‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার’: টিআইবির সুপারিশকে গুরুত্ব দিতে হবে

  • ২৫-Jun-২০১৯ ১০:৩৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে এমন প্রশ্নটি যদি কোনো জনপরিসরের মধ্যে তোলা হয় নিঃসন্দেহে সবার আগেই যে উত্তরটি পাওয়া যাবে সেটি হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে মানুষ নানাভাবেই নিয়ে থাকেন। কেউ মনে করেন এর পেছনে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারের প্রতি আনুগত্য নিরঙ্কুশ রাখা। তবে সরকারের দাবি হচ্ছে, সরকারি চাকরি থেকে ঘুষ-দুর্নীতি দূর করার স্বার্থেই এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু কার্যত আমরা কী দেখছি। এ কথা ঠিক যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সরকারের অনুগত হয়েছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন  তোলা হয়, ঘুষ-দুর্নীতি কি কমেছে? কি উত্তর হবে এর? 
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার : নীতি ও চর্চা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেলেও দুর্নীতি কমছে না। কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি সুবিধা বাড়ানো হলেও তারা নিজেদের গাড়ি ব্যবহার না করে পরিবহন পুলের গাড়ি ব্যবহার করছে। এতো গেল টিআইবির পর্যবেক্ষণ। বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পরও যে দুর্নীতি কমেনি, ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর এক বক্তব্যেও তা ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখেছেন, তিনি প্রশাসনে এত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরও কেন দুর্নীতি হবে? অনেক বিলম্বে হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই দুর্নীতি মহোৎসব প্রধানমন্ত্রীর গোচরে এসেছে। কিন্তু এদেশের মানুষের গোচরে এটা অনেক আগেই এসেছে এবং নিত্য আসছে। কাজেই এ প্রশ্ন শুধু প্রধানমন্ত্রীর নয়, এ দেশের সবার। আর একই প্রশ্নের সাথে প্রধানমন্ত্রীও একাত্ম হওয়ায় এই প্রশ্নটি আজ সার্বজনীন প্রশ্নে উত্তীর্ণ হয়েছে। কাজেই এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই দুর্নীতির মূলোৎপাটন কীভাবে করা যায় সে নিয়ে শিগ্গিরই এমন একটি সার্বজনীন রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে যাতে এ দেশটিও ইউরোপের স্বল্প দুর্নীতির দেশগুলোর কাতারে উত্তীর্ণ হতে পারে।

কিন্তু আমরা যদি ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি, দুর্নীতিমুক্ত দেশের স্বপ্ন কেন দেখতে পারি না? নাকি এই স্বপ্ন দেখা দুঃস্বপ্নের মতো!
সেতো গেল আমাদের দুর্নীতিমুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখা। বাস্তবতা হচ্ছে, জনপ্রশাসনে দুর্নীতি হচ্ছে হরেক কৌশলে, বিচিত্র উপায়ে। আর দেশে দুর্নীতির একটি বড় উপলক্ষ হলো সরকারি চাকরিতে নিয়োগ। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৮) সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থায় নিয়োগে দুর্নীতি-অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বলা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির সূত্রপাত ঘটে শুরু থেকেই। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি বা নিয়োগ পাওয়ার মধ্যদিয়ে। অর্থাৎ যারা মোটা অংকের উৎকোচের মাধ্যমে চাকরি লাভ করে, পরবর্তী সময়ে তারা আরও বেশি দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। একপর্যায়ে তারা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অন্যদের নিয়োগ দেয়। আর এভাবেই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে দুর্নীতি। দুর্নীতির এই দুষ্টচক্র এতোটাই প্রভাবশালী যে, এ কারণেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি রোধ করা যাচ্ছে না। কাজেই আমরা মনে করি, এই দুর্নীতি দমন করতে হবে, তার আগে ধ্বংস করতে হবে এই দুষ্টচক্রটি। টিআইবির মতে, মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই সঠিকভাবে জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার চর্চা হচ্ছে না। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে এই সদিচ্ছা না থাকাটাও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়াই বলতে হবে। এভাবে প্রকারান্তরে এটাকেও এক ধরনের দুর্নীতি বলতে হবে। কেননা, এই সদিচ্ছা না থাকাটাও দুর্নীতির একটি কারণ বলতে হবে। দুর্নীতির অপর একটি কারণ হচ্ছে, মানুষের মন-মানসিকতা। বলা হয়ে থাকে, মানুষের লোভের বা চাওয়ার কোনো শেষ নেই, যে যত বেশি পায় সে তত বেশি চায়। কাজেই সর্বাগ্রে মানুষের এই লোভী মনোবৃত্তির পরিবর্তন করতে হবে। বস্তুত সমাজে নীতি-নৈতিকতা কমে আসার কারণেই মানুষের মধ্যে মাত্রাহীন লোভ-লালসা বাড়ছে। এখন, এ অবস্থায় মানুষের মধ্য হতে এই লোভ-লালসা নিবারণ করা কীভাবে সম্ভব হবে? সে জন্য তো সমাজবিজ্ঞানীদেরই এগিয়ে আসা উচিত। ভাবতে হবে কীভাবে এই লোভ-লালসা দূর করা যায়।

কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা এখনই সেরকম কোনো বাস্তব দিক-নির্দেশনা দিতে পারুন বা না পারুন সেজন্য তো সরকারকে বসে থাকলে চলবে না। এ জন্য ততোদিন পর্যন্ত না হয় সরকারের কঠোর অবস্থান এবং আইন ও বিধানের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূলের চেষ্টা চালিয়ে গেলে ক্ষতি কি? তাতে কি দেশের সুশীল সমাজ তেতে উঠবেন?

আমরা দেখছি যে, টিআইবির গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার নীতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি বছর সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা দিচ্ছেন না। এ বিধানটি নিয়মিত প্রতিপালিত হলে তা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। টিআইবির এ সংক্রান্ত সুপারিগুলোর মধ্যে রয়েছে- সরকারি কর্মচারী আইন-১৯৭৯ শুদ্ধাচার কৌশলের আলোকে হালনাগাদকরণ, আয়কর প্রদানের বাইরে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রদানে সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল কাঠামো তৈরি করে সে অনুযায়ী বার্ষিক সম্পদের হিসাব নিশ্চিতকরণ, জনপ্রশাসনের উচ্চপদগুলোয় শূন্যপদের বিপরীতে অতিরিক্ত নিয়োগ না দিয়ে নিচের পদগুলো পূরণ, পদোন্নতিতে বৈষম্য দূর করে সব ক্যাডারকে সমান সুযোগ দেওয়া ইত্যাদি। আমরা মনে করি, টিআইবির এসব সুপারিশ গ্রহণযোগ্য। কাজেই সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি, আর গালভরা বুলি বা জনমনোরঞ্জনকর বাক্যমালায় ডুবে না থেকে প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কেননা, এর ওপরই কিন্তু অনেকাংশে নির্ভর করছে দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা কমে আসবে নাকি ক্রমশই বাড়তে থাকবে, যেভাবে বেড়ে চলছে। আমরা যদি ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি তবে দুর্নীতির ব্যাপকতামুক্ত দেশের স্বপ্ন কেন দেখতে পাবো না?

Ads
Ads