রোহিঙ্গাদের দাবি মেনেই হোক প্রত্যাবাসন 

  • ২৮-Jul-২০১৯ ১০:২৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সেবার ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুত দিয়েও কথা রাখলেন না, এবার ফিরতে আহ্বান জানালেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে প্রত্যাবাসনের পর ফেরত নিয়ে কোথায় রাখবে, তাদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্য বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা তুলে ধরলেন, রোহিঙ্গারা খুশি হতে পারলেন না। কিন্তু কেন তারা খুশি হতে পারলেন না? ওই যে নাগরিকত্ব ও জানমালের নিরাপত্তা। প্রজেকশন করে দেখানো হলেও সেখানে এই দুটি বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নন রোহিঙ্গারা। তাদের মূল দাবিকে বাস্তবায়নের রূপরেখা না এঁকে রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে বলা, প্রত্যাবাসনের নামে ছলচাতুরী কি বিশ্ব দরবারকে আইওয়াশের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে মিয়ানমার?

শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশে এসেছে ১০ সদেস্যের প্রতিনিধিদল। কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং শিবিরে এক প্রজেকশনে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে কোথায় রাখবে, তাদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্য বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে। নাগরিকত্ব ও প্রাণের নিরাপত্তা বিষয়ে আশ^স্ত হতে না পেরে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা বা সংলাপ অব্যাহত রাখতে চান বলে জানিয়েছেন আশ্রিত রোহিঙ্গারা। আসলেই যদি মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চায় তবে এই সুযোগ দিতে কোনো গড়িমসি করা ঠিক হবে না। কারণ ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশ কয়েকটি দেশ নড়েচড়ে বসেছে। এতদিন চুপচাপ চীনও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছেন। এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের চিন্তা একধাপ এগিয়ে। তিনি নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্ব অথবা আলাদা রাষ্ট্রগঠনের সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংকটের সমাধান করা উচিত বলে মনে করছেন। ইতিহাস বলে, ব্রিটিশ শাসন আমলে মিয়ানমারের অনেক আলাদা রাজ্যকে এক রাষ্ট্রে পরিণত করতে বার্মা নামে একটি রাষ্ট্রের রূপ দেওয়া হয়, যেখানে অনেক জাতিগোষ্ঠী বার্মা নামক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়। সুতরাং নাগরিকত্ব না দিতে পারলে তাদের আলাদা রাজ্য করে দিতে বাধা কোথায়? এদিকে গত মাসে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বাজেটবিষয়ক শুনানিতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় উপকমিটির চেয়ারম্যান ব্রাড শেরম্যান রোহিঙ্গাদের জন্য মানচিত্রটাই বদলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে দেশটি থেকে আলাদা করে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বিবেচনার জন্য পররাষ্ট্র দফতরের প্রতি আহ্বান জানান।

১৩ জুন অনুষ্ঠিত ওই শুনানির সূচনা বক্তব্যে ব্রাড শেরম্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেছেন, সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে আলাদা করে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে যুক্তরাষ্ট্র যদি সমর্থন করতে পারে, তাহলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেন একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না? দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে মিয়ানমারের পরিস্থিতির কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে উল্লেখ করে কংগ্রেস সদস্য শেরম্যান ওই শুনানিতে অংশ নেওয়া পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিনিধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নসহায়তা প্রতিষ্ঠান, ইউএসএআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রশাসকের উদ্দেশে বলেন, সুদান সেখানকার নাগরিকদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করেনি। কিন্তু মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করছে, তাদের পাসপোর্ট দেওয়া হয় না এবং অন্যান্য অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। মিয়ানমারে একটি গণহত্যাও সংঘটিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমার যদি রাখাইনের রোহিঙ্গা নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে না পারে, তাহলে যে দেশ তাদের দায়িত্ব নিয়েছে, সেই বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইনকে জুড়ে দেওয়াই তো যৌক্তিক পদক্ষেপ। যদিও সে সময় বা তার পরে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকরা অবশ্য কংগ্রেসম্যান শেরম্যানের বক্তব্যকে সমর্থন বা নাকচ কোনোটিই করেননি। আমরা অবশ্য শেরম্যানের যৌক্তিক অথচ কঠিন সিদ্ধান্তে জড়িয়ে নিজেদের সময়কে নষ্ট করতে চাই না বলেই বিভিন্ন সময়ে জানিয়ে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইনকে যুক্ত করার পক্ষে নন। তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়েই সবসময় কথা বলেছেন। জাতিসংঘে, বিভিন্ন দেশ সফরেও তিনি প্রত্যাসানের বিষয়েই বক্তব্য দিয়েছেন। 

এপ্রিলে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুর্নবাসনমন্ত্রী ড. উইন মিয়াত আয়ে বলেছিলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে আগের সেই পরিবেশ আর নেই। সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য ৩০টি ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। ক্যাম্পে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের কিছুদিন রাখার পর নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা যাতে সেখানকার অধিবাসীদের মতো চলাফেরা করতে পারে সে ব্যবস্থাও করা হবে। রোহিঙ্গারা জীবন-জীবিকার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। তাদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্য স্কুল, মাদরাসা, কলেজ নির্মাণ করে দেওয়া হবে। তবে প্রত্যাবাসনের আওতায় ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রথমে এনভিসি কার্ড সংগ্রহ করতে হবে। পরে তাদের নাগরিকত্ব সনদসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এই পরে কবে, তা তারা নিশ্চিত তো করেনইনি, বরঞ্চ প্রত্যাবাসন শুরুই করলেন না। অক্টোবরে মিন্ট থোয়ে ‘নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে ফিরে নেওয়া হবে’ বলে জানিয়েছিলেন। সেটারও কোনো কার্যকর রূপ এ পর্যন্ত দেখা গেল না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিত্ব শিউলি শর্মার মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের মধ্যে মিয়ানমার সরকারের ব্যাপারে আস্থার সংকট রয়েছে। কারণ মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে না। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর মিয়ানমার সরকারের পদক্ষেপগুলোতে সেটাই প্রমাণ করেছে।’

রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিষ্ক্রিয়তা ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের প্রশ্নেও ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারার বিষয়টি বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর প্রভাববলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বলে ধারণা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মিয়ানমারের বৈষম্যমূলক নীতি পরিবর্তনে অনীহা, নাগরিকত্বের স্বীকৃতিদানে অস্বীকৃতি এবং নানা ধরনের কূটকৌশলে পুরো বিষয়টি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দীর্ঘায়িত হয়ে চলা প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ও আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এরই মধ্যে গত শনিবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে ১০ সদেস্যের একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং শিবির পরিদর্শন এসে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরার আহ্বানকে আমরা আপাতত পজিটিভ অর্থে ধরে নিতে পারি। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতপূর্বক প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া দ্রুতই শুরু হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 

Ads
Ads