিরে। বড় গরিব এ দেশের মানুষ। দুবেলা পেট ভরে খেতে পায় না।

শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস পরনের একটুকরো কাপড়ই জোটে না। ভেজা কাপড় গায়ে শুকাতে হয়... এই ভাষাহীন মানুষগুলোর কথা ভেবেছিলেন একজন। তিনি বলতে পেরেছেন, ‘আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি, নৌকায় ঘুরেছি, সাইকেলে ঘুরেছি, পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছি, আমি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সমস্যার সঙ্গে জড়িত আছি, আমি সব খবর রাখি।’ বঙ্গবন্ধু এদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রত্যয়ে নানামুখী পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। তার অসম্পন্ন কাজ ও স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখা হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। যার মধ্যে অন্যতম স্লোগান ‘গ্রাম হবে শহর’। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও দেখা গেছে সোনার বাংলা গড়ার প্রতিচ্ছবি। সেখানে ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ কথাটি উচ্চারণ করে বলা হয়, আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করব। যদিও সরকারের এই ‘গ্রাম হবে শহর’ যথাযথ মনে করেননি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইশতেহার-পরবর্তী লিখেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘গ্রাম হবে শহর’ স্লোগানটি যথাযথ হবে না বলে মনে করি। কারণ, তাতে দেশের ভূপ্রাকৃতিক বিন্যাস ও নৈসর্গিক বৈচিত্র্য বিনষ্ট হবে...।’ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সজল চৌধুরী নির্বাচন-পরবর্তী ১১ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে স্লোগানটির বিষয়ে লিখেছিলেন, ‘প্রশ্ন হলো, গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা, নাকি গ্রামকে শহর করার পরিকল্পনা? কোনটি সঠিক? যদি প্রথমটি হয়, তাহলে একে সাধুবাদ জানানো যায় অবশ্যই।’ মূলত আওয়ামী লীগের এই স্লোগানের উপরিতল ভাবলে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের মতো ধারণাই তৈরি হয়। আর বিশ্লেষণে গেলে পাল্টে যায় মানসিকতা। যা নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের আট মাসের কার্যক্রম প্রমাণিত করেছে।

সরকার গ্রামীণ পরিবেশ বিনষ্ট করে কোনো কিছুই করতে রাজি নয়। শেখ হাসিনাও ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমার শৈশবের স্বপ্নরঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রামবাংলার নরম পলিমাটিতে, বর্ষার কাদাপানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে, ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাক-জ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক শুনে...।’ তিনি লিখেছেন, ‘গ্রামকে তো আমি শৈশবের গ্রামের মতো করেই ফিরে পেতে চাই।’ ‘গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে কিছু কথা’ প্রবন্ধে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘গ্রামকেই করতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু।’

গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনার মধ্যেও ৫টি ছিল গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নকেন্দ্রিক। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনসহ প্রকৃতি ও পরিবেশ বজায় রেখে খেলাধুলার বিকাশে প্রত্যেক উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতেও বলা হয়েছে ওই সব নির্দেশনায়। ইতোমধ্যে গ্রামীণ জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক, সামাজিক কাঠামো রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নত আধুনিক এবং মানসম্মত করার লক্ষ্যে নানাবিধ কার্যক্রম শুরু হতে দেখা গেছে। কয়েক দশক ধরে কৃষকরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে চাষাবাদ শুরু করলেও বর্তমানে অত্যাধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে। মঙ্গাপ্রবণ ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও চাষাবাদ হচ্ছে। বন্যা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় আগের মতো ততটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারছে না গ্রামের মানুষকে। গ্রামের কৃষক ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত মানুষের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকায় তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ক্রমেই বাড়ছে। এখন এনজিও এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহযোগিতায় গ্রামাঞ্চলে স্বল্প পুঁজির নারী উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। তারা ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে গ্রামের কর্মহীন নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন। গ্রামের মহিলারা এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাড়তি আয়ের মাধ্যমে সংসারের সচ্ছলতা আনছেন। প্রতিটি গ্রাম থেকেই এখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনসম্পদ বিদেশে চাকরি করছেন। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে কয়েক তলা পাকা ভবনও উঠেছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ পৌঁছে গেছে প্রায় প্রতিটি গ্রামে। ঘর ছাড়াও সেচকল্পের সোলার সিস্টেমের ব্যবহার হচ্ছে। গ্রামীণ জীবনযাপনে আধুনিকতার ছাপ ক্রমেই সুস্পষ্ট হচ্ছে। 

দেশের ৫০ লাখ পরিবারকে দারিদ্র্যমুক্ত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। দেশে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৯ হাজার। যা মোট জনসংখ্যার ৫৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এ পরিবারগুলো নিজ উদ্যোগে তাদের নিজেদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি জোগান দেয় অকৃষি খাতে জীবন নির্বাহ করা ১ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার পরিবারের। যা আমাদের মোট জনসংখ্যার ৪৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সম্প্রতি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পটিকে বাস্তবে রূপ দিতে এর আওতায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন করে স্থায়ীভাবে গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী সব মানুষের জন্য স্থায়ী পুঁজি গঠন ও তাদের জীবিকা নিশ্চিত করা হবে। দাঁদন ব্যবসায়ী, সুদখোর এনজিও তথা মাইক্রোক্রেডিট নামক নব্য শোষণ থেকে দরিদ্র-অসহায় জনগণকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ।

সরকারের দেওয়া বোনাস ও ঘূর্ণায়মান তহবিল প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তহবিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে জানা গেছে। গ্রামের গরিব মানুষকে আধুনিক নাগরিক সুবিধাসহ ফ্ল্যাট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শুধু ফ্ল্যাট নয়, সেখানে থাকবে বাজার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, নিরাপদ পানি, সৌরবিদ্যুৎ, গবাদিপশু রাখার স্থান। মোটা দাগে একটি আবাসন কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। যা পল্লী জনপদ নামে পরিচিত হবে। তবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি দেশের সব জায়গায় সুষমভাবে পৌঁছাতে হলে, এসব ডিজিটাল মাধ্যমেই নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় দূরশিক্ষণ বা অনলাইন স্কুল, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যে টেলিমেডিসিন সেবা হতে পারে উত্তম বিকল্প। এ জন্য প্রয়োজন কানেক্টিভিটি তথা ইন্টারনেট। ঘরে ঘরে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছাতে পারলে গ্রাম বা প্রান্তিক অঞ্চলে বসেই মানুষ শহরের সব সেবা ভোগ করতে পারবে। এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা ঠিক করেছি জমির পর্চা, জন্ম নিবন্ধন থেকে শুরু করে সরকারের যত সেবা আছে, তা সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও একজন মানুষ যেন এসব সেবা সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

সেবার সংখ্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের ২ হাজার ৭৬০টি সেবা খুঁজে বের করেছি। এর মধ্যে ৯০০ সেবা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক আছে। এগুলো পৌঁছাতে হলে অ্যাপস বা ওয়েবসাইট যা করার প্রয়োজন সরকার তা করবে।’ গত শনিবার পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, আগে শহর ও গ্রামের সেবার মধ্যে দ্বিধা ছিল। শহরে বাবুরা থাকে তাই আগে তাদের সেবা দিতে হবে এ রকম ধারণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাল্টে দিয়েছেন। তিনি শহরের পাশাপাশি গ্রামে বসবাস করা মানুষের জন্য সেবা নিশ্চিত করেছেন। এখন পানি, বিদ্যুৎ শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাবে তা নয়, প্রতিটি গ্রামে এসব সেবা দেওয়া হচ্ছে।’ 

মূলত ‘গ্রাম হবে শহর’ এই সরকারের অন্যতম যুগান্তরকারী পদক্ষেপ। গ্রামে যারা বসবাস করছে, তাদের সেবা দিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের এই কাজে সবারই সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখাও দরকার। 

Ads
Ads