বৃহস্পতিবার ১৯ মে ২০২২ ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শিরোনাম: চট্টগ্রাম টেস্টে ড্র মেনে নিল বাংলাদেশ-শ্রীলংকা    আগামী নির্বাচনে আ.লীগ বিজয়ের বন্দরে পৌঁছাবে: কাদের    আবদুল গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক    আবদুল গাফফার চৌধুরী আর নেই    সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ শিশুর    মানবতাবিরোধী অপরাধ: মৌলভীবাজারের ৩ আসামির মৃত্যুদণ্ড    রাজধানীতে ভবন থেকে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
৬০ টাকার উমেদার বাবু এখন ‘জমিদার বাবু’
#তার দৈনিক মজুরি ৬০ টাকা #ঢাকায় দুটি বাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট #পটুয়াখালীতে বিপুল সম্পত্তি
আরিফুর রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২২, ৩:০২ পিএম আপডেট: ২৮.০৪.২০২২ ৫:৫১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম বাবু হাওলাদার। মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কর্মরত মাস্টার রোলের উমেদার পদে কাজ করা এই ব্যক্তি সব অপকর্ম করে থাকেন অবলীলায়। দলিলের পাতা পরিবর্তন, দাগ ও খতিয়ান পরিবর্তন, ভলিউম ছেঁড়া, ঘুষ আদায় থেকে হেন অপকর্ম নেই তিনি করেন না। বিনিময়ে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। অথচ উমেদার সরকার অনুমোদিত বৈধ কোনো পদ নয়। তবু অফিসের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সুবিধার্থে তাকে দৈনিক ৬০ টাকা মজুরিতে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন বাবু।

মাসে ১৮০০ টাকার কর্মী হয়েও ঢাকায় করেছেন একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট। নামে বেনামে গড়েছেন আরো সম্পদের পাহাড়। এছাড়া নিয়মিত মদপান এবং একজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালতে বিচার চলছে। এ মামলায় তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। গভীর রাতেও অফিসে গিয়ে ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করেন তিনি। এত অপকর্মের পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না কর্তৃপক্ষ। অফিসে এখন তিনি উমেদার বাবুর চেয়ে ‘জমিদার বাবু’ নামেই বেশি পরিচিত।

জানা গেছে, রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় অবস্থিত ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের গেটে একসময় বাদাম বিক্রি করতেন বাবু হাওলাদার। পরে তিনি এক উমেদারের চা-পানি এনে দেওয়াসহ নানা ফুটফরমায়েশ খাটার কাজ নেন। নিয়োগপত্র ছাড়াই কর্তৃপক্ষের মৌখিক অনুমতিতে কাজ শুরু করেন তিনি।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হলে কপাল খুলে যায় বাবুর। সে সময় সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুষ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন প্রশাসনের ভয়ে। তখন ঘুষ নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাবুকে। কেননা, বাবুর তখনও নিয়োগ হয়নি। তিনি গ্রেফতার হলে কর্মকর্তারা বলতে পারবেন- তিনি (বাবু) তাদের কেউ না। এই সুযোগটাই কাজে লাগান বাবু। সব ঘুষের টাকা লেনদেন করতেন তিনি। সাব-রেজিস্ট্রারদের নামে দলিল ভেদে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিতেন। এর নামমাত্র টাকা দিতেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। এরপরই অফিসের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি। এই অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তার ভয়ে তটস্থ থাকেন। সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। উমেদার সমিতির সাধারণ সম্পাদকও তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকায় তার দুইটি বাড়ি এবং বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। একটি বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পাঙ্গাসিয়া গ্রামে করেছেন বিপুল সম্পত্তি। চড়েন দামি ব্যক্তিগত গাড়িতে। এই গাড়িতে চড়েই তিনি অফিসে আসেন। তবে গাড়ি অফিসে আনেন না। অফিসের সামান্য দূরে নেমে তিনি হেঁটে আসেন অফিসে। ২০১৭ সালে বাবু উমেদার হিসেবে নিয়োগ পান। তার বেতন নির্ধারণ করা হয় দৈনিক ৬০ টাকা। এরপরই তার অপকর্মের মাত্রার পারদ বাড়তে থাকে দ্রুতগতিতে। গড়ে তোলেন বিশাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের ঘুষ না দিলে এই অফিসে একটি দলিলও নিবন্ধন হয় না। তার আঙুল হেলনে চলেন সিন্ডিকেট সদস্যরা। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে উঠে এসেছে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতির চিত্র। জানা গেছে, বছরখানেক আগে এক দলিল গ্রহীতার কাছে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন বাবু হাওলাদার। ওই ব্যক্তি ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করেন। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অজ্ঞাত কারণে কিছুদিন পর সেই আদেশ প্রত্যাহারও করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি ওই অর্ডার প্রত্যাহার করাতে সক্ষম হন। বাবুকে ঘুষ না দিলে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কোন দলিল নিবন্ধন হয় না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই টাকা তিনি নিয়ে থাকেন দলিল লেখকের মাধ্যমে। এছাড়া তিনি দলিলের পাতা পরিবর্তন, দাগ ও খতিয়ান পরিবর্তন, ভলিউম ছেঁড়ার মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত বলে এই প্রতিবেদকের হাতে প্রমাণ রয়েছে।



সূত্র জানিয়েছে, শুধু বাবু নন, তার কয়েকজন আত্মীয় নিয়োগ ছাড়াই এ অফিস দাপিয়ে বেড়ান। তারাও নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত। তার ভাই ইউসুফ হাওলাদার সরকারি কর্মীদের মতোই অফিস করছেন। গোপনীয় শাখাতেও তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেন। তার বিরুদ্ধেও নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তিনিও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ভাইয়ের পথ অনুসরণ করে। রাজধানীর বাড্ডায় প্লট কিনেছেন তিনি। টাকার গরমে উমেদার বাবুর নৈতিক স্খলনও হয়েছে। তিনি নিয়মিত মদপান করেন। মদ্যপ অবস্থায় অফিস করেন বলেও জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১১ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত হোটেল সুইট ড্রিমের বারে মদপান এবং নৃত্য দেখেন উমেদার বাবু হাওলাদার। সেখানে শেহজাদ খান ওরফে খায়রুল হাসানের (পিতা: নজরুল ইসলাম; মাতা: আয়েশা আক্তার; গ্রাম: মধ্য ভাগলপুর; থানা: বাজিতপুর: জেলা: কিশোরগঞ্জ) সাথে তার পরিচয় হয়। এক সাথে তারা মদপান, নৃত্য উপভোগ ও খাবার খান। হোটেলে বিল হয় ৮ হাজার টাকা। এই বিল পরিশোধ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে তারা মারামারিতে লিপ্ত হন। বিলের ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করেন বাবু। রাত সোয়া ৪টার দিকে হোটেলের নিচে এলে তারা ফের মারামারিতে জড়ান। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন খায়রুল হাসান। উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বনানী থানায় একটি মামলা করা হয়। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ডিবি পুলিশ বাবুকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়। আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাবুর মারধরে খায়রুলের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ মামলায় বাবু দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন। কারাগারে থাকায় তিনি অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের প্রথম দিকে গভীর রাতে অফিসে প্রবেশ করেন উমেদার বাবু। তার সঙ্গে ছিলেন তার ভাই ইউসুফ হাওলাদার, ভায়রা ভাই নকল নবিশ সুরুজ খান এবং এই অফিসের আরেক প্রভাবশালী উমেদার আবদুস সোবহানের ভাগ্নে আয়নাল হোসেন। বিষয়টি জানার পর সাব-রেজিস্ট্রার শাহ মো. আশরাফ উদ্দিন ভূইয়া তাদের অফিসে আসতে নিষেধ করে দেন। তারা অফিসে আসা বন্ধ করে দেন। এর কয়েক মাস পর তিনি বদলি হয়ে যান। সেখানে যোগ দেন লোকমান হোসেন মৃধা। এরপর উমেদার সোবহান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই লোকগুলোকে অফিসে ফিরিয়ে আনেন। তাদের রাতে অফিসে প্রবেশের সিসিটিভির ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। এদিকে আয়নাল হোসেন উমেদার পরিচয় দিয়ে সারা অফিস দাপিয়ে বেড়ান। কিন্তু তার নিয়োগ হয়নি। অফিসের চাবিও থাকে তার কাছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য ফোন করা হয় উমেদার বাবু হাওলাদারকে। তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার এক আত্মীয় জানান, বাবু এই মুহূর্তে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে রয়েছেন। 

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার ভোরের পাতাকে বলেন, ‘অফিসে আসুন। মুখোমুখি কথা বলি। এই বলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।’ মহা নিবন্ধক (আইজিআর) শহীদুল আলম ঝিনুক বলেন, ঢাকা জেলা নিয়ন্ত্রণ করেন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার। তিনিই এ বিষয়ে বলতে পারবেন।’ এর আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘তার অফিসে কোনো দুর্নীতিবাজের স্থান হবে না। দুর্নীতির প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোনো দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত কিংবা ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://dailyvorerpata.com/ad/apon.jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]