লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়: কৃষক কি উন্নয়নের মুখ দেখবে না!

  • ১৭-মে-২০১৯ ০৮:৩১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলায় একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে- ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়’। কথাটি ষোলো আনা খাটে দেশের কৃষিজীবী মানুষের ক্ষেত্রে। একেতো উদয়াস্ত ষোলো ঘণ্টা খাটাখাটুনি তো আছেই তার ওপর এতে একটা ভালো অঙ্কের অর্থের বিনিয়োগও আছে। এই অঙ্ক হয়তো বড় বড় কলকারখানায় বিনিয়োগের মতো নয়, কিন্তু যে বিনিয়োগ করা হয় তাও কম নয় তা তখনই বোঝা যায়, যখন দেখা যায় সে বিনিয়োগ উঠানোর জন্য সে পণ্য বাজারে নিয়ে আসল দামও উঠে আসে না। প্রসঙ্গটি এসেছে কৃষকের ধান নিয়ে। যে ধান উৎপাদন না হলে দুদিনেই বাঙালির প্রাণই ওষ্ঠাগত হয়ে যাবে।   

অথচ এবারের মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনও হয়েছিল। কৃষকের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিকও ধরেছিল। কিন্তু ওই যে ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়’। এখনেও তা-ই হয়েছে। বাম্পার ফলনের এই ধান কিনে আড়তদার, চাতাল মালিক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতারাই লাভবান হলো, লাভবান হচ্ছে। ধানের  যে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার কথা তা তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচের টাকাও তুলে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর ওই যে উদয়াস্ত প্রায় ষোলো/সতের ঘণ্টা শ্রম বিনিয়োগ করল তাতে তা তো লাভের খাতায় একেবারেই শূন্য। এরমধ্যে নতুন উপসর্গও এসে উপস্থিত হয়েছে। অকালবর্ষণ ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ার ব্যাপারও আছে। তার ওপর সময়মতো শ্রমিক পাওয়া যায় না এবং যাও মেলে সেখানে মজুরি অত্যধিক। বজ্রপাতের ভীতিও কাজের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। কাজেই লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও যদি না ওঠে তবে কৃষকদের উদ্বিগ্ন, বিচলিত ও হতাশ হওয়াই স্বাভাবিক। ধান খেতে আগুন ধরিয়ে তো সে হতাশারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

সরকারের সিদ্ধান্ত হয় ১২ লাখ ৫০ হাজার টন ধান-চাল কিনবে সরকার। ২৫ এপ্রিল থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা। কিন্তু যথাসময়ে সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষককে সর্বস্বান্ত করতে ৪ থেকে ৫শ টাকা মণ ধান কিনছে। ফলে তাদের প্রতি মণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩শ টাকার বেশি। সময়মতো সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ধানের দাম নিয়ে কৃষকের বিড়ম্বনার এই কাহিনি নতুন নয়। আড়তদারদের সিন্ডিকেট, আড়তের বাইরে গিয়ে ধান বিক্রির সুযোগ না থাকা, মধ্যস্বত্বভোগী ও চালকল মালিকদের কারসাজির কারণে প্রতি বছর এই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় চাষিদের। 

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ধানের ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত করে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। সরকারের সিদ্ধান্তের কারণেও কৃষকরা এ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অনেক সমস্যা সহজেই সমাধান করা যায়। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। উৎপাদিত ধানের সিংহভাগ কৃষক বাজারে বিক্রি করে দেন মিল মালিক, ফড়িয়া ও মহাজনদের কাছে। এতে করে কৃষক ন্যায্য দাম পায় না। বোরো ধান নিয়ে গণমাধ্যমে যে কৃষকের হতাশার বিবরণ ওঠে আসছে তাতে এখনই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

ধান-চাল সংগ্রহের যে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি রয়েছে, তা সংশোধন করতে হবে। সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল কিনতে হবে সরকারকে। এ ব্যাপারে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্লিপ্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে।  কেননা সরকারের উদাসীনতার জন্য দেশের খুচরা বিক্রেতাদের তুলনায় পিঁপড়া শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগীরাই অধিক লাভবান হচ্ছে। এর অবসান হওয়া জরুরি। আমরা চাই যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের ষোলো কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দিতে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রথমত তারাই যাতে লাভবান হয় সেদিকটি দেখতে সরকার গুরুত্ব সহকারে দেখুক এবং সেজন্য যা যা করণীয় সরকার তার বাস্তবায়ন করবে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। 
 

Ads
Ads