ডেঙ্গু-আতঙ্কে দেশবাসী

  • ৩০-Jul-২০১৯ ০৯:২১ অপরাহ্ন
Ads
  • # ৫০ জেলায় সহাস্রাধিক আক্রান্ত, ঈদের ছুটিতে আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা
  • # রক্ত পরীক্ষায় ঢামেকে ৮০ শতাংশই ঢাবি’র শিক্ষার্থী, রাবিতে উদ্বেগ
     

:: জিএম রফিক ::

প্রতি ঘণ্টায় বেড়ে চলা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এখন রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে এখন ৫০ জেলায়। ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার বাইরে শনাক্ত হয়েছে সহ¯্রাধিক রোগী। এদের ৯০ শতাংশই ঢাকা থেকে যাওয়া। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীতে জ¦র না হলেও অনেকেই রক্ত পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে ভিড় করছেন। গত শুক্রবার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে শিক্ষার্থী ফিরোজ কবির স্বাধীনের মৃত্যুর পর থেকে ঢাকা মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের রক্ত পরীক্ষার ঢল নামে। ডেঙ্গু আতঙ্কে স্কুল কলেজেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। দিন দিন বাড়তে থাকা ডেঙ্গুরোগীদের বেড দিতে পারছে না অধিকাংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই বাঁচার আশায় হাসপাতালের ফ্লোরে বিছানা পেতে অবস্থান নিচ্ছেন। ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে ফ্লোরে আবস্থান নেয়াদের মধ্যে যেমন বয়স্করা রয়েছেন, তেমনি রয়েছে শিশুরা। এদিকে ঈদের উপলক্ষে নিজ জেলায় ফিরতে শুরু করেছে রাজধানীবাসী। এতে জেলা শহর, গ্রামগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়বহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

৫০ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত ১২৮৩ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরের এই সব ডেঙ্গু রোগীর ৯০ শতাংশ ঢাকা থেকে যাওয়া। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. সানিয়া তহমিনা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সোমবারও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৩ ব্যক্তির মৃত্যের খবর পাওয়া গেছে। গাজীপুরের টঙ্গিতে কর্মরত অবস্থায় ভোরে রহমান সাজু নামের এক ব্যক্তি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করেছে। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুয়েল মাহমুদ নয়ন ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেলিম বিশ্বাস আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনো বেশি। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরাও। 

জানা গেছে, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশে ১১ হাজার ৬৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এডিস মশার ছোবলে প্রতিদিন শিশুসহ কয়েকশ নারী-পুরুষ হাসপাতালে ছুটছেন। হাসপাতালের বেড অথবা বেড না পেয়ে ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিলেও ডেঙ্গু মশার বিষের যন্ত্রণা থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলছে না। রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু রোগীদের এই চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের অষ্টম তলার ফ্লোরেও ভর্তি রেখে চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সন্তানকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন ফাতেমা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবুর খুব জ্বর। তিন দিন ধরে এই হাসপাতালে আছি। জ্বর কমছে না। ব্যথায় বাবু ছটফট করছে। ছেলের এমন অবস্থা দেখে কোনো মা কি ঠিক থাকতে পারে? এতটুকু শরীরে ও এত যন্ত্রণা কীভাবে সহ্য করবে? নারায়ণগঞ্জ থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে মুগদা হাসপাতালে আসা খায়রুল বলেন, ‘গত শুক্রবার বাবুর ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। এখন কিছুটা ভালো। কিন্তু গায়ে প্রচ- ব্যথা রয়েছে। বাবু এখনো ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। ব্যথায় কাতরাচ্ছে। ওর মা তো সারাদিনই ছেলের জন্য কান্নাকাটি করে। আমি সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মায়ের মন তো সহজে মানে না।’ অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এত কিছু করছি। কিন্তু মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছি না-এটা কেমন কথা?’
এদিকে ঈদের উপলক্ষে নিজ জেলায় ফিরতে শুরু করেছে রাজধানীবাসী। এতে জেলা শহর, গ্রামগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়বহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘স্বাস্থ্য অধিদফতর সম্পূর্ণভাবে সতর্ক রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ‘জেলাগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে গতকাল সোমবার কিট (এক ধরনের ডিভাইস) পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকেও যেন এটা কোনোভাবে ছড়িয়ে না যায়, সে বিষয়েও আমরা সতর্ক থাকার জন্য চেষ্টা করছি।’ অন্যদিকে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোকেও ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার সারা ঢাকা শহরকে অঞ্চলভিত্তিক ভাগে শনাক্ত করা হবে। পরে সেসব অঞ্চলের সব স্কুল-কলেজে প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এজন্য মেডিকেল কলেজের শিক্ষকরা টিম গঠন করবেন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর তাদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।’

অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু সন্দেহে রক্ত পরীক্ষা করতে যাওয়া রোগীর ৮০ শতাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের এক চিকিৎসক। স্বাধীনের মৃত্যুর পর থেকে আতঙ্কি হয়ে পড়েছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। গত কয়েকদিন যাবত প্রতিদিনই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে জ্বরাক্রান্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে ছুটছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের শিক্ষক মো. আনিসুর রহমান ভোরের পাতাকে বলেন, বর্তমানে ঢামেক ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১০০ জন জ্বরের রোগী ডেঙ্গু পরীক্ষা করাচ্ছেন। এ সব রোগীর ৮০ শতাংশই ঢাবি শিক্ষার্থী।’ এদিকে রাজশাহীতেও ৯ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়ায় ছড়িয়েছে পড়েছে আতঙ্ক। 

মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক রোগতত্ত্ববিদ ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এ মুহূর্তে সমাজের সব স্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও ওষুধ স্প্রে করতে হবে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকরভাবে ওষুধ ছিটাতে পারলে এক সপ্তাহের মধ্যে মশা কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।’

Ads
Ads