পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই

  • ২৩-Aug-২০১৯ ১০:৫১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

‘বাঘে ধরলে এক ঘা, পুলিশে ধরলে ১৮ ঘা।’ প্রবাদ বাক্যটি এখনো প্রচলিত। অথচ এই প্রবাদ উল্লেখ করেই পুলিশকে জনসাধারণের বন্ধু বারবার তাগিদ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু খবরের পাতায় পাতায় ভেসে উঠেছে পুলিশ প্রশাসনের বেশ কিছু সদস্যের অপকর্ম চিত্র। ফুটে উঠেছে উৎকোচ, স্বজনপ্রীতি, হয়রানিমূলক গ্রেফতার, অপহরণ, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণের মতো ঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততা। দুই যুগ আগের কিশোরী ইয়াসমিনকেই শুধু নয়, কয়েক দিন আগেও ধর্ষণ করেছে পুলিশ। ‘এখন আইনের রক্ষকই আইনের ভক্ষক’ বলেছেন দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। আমরা এমনটা দেখতে চাই না। পুলিশকে আমরা জনবান্ধব, জনগণের খুব কাছের বিশ^স্ত হিসেবে পেতে চাই। কিন্তু কোন পথে সফল হবে আমাদের চাওয়া- সেটাই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশে জননিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর চ্যালেঞ্জ সহজেই অনুমেয়। জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলায় পুলিশ বাহিনীর কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করতেই হয়। আগের তুলনায় চুরি-ছিনতাইও কমেছে। কিন্তু ইদানীং বেড়েছে সামাজিক অপরাধ-সহিংসতা। এদিকে পুলিশ সদস্যদের একাংশের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া এবং পুলিশ কর্তৃক অপরাধ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিবি পোশাকে বা ডিবি পরিচয় দিয়েও গ্রেফতারের নামে অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটতে দেখেছি। বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতিই মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি করে। টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘এমন কোনো অপরাধ নেই, যার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যুক্ত হওয়ার অভিযোগ এখন পাওয়া যাচ্ছে না। সব ধরনের অপরাধের সঙ্গেই তাদের একাংশের যোগসাজশ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার দৃষ্টান্ত অহরহ সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্নভাবে উঠে আসছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমরা যাচ্ছি, যেখানে আইনের রক্ষকই আইনের ভক্ষক। এভাবে চলতে থাকলে এমন একটা সময় দাঁড়াবে, যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নাম বদলে আইন লঙ্ঘনকারী সংস্থা রাখতে হবে। আমরা এই পরিস্থিতি দেখতে চাই না।’ ২০১৮ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পুলিশ বলপূর্বক অর্থ আদায় বা ঘুষের সঙ্গে ব্যাপকভাবে জড়িত। আমাদের গবেষণায় ৭০ শতাংশ মানুষই বলেছেন, ঘুষ না দিলে কোনো সেবাই পাওয়া যাবে না।’ 

২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের ১৫ ধারায় শক্ত ও পোক্ত হয়। এরপরও থেমে নেই পুলিশি নির্যাতন, গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ। ১৯৯৫ সালের আগস্টের এই দিনে (২৪ আগস্ট) ইয়াসমিনকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুলিশভ্যানেই ধর্ষণ ও পরে ধর্ষণ করেছিল তিন পুলিশ। আলোচিত এই ঘটনায় প্রথমদিকে মামলা নিতে অস্বীকৃতি এবং পরে পুলিশ কর্তৃক বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার ঘটনা আমরা দেখেছি। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অভিযুক্তদের মৃত্যুদ- কার্যকরের পর আমরা ভেবেছিলাম আর কোনো পুলিশ অন্তত এমন কাজ করবে না। কিন্তু পরে আরও কিছু ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। গত সপ্তাহে খুলনা রেলওয়ে (জিআরপি) থানায় এক নারীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে পুলিশের কাছে।

সম্প্রতি ডিআইজি মিজান কেলেঙ্কারির ঘটনা কার জানতে বাকি আছে? অথচ আদালতে হাজিরার আগে-পরে তার হাসিমুখ ও হাতে ভিকট্রি চিহ্ন আমাদের অবাক করেছে। এসব ঘটনায় মামলার বিচার দ্রুত হওয়া জরুরি। কারণ আমরা আগেই বলেছি, পুলিশকে আমরা জনগণের বন্ধু হিসেবেই পেতে চাই। তারা থাকবেন আমাদের আস্থার জায়গায়। এই ঘটনা নিশ্চয় পুলিশের প্রতি আমাদের আস্থা বাড়ায় না। আমাদের চাওয়া পুলিশের ইতিবাচক ভূমিকা ও পেশাগত কৃতিত্বই উজ্জ্বল হোক। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা সামনে নিয়ে পুলিশ বাহিনী আগামীদিনে আরও জনবান্ধব হবে ও জননিরাপত্তায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করতে পারি।

Ads
Ads