প্রসঙ্গ ডেঙ্গু : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করুন

  • ২৭-Jul-২০১৯ ১০:০৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

লম্বা হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর তালিকা, বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। তারপরও জনগণের ভরসার জায়গায় অবস্থান করে অনেককে সান্ত¡নার বুলি আওড়াতে শোনা যায়। ‘দায়িত্ব’ নিয়ে দক্ষিণ সিটি মেয়র সাঈদ খোকন ‘ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’ বলে গত কয়েক মাস ধরে যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সঙ্গে ‘গুজব’ ও অতিরঞ্জিতের মতো খেতাব জুড়ে দিলেন। মশার ওষুধ নিয়ে আইসিডিডিআর-বির পরীক্ষাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘পুরোপুরি না হলেও ওষুধের কার্যকারিতা আছে।’ স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মেয়র খোকনের সেই কথাকে আরও শক্তিশালী করতে বললেন, ‘আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি ওষুধ ঠিক আছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ডেঙ্গুর আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিকে করে তুললেন রঙ্গ-তামাশার বিষয়বস্তু। বললেন, ‘যেভাবে রোহিঙ্গা পপুলেশন বাড়ে আমাদের দেশে এসে, সেভাবে মসকিউটো পপুলেশন বেড়ে যাচ্ছে।’ অথচ এসব কথা না বলে যদি সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালালেও বোধহয় জনসাধারণের উপকার হতো বলে আমরা বিশ্বাস করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা বসে থাকেননি। তিনি নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে সব অনুধাবন করেছেন। ইতোমধ্যে  ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে জনগণকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন’।  সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ জানিয়ে দিয়ে, কথা কম বলে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন অন্যান্য মন্ত্রী ও মেয়রদের।

ডেঙ্গু নিয়ে পথেঘাটে, হাসপাতালে, রোগীর বাড়ি, মোবাইল কোর্ট ইত্যাদি ইত্যাদি করে মাঠ গরম করে রেখেছেন মেয়র খোকন। স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে অ্যারোসল দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এসব তৎপরতা কতটুকু উপযোগী তার প্রশ্নে পরে আসছি। কিন্তু এই তৎপরতার ৫ শতাংশও কি আমরা ডেঙ্গুর বিস্তারকালীন সময় মে-জুনে দেখেছি? ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য মশা নিধনের ওষুধ আমদানির বাজেট ৪০ কোটি টাকা। সেই সময় সম্ভবত তারা পুরো টাকার ওষুধই আমদানি করেছেন। ‘ছিটিয়েছেন’ বলেও শোনা গেছে। মাঝেমধ্যে রাস্তার পাশ দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা এক-দুজনকে হেঁটে হেঁটে ধোঁয়াও ওড়াতে দেখেছি আমরা। সে সময়েই অনেকে বলেছেন, ওষুধ দিলেই যেন মশার প্রকোপ বাড়ছে। ওই সময় কথাগুলো মজা বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা আতঙ্কের মধ্যে সেই মজা টের পাচ্ছি। আর দায়িত্বরত বিশেষ ব্যক্তিরা সাধারণকে নিয়ে করছেন মজা। তারা  কয়েকশ মেডিকেল টিম তৈরি করেছেন, বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষা ও অ্যারোসলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর কী চাই! অর্থমন্ত্রী তো মশা এডিসের ভয়ে পরিকল্পনা কমিশনে যাচ্ছেনই না! বলেছেন, ‘ওখানে বেশি মশা। এ পর্যন্ত দুবার কামড় দিয়েছে, একবার চিকুনগুনিয়া ও আবার ডেঙ্গু... এটা কি কথা হলো নাকি?’ আমাদেরও একই কথা, ‘এটা কি কথা হলো নাকি?’

জানা গেছে, গত সাত মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কমিটির সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বেশ কয়েকবার আলাপ-আলোচনাও হয়েছে ডেঙ্গু নিয়ে। উবাকিয়া পদ্ধতির ব্যাপারে ওয়ার্ল্ড মসকিটো প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাবও করা হয়েছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় রূপ নিলে এখন সংশ্লিষ্ট ওই মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু মোকাবিলায় কর্মকর্তারা দুটো পদ্ধতি ‘উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া’ ও ‘জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা’ এর তুলনা করে দেখছেন। তাও ভালো, তারা এখন তুলনা করতে শুরু করছেন। তার মানে, তাদের ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান উবাকিয়া পদ্ধতির পক্ষে বলছেন, প্রাকৃতিক উপায় হওয়ার কারণে এতে খরচ কম। এর ফলে মশার ইকোলজিতেও কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এই পদ্ধতির ভালো দিক হচ্ছে এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। আমাদের শুধু একবার হস্তক্ষেপ করতে হবে। আর করতে হবে না। এই দুটো পদ্ধতিই চীনে দুবছর সময় ধরে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। দেখা গেছে, সেখানে মশার বংশবিস্তার ৯০ শতাংশের মতো কমে গেছে। ওয়ার্ল্ড মসকিটো প্রোগ্রামের বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বিশদ গবেষণা করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার পরে এই পদ্ধতি বিশ্বের ১২টি দেশে পরীক্ষা করে সাফল্য পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ রয়েছে শ্রীলংকা, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো। বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা জিএম মশা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়েও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। জিএম মশা দিয়ে রোগ প্রতিরোধের কথা শুনতে অনেকটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো হলেও গত কয়েক বছরে এই পদ্ধতিতে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এই মশাকে বলা হচ্ছে ‘বন্ধু মশা।’ অক্সিটেকের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ব্রাজিল, পানামা ও কেম্যান আইল্যান্ডের কোনো কোনো অঞ্চলে এই পদ্ধতিতে এডিস মশার সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু এতসব পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত, তার আবার বাস্তবায়ন তো পরের কথা, বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে এখনই। আর তার বাস্তবায়নও হতে হবে আজই! কিন্তু তা কী করে সম্ভব মেয়র মহোদয়রা ভেবেছেন কখনো? তারা কি জানেন, রাজধানীতে এখন মানুষ আছেন সৃষ্টিকর্তার ভরসায়! 

Ads
Ads