মোদির দ্বিতীয় দফা শুরু: দৃঢ় হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

  • ১-Jun-২০১৯ ১০:০৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সম্প্রতি ভারতের জাতীয় নির্বাচনে সুনামিধস বিজয় নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন নরেন্দ্র মোদি। এ জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমাদের আন্তরিক অভিবাদন। এই শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অতিথি হিসেবে যোগ দেন। আর এর মধ্যদিয়ে স্পষ্ট হলো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন উচ্চতা। কেননা, আরেক প্রতিবেশী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সরকারপ্রধানকে এই শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আর এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশকেও বিশেষ সম্মান জানানো হলো। কেননা, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের মিত্রবাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে। কাজেই সেই হানাদার দেশের সরকারপ্রধানকে কেন আমন্ত্রণ  জানাবে মোদির সরকার। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর রক্ত দুই দেশের মধ্যে যে রাখিবন্ধন সৃষ্টি করেছে সময়ের বিচারে আজ তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ একে অন্যের উন্নয়ন-সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে নানা ক্ষেত্রে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত শাসনামলে বাংলাদেশ সফর এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দুই দেশকে একসঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরও মসৃণ করেছে। দুই দেশের বন্ধুত্বকে এগিয়ে নিতে দুই দেশের সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ ভূমিকা রেখেছে; যা অত্যন্ত ইতিবাচক। 
বাংলাদেশ ও ভারত দুটি ভিন্ন দেশ হলেও ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনেক মিল রয়েছে। আবার প্রতিবেশী হলে যে সব বিষয়েই মিল থাকবে এমন কোনো কথা নেই। একটি রক্তের বন্ধন পরিবারেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়। তারপরও বলতে হবে সব কিছু পাল্টানো গেলেও প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। সেই বাস্তবতাকে সঙ্গে নিয়েই দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক যে আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে তা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ-ভারত গত এক দশকে সীমান্ত চুক্তি এবং ছিটমহল বিনিময় চুক্তি করে দুই দেশের সীমান্তকে শান্তির সীমান্তে পরিণত করার ক্ষেত্রে একধাপ এগিয়েছে। সমুদ্রসীমা নিয়েও দুই দেশ নিজেদের মধ্যে মীমাংসায় উপনীত হতে পেরেছে। বাংলাদেশ ও ভারত এক দেশের সন্ত্রাসী ও বিভেদকামী শক্তিকে অন্য দেশে আশ্রয় না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা প্রশংসার যোগ্য। অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সীমান্ত সুরক্ষা, প্রযুক্তি বিনিময়, মহাকাশ গবেষণা, সাইবার নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি, শিপিং, নদী খননসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতার দিগন্ত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এতে দুই দেশই উপকৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বেড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে। মানুষের মাথাপিছু আয় কয়েকগুণ বেড়েছে। সুতরাং প্রত্যাশা থাকবে, ভারতের সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় মোদি সরকারের বর্তমান মেয়াদেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত, কার্যকর ও দৃঢ় হবে। 

তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন বিরাজমান নানা সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হলেও তিস্তা ও মনু নদীর জলবণ্টন সমস্যাটি ঝুলে আছে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিস্তার উজানে বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ নির্মাণ করে পানির প্রবাহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ফলে এক সময়ের প্রমত্তা নদীটির বর্তমানে করুণ দশা। বাংলাদেশ অংশে তিস্তার যে মুমূর্ষু অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়, তাতে একে ‘মৃৎবত’ নদী ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এ অবস্থায় তিস্তা নদী রক্ষার লক্ষ্যে এবং সেচ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ভারতকে ন্যায়সঙ্গত পরিমাণ পানি ছাড়তে দিল্লিকে দীর্ঘদিন থেকে অনুরোধ জানিয়ে আসছে ঢাকা। কেননা, তিস্তা চুক্তি এখন বাংলাদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের যে রসায়ন তাতে অচিরেই মোদি সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। 

এক্ষেত্রে আমরা আরও বলতে চাই, মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে ভারতের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সহযোগিতা কোনোদিন ভুলে যাওয়ার নয়। এটা অবশ্যই আমাদের জন্য প্রাতঃস্মরণীয়। তবে বাংলাদেশের চাহিদা ও প্রাপ্তি অনেক কম। বিষয়টি ভারত সরকার যাতে বিবেচনায় নেয়, তার জন্য আমাদের কূটনীতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, দুই দেশের বন্ধুত্বকে জনগণের বন্ধুত্বে পরিণত করতে দুই পক্ষই যতœবান হবে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও দুই দেশ পরস্পরকে ছাড় দেওয়ার উদারতা দেখাবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 

Ads
Ads