বৃহস্পতিবার ১৯ মে ২০২২ ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শিরোনাম: চট্টগ্রাম টেস্টে ড্র মেনে নিল বাংলাদেশ-শ্রীলংকা    আগামী নির্বাচনে আ.লীগ বিজয়ের বন্দরে পৌঁছাবে: কাদের    আবদুল গাফফার চৌধুরীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক    আবদুল গাফফার চৌধুরী আর নেই    সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ শিশুর    মানবতাবিরোধী অপরাধ: মৌলভীবাজারের ৩ আসামির মৃত্যুদণ্ড    রাজধানীতে ভবন থেকে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
চাঁদপুর গিলে খাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ চোরা সেলিম!
উৎপল দাস
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২২, ৭:১০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

মেঘনার অববাহিকায় ইলিশের রাজধানী খ্যাত চাঁদপুর শহরকে গিলে খাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত ১০ নং লক্ষীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ সেলিম খান ওরফে চোরা সেলিম। চাঁদপুর শহরের আশেপাশে শত শত জায়গায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে শহরটি এক সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আংশকাও করছেন অনেকে। আর এই অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজটি খুব সুচারুভাবেই করেছেন শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনক সেলিম চেয়ারম্যান। তিনবারের ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেও মো. সেলিম খানকে এলকার মানুষজন চিনে চোরা সেলিম নামেই। এমনকি চুরির দায়ে কলাগাছের সাথে বেঁধে পিটিয়েছিল এই সেলিম খানকে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেলিম খান ওরফে চোরা সেলিম রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে জুয়ার আসরে চা সরবরাহ করতো। সেখান থেকে তার সাথে পরিচয় হয় কারাগারে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের। সম্রাটের সাথে সখ্যতা করে এলাকায় বালু উত্তোলনের কাজে নেমে এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনির ভাই ডা. ওয়াদুদ টিপুর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। 

এমনকি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি নানা সময় বিতর্কিত এই চোরা সেলিমের পক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটারও দিয়েছেন। ২০২১ সালের ১৬ আগস্টও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি ডিও লেটার দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী, যা ভোরের পাতার হাতে এসেছে। 

এক সময় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন এই সেলিম খান। এখন প্রাডো ও র্যাভ-৪ জিপে চলাফেরা করেন। যাপন করেন বিলাসী জীবন। আছে বিশাল ‘হুন্ডা বাহিনী’। শুধু চাঁদপুর নয়, ক্যাসিনোর গডফাদার ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সহযোগী হিসেবে ঢাকায়ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর কয়েক দিন ছিলেন আত্মগোপনে। থানায় জমা দেন নিজের লাইসেন্স করা দুটি আগ্নেয়াস্ত্র। চাঁদপুর সদর থানার ইন্সপেক্টর হারুনুর রশিদ অস্ত্র জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। 

জানা গেছে, সেলিম খান আত্মগোপন থেকে ফের প্রকাশ্যে এসেছেন। তার দাপটে চাঁদপুরের মানুষ তটস্থ। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। ফলে তার সব অপকর্ম ঢাকা পড়ে আছে। তবে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ কৌশলে তার ফুলেফেঁপে ওঠার গল্প গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন।

সরেজমিন তার সম্পদ অর্জনের অনেক অজানা কাহিনী জানা গেছে। এলাকার লোকজন জানান তিনি ফসলি জমি ভরাটের মাধ্যমে নষ্ট করছেন কৃষিজমি। মেঘনা নদী থেকে বছরের পর বছর বালু উত্তোলন করে চলেছেন। নদীতে শত শত ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তুলে বিক্রি করছেন। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কাজটি করছেন। এসব কাজে তার বিশাল বাহিনী ব্যবহার করে থাকেন। ফলে চাঁদপুরের নদীতীরবর্তী এলাকা ভাঙনের মুখে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ খাল দখল করে মাছ চাষ করছেন। শাপলা মাল্টি মিডিয়া নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলে সিনেমায় কালো টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ঢাকার ক্যাসিনো ব্যবসাসহ তদবির বাণিজ্য করে তিনি এখন টাকার কুমির। 

সরেজমিন অনুসন্ধানকালে তার ইউনিয়নের অনেক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের পাতাকে বলেছেন, তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। যে জমির শতাংশ এক লাখ টাকা সে জমি তিনি ৫-১০ হাজার টাকায় নিচ্ছেন।

এলাকাবাসী বলেন, চেয়ারম্যানের নিজের ইউনিয়নটি নদীর পাড়ে। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে গরিব দুঃখীদের ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি নামমাত্র মূল্যে গ্রাস করে নিচ্ছেন। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে যাদের জমি নিয়েছেন তাদের মধ্যে স্থানীয় সুকা কবিরাজের বাড়িসহ প্রায় ২৫টি বাড়ির শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। সুলতান খান, শাহালম খান, জাহাঙ্গীর, মুরাদ উকিলসহ অনেকের সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে কিনে তাদের উচ্ছেদ করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলেন, তিনি চাইলে জমি দিতেই হবে। না দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। চেয়ারম্যানের অত্যাচারের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের এক বাসিন্দা।

তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, দেড় বছর আগে আগে নামাজরত অবস্থায় আমার দুই ছেলেকে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল চেয়ারম্যানের ছেলে ও তার লোকজন। ঘটনার সময় সে (চেয়ারম্যান) উপস্থিত ছিল। বিষয়টি চাঁদপুরের এমন কোনো নেতা নেই যাকে আমি জানাইনি। কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি। বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি। তিনি বলেন, আমার ৫৬ শতাংশ জমি জোর করে নিয়ে গেছে। এভাবে সে বহু মানুষের জমি দখল করছে। কিছু বলতে গেলে চলে নির্যাতন।

অপরদিকে সম্রাটের সঙ্গে যোগ দিয়ে ঢাকা এবং আশপাশে নামে-বেনামে বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছেন সেলিম খান। সম্রাট ছাড়াও যুবলীগের খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আরমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদসহ এ চক্রটির সঙ্গে মিলেমিশে নিজেকে অন্য প্রভাবশালীদের তালিকায় নিয়ে যান। তার সম্পদের ফিরিস্তিও বিশাল। নিজের মুখেই সেলিম খান স্বীকার করেছেন কাকরাইলে তার চার তলা আলিশান বাড়ি রয়েছে।

এ ছাড়া ডেমরায় তার ৬ তলা বাড়ি, নারায়ণগঞ্জের ভুইগড়, রাজধানীর হাতিরপুলসহ বিভিন্ন স্থানে বেনামি সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সিনেমায় বিনিয়োগ রয়েছে কয়েক কোটি টাকা। চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ির কাছে লাভলী স্টোরের জমি ২১ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে জানা গেছে। তিনি ঢাকায় নিজের সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সম্রাট, খালেদ, আরমান ও সাঈদ কমিশনারের সঙ্গে যোগ দিয়ে সিনেমার ব্যবসায় টাকা লগ্নি করেন। তার নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম শাপলা মিডিয়া।

আমি নেতা হব, চিটাগাইঙ্গা পোলা নোয়া খাইল্যা মাইয়া, ক্যাপ্টেন খান, শাহেনশাহ, প্রেম চোর, একটা প্রেম দরকার ও বিক্ষোভ ছবি তার টাকায় বানানো।  অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি ৭টি ছবির পেছনে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা লগ্নি করেছেন। তবে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের মতে, টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তিনি বলেন, সিনেমা বানানোর পেছনে তিনি কোনো টাকা বিনিয়োগ করেননি।



এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিপুল সম্পদের বর্ণনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, চেয়ারম্যান সেলিমের সম্পদের বিবরণ শুনে মনে হয়েছে বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ আহরণের একটি দৃষ্টান্ত। এটা পরিষ্কারভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি। তদন্তের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ার হয়ে যায়। কাজেই আমরা আশা করব, তার ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সেলিম খানের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন ও সাবেক সাখুয়া ইউনিয়ন একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, আমি যতটুকু জানি তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা সঠিক। তিনি এক সময় রিকশা চালাতেন। তার বিশাল বিত্তবৈভব নিয়ে আমাদের সবার মাঝে প্রশ্ন আছে। কীভাবে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা এলাকার মানুষের কাছে বিস্ময়।

শত শত কোটি টাকার সম্পদের উৎস কী- জানতে চাইলে ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সেলিম খান উত্তেজিত হয়ে পড়েন। গত কয়েক দিন তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলতে রাজি হননি। এর একপর্যায়ে তিনি কথা বলেছেন। অভিযোগের বিষয়ে সেলিম চেয়ারম্যান বলেন, সম্পদ বলতে কাকরাইলে ঈশা খাঁ হোটেলের পাশে চার তলা একটি বাড়ি ছাড়া আমার আর কিছুই নাই। অন্য যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়।

এদিকে, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ৩৫৯ কোটি টাকার দুর্নীতিতেও নাম উঠে এসেছে শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনির ঘনিষ্ঠজন সেলিম খানের। এ ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে চাঁদপুরের স্থানীয় প্রায় দেড়শ সাংবাদিককে ভারত ভ্রমণে পাঠানো হয়েছে। এ ভ্রমণের যাবতীয় খরচ নির্বাহ করছেন ডা. দীপু মনির ভাই ডা. ওয়াদুদ টিপু এবং সেলিম চেয়ারম্যান।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://dailyvorerpata.com/ad/apon.jpg
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]