সেতুতেও বাঁশ! এই মৃত্যুর দায়ভার কে নেবে?

  • ২৫-Aug-২০১৯ ১০:০৯ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সেতুর রেলিংয়ে বাঁশ! মেডিকেল কলেজের বিল্ডিংয়ে রডের বদলে বাঁশ! সড়কে রডের বদলে বাঁশ! রেল স্লিপারে বাঁশ! আর কত বাঁশ কোথায় কোথায় দেওয়া হয়েছে কে জানে! গত শনিবার ফরিদপুরে যাত্রীবাহী বাসটি সেতুর রেলিংয়ের বাঁশকল্পে না পড়লে হয়তো এত প্রাণহানি দেখতে হতো না আমাদের। এত সব জায়গায় বাঁশ, বাঁশের কারণে প্রাণহানি, প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনার দায় কার? কেনই-বা এমন কাজ করা হচ্ছে। এমন ধরনের কাজ সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার আগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তাহলে কী করছেন? জনসাধারণকে সুরক্ষা দিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার তাগিদ দেওয়ার পরেও কারা চক্রান্তের পর চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে? সব প্রশ্নে সমাধান এখনোই হওয়া প্রয়োজন। ‘শাস্তিমূলক বদলি’ নয়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার জড়িতদের বিরুদ্ধে। এসব কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা আর যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত নন; তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কেউ নন। 

ফরিদপুর সদর উপজেলার ধুলদীতে যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৮ জন নিহত হয়েছেন। এমন  ঘটনা নতুন না হলেও যে কারণে প্রাণহানি হলো সেটা ভয়ঙ্কর কিছুকে নির্দেশ করছে। অনেক আগের এই ব্রিজে রেলিংয়ের অধিকাংশই বাঁশ দিয়ে মেরামত করে রাখা হয়েছে। বাঁশের ওপরে রেলিংয়ের মতো করেই করা হয়েছে লাল রং। ব্রিজের এই জরাজীর্ণ অবস্থা কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি এতদিন। ঘটনা ঘটার পর ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানান, একটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেওয়ার পর এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু চোখে পড়েনি বাঁশ। অন্যদিকে পুলিশ সুপারের ঘটনার বর্ণনায়ও আসেনি বাঁশ প্রসঙ্গ। 

২০১৬ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) একটি চারতলা ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার ছবি সামাচিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। বিল্ডিংয়ের বয়স তখন চার। পরে এ নিয়ে অনেক সংবাদও প্রকাশ হয়। ধামাচাপা দিতে দৃশ্যমান বাঁশ সরিয়ে ফেলে সেখানে প্লাস্টার দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মানুষের নজর ঘুরে যায় অন্য কোথাও। বাঁশ তখন কি রড হয়ে যায় জানে না কেউ। রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ এই ভবনের নির্মাতা। একই বছর চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একটি ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি ব্যবহারের খবর পাই আমরা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সত্যতা নিশ্চিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

২০১৮ সালের এপ্রিলে সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের বীরগাঁও-হাসকুঁড়ি সড়কে সেতু নির্মাণে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ছবিসহ প্রমাণ তুলে ধরলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাহাদাৎ হোসেন ভুঁইয়া ওই স্থান পরিদর্শন না করেই এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তারপর ঘটনা আড়াল হয়ে পড়ে। রডের পরিবর্তে বাঁশের এমন নানাবিধ ব্যবহার তখন যেন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। একের পর এক বাঁশের অভিনব ব্যবহার ও প্রকল্প কর্মকর্তাদের বাঁশ ব্যবহারের পক্ষে বক্তব্য শুনতে পাই আমরা। তিস্তা-কুড়িগ্রাম রেলপথের টগরাইহাট রেলস্টেশনের কাছে জোতগোবরধন এলাকায় প্রায় ৫০ মিটার রেলসেতুর ওপর রেললাইন ঠিক রাখার জন্য কাঠের স্লিপারে বাঁশের ফালি নিউজে নিউজে ভাসতে থাকে।

বাঁশের ফালি লাগানো পাওয়া যায় কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎসংলগ্ন মুক্তারাম ত্রিমোহনী এলাকার একটি বক্স কালভার্টের ওপরও। অথচ লালমনিরহাট রেলওয়ের তদানীন্তন বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম ‘রেললাইনে গাছের ডাল ও সেতুতে বাঁশ ব্যবহার করায় কোনো সমস্যা নেই’ বলে সরল উক্তি দিয়ে দেন। সামান্য লজ্জাবোধও দেখা যায়নি তার কাছ থেকে। বরং নানা ব্যাখা দেন বাঁশ ব্যবহারের পক্ষে।  ফেনীর শর্শদীতে কালভার্ট নির্মাণে আরও অভিনব তথ্য পেয়েছিলাম আমরা। ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কালভার্টে রডের পরিবর্তে বাঁশ ও কলাগাছ ব্যবহার করা হয়েছিল। ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের শর্শদী গ্রামে ডা. রফিকের বাড়ির সড়কে ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছিল কালভার্টটি। 

একবার গাইবান্ধায় মেঘডুমুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগার (ওয়াশ ব্লক) নির্মাণকাজেও ইস্পাতের রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের খবর আসে গণমাধ্যমে। আরেকবার পাবনার সুজানগর উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের বিন্যাডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের দুটি কক্ষের দরজার ওপরের ঢালাই ভেঙে বাঁশের লাঠি বেরিয়ে আসার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। এ ঘটনার পর বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সেখানে ক্লাস না করানোর জন্য লিখিত নির্দেশ দেয় উপজেলা শিক্ষা বিভাগ। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কর্তৃপক্ষ ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি করে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এভাবেই শিশুপ্রাণকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতেও তাদের হৃদয় এতটুকু কাঁপে না।

কয়েক বছর আগে সারা দেশে সরকারি ভবন তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা একের পর এক ফাঁস হতে থাকায় পূর্তকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। ভবন ও স্থাপনাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কটাক্ষমূলক মন্তব্য করেন। তবে এসব কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কম বলেই মনে হয়েছে। এমন কেলেঙ্কারির বিচার ‘শাস্তিমূলক বদলি’কে আসলেই কি শাস্তি বলা যায়? নিশ্চয় নয়। 

বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় শুধু প্রাণহানি বা প্রাণসংশয়ই বাড়ছে না, দেশ পিছিয়ে পড়ছে। একদিকে যেমন জনগণের টাকার অপচয় হচ্ছে, তেমনি জনভোগান্তিও বাড়ছে। কিছু অসাধু লোকের জন্য দেশের সুনাম নষ্ট হওয়ার এমন ঘটনা যেন আর না বাড়ে সেদিকে লক্ষ রেখে অসাধু এই চক্রকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। 

Ads
Ads