মাহে রমজান: আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির শাশ্বতস্বর 

  • ৭-মে-২০১৯ ১০:৪৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বছর ঘুরে মাহে রমজান হাজির হয়েছে মহান আল্লাহর উপহার হিসেবে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই পবিত্র মাস ভোগবিলাস, অপচয় এবং অসংযমের পথ থেকে মানুষকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য রচনাকারী আল কোরআন নাজিল হয়েছিল মহিমান্বিত এই মাসে। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে মুসলমানরা এ তিন ধাপে ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রশান্তি লাভ করবে। সারা বছর জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে যারা যে পাপ করেছে, তা থেকে ক্ষমা পাওয়ার মোক্ষম মাস হলো এ রমজান। সিয়াম সাধনার দ্বারা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তারা যে নাজাতের পথ খুঁজবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। হাজার রজনীর শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল কদর রমজান মাসকে করেছে বিশেষভাবে মহিমান্বিত।

এ রাতেই মহান আল্লাহ তার প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) ওপর সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করেন। কোরআনের শিক্ষা হলো মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে অশেষ কল্যাণ দান করা। কৃচ্ছ্রসাধন ও আত্মসংযমের এ মাসে তাই সংসারি মানুষ আল্লাহর প্রদর্শিত পথে চলার ওয়াদা করে, তাদের সবরকম গুনাহ্ মাফ করে দেওয়ার আকুল প্রার্থনা জানায়। এ মাসে আল্লাহ তার বান্দাদের কঠোর ত্যাগ, ধৈর্য, উদারতা ও সততা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্বাসী মানুষ এই পবিত্র মাসে যা কিছু অকল্যাণকর তা পরিত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের প্রয়াস পায়। আমরা দেখছি, এবার রমজান মাসের আগে মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনে ইসরালি সহিংসতায় নিহত হচ্ছে নিরীহ নাগরিক। আমরা আশা করব, রমজান উপলক্ষে হলেও দখলদার রাষ্ট্রটি তাদের অস্ত্র সংবরণ করবে। বাংলাদেশে এবার রমজান মাস শুরু হচ্ছে ভরা গ্রীষ্মকালে। বৈশাখের তপ্ত দিনের সঙ্গে রয়েছে জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরম। আমরা প্রত্যাশা করব, দুই মাসই বৃষ্টি-বাদলবহুল হবে, যাতে দীর্ঘতর দিবাভাগেও প্রাকৃতিক পরিস্থিতি রোজাদারদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনে।  

অপ্রীয় হলেও সত্য, আত্মসংযমের শিক্ষা দেয় যে রমজান মাস সেই মাসকে দুর্বিনীতরা অসংযম ও লোভ-লালসা পূরণের মৌসুম হিসেবে বেছে নেয়। সিয়াম সাধক বিশ্বাসী মানুষের জন্য বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে তাদের অসংযত মনোভাব। রমজানে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রোজাদারদের কষ্টের মুখে ঠেলে দেওয়া সামাজিক দৃষ্টিতে যেমন গর্হিত, তেমন ধর্মীয় দিক থেকেও অপরাধ। প্রতি বছরই মাহে রমজানে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ান অসৎ ব্যবসায়ীরা। ধর্মীয় দৃষ্টিতে তা যেমন গুনাহ তেমন আইনের দৃষ্টিতেও নিন্দনীয়। পরিতাপের বিষয়, এ মাসেই একশ্রেণীর ব্যবসায়ী সততা আর ন্যায়নীতি ভুলে অতি মুনাফা লাভের প্রতিযোগিতায় নামে। তারা রমজান মাসকে মুনাফা লোটার প্রায় হাতিয়ার করে ফেলে। রমজানের শিক্ষা অনুসরণের বদলে তারা যেন আরও সুযোগসন্ধানী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রমজানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংকট মানুষের দুর্ভোগের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রমজানে একশ্রেণীর মানুষ সংযম ও কৃচ্ছ্রসাধনের পরিবর্তে ভোগ-বিলাসে মেতে ওঠে। সম্পদশালীদের ভেতর চলে ইফতার পার্টির প্রতিযোগিতা। 

প্রতি বছরের মতো এ বছরও মাহে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও রমজান উপলক্ষে সাহরি ও ইফতারে ব্যবহৃত পণ্যের দাম কেন বাড়ছে, কেন সিয়াম সাধনার ধর্মীয় কর্তব্য লঙ্ঘন করে ব্যবসায়ীদের একাংশ মুনাফাখোরিতে লিপ্ত হচ্ছে তা খুঁজে বের করে সংশ্লিষ্টদের সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। রমজানে মানুষ যাতে ভেজালমুক্ত খাবার খেতে পারে তা নিশ্চিত করতে এ মাসে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা জরুরি। এ ছাড়া দেখা যায় ফি বছরই রমজানে যানজট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। চিরাচরিত এই চিত্র থেকে মানুষকে রেহাই দেওয়া হবে, সরকারের কাছে এটাও আমাদের প্রত্যাশা।  

Ads
Ads