মঙ্গলবার ২৬ অক্টোবর ২০২১ ৯ কার্তিক ১৪২৮

শিরোনাম: রাজধানীতে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত    দেশে ৬ কোটি ১৪ লাখের বেশি করোনার টিকা প্রয়োগ    স্কটল্যান্ডকে ৬০ রানেই গুঁড়িয়ে দিল আফগানিস্তান    দারিদ্র্য বিমোচনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর কাজ করা উচিত: প্রধানমন্ত্রী    ফৌজদারি কার্যবিধি আধুনিকায়নে কমিটি গঠন    আবাসিক এলাকায় নতুন গ্যাস সংযোগ দিতে হাইকোর্টের রুল    টস জিতে ব্যাটিংয়ে আফগানিস্তান   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
গাজীপুরে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মেয়র জাহাঙ্গীর!
উৎপল দাস, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৬:৫৩ পিএম আপডেট: ২৬.০৯.২০২১ ৭:০২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

রাজধানী ঢাকার অদূরে অবস্থিত হওয়ায় গাজীপুরের রাজনীতি দেশের জন্যই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের গাজীপুর মহানগর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও দেয়া হয়েছে সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে। কিন্তু গাজীপুরের রাজনীতিতে গোপনে এবং মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যেই স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ রয়েছে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।

একটি ঘরোয়া আয়োজনে এই কটূক্তির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

এই ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, মেয়র মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন, বঙ্গবন্ধুর দেশ স্বাধীন করার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তবে মেয়রের দাবি, ভিডিও কারসাজি করা। যেসব কথা শোনা যাচ্ছে, সেগুলো সুপার এডিট করা। তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন, ফিরেই মামলা করবেন।

ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া চার মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, হেফাজতের প্রয়াত নেতা জুনায়েদ বাবুনগরীর সঙ্গে তার সখ্য ও রাষ্ট্রীয় দুটি সংস্থা নিয়ে নানা আপত্তিকর মন্তব্য করছেন মেয়র জাহাঙ্গীর।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ফেসবুকে মেয়রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলছেন। বুধবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনও হয়েছে।

মেয়রের মন্তব্যে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও পড়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। তবে মেয়রের অনুসারীরা বলছেন, গত তিন বছরে গাজীপুরে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল মেয়রকে বিতর্কিত করতে এমন বক্তব্য প্রচার করছে। 

এদিকে ভোরের পাতার অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিল্পনগরী গাজীপুরের যত অপকর্ম ঘটে তার সব কিছুর পেছনেই রয়েছে সিটি মেয়র জাহাঙ্গীরের হাত। এমনকি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কেউ বাড়ি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান করতে গেলে চাঁদাও দিতে হয়। নিরবে চাঁদাবাজির অভিযোগ এতদিন কথিত থাকলেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতার মদদপুষ্ট হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে ভয় পেতেন। এবার বঙ্গবন্ধু এবং ৩০ লাখ শহীদকে কটুক্তি করার অডিও এবং ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই কথা বলতে শুরু করেছেন। এমনকি প্রতিবাদও করেছেন। 

ভোরের পাতার সাথে আলাপকালে ম অধ্যাক্ষরের একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, মেয়র জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের একজন শীর্ষ নেতার আর্শিবাদে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যার সাথে তিনি জড়িত নন। কথায় কথায় সেই নেতার নাম বিক্রি করে তিনি দম্ভোক্তি নিয়ে বলেন, ‘কেউ তার কিছুই করতে পারবে না, কারণ মূল দলের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের ওই নেতাকে  তিনি ম্যানেজ করেই সব কিছু করেন।’

টঙ্গীর একজন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা বলেন, জাহাঙ্গীর আলম মেয়র হওয়ার পর থেকেই বেপোরোয়াভাবে বিএনপি-জামায়াত এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের কেউ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলেই মামলা হামলা দিয়ে হয়রানি করতেও পিছপা হননি। এমন হাজারো ঘটনা গাজীপুরে ঘটেছে। আওয়ামী লীগের আদর্শকে মুখে মুখে ধারণ করলেও ভেতরে পুরোপুরিই স্বাধীনতা বিরোধীদের দোসর হিসাবেই কাজ করে গেছেন। সারাদেশে হেফাজত যখন তান্ডব চালিয়েছিল, তখন গোপনে মেয়র জাহাঙ্গীর হেফাজতের নেতাদের অর্থ দিয়েও সহায়তা করেছিলেন। এমনকি ইসলামী আলোচনার নামে সরকার বিরোধী প্রচারণা যেসব মাহফিলে চালানো হতো, সেখানে নিজে আর্থিক অনুদান থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সহয়াতাও দিতেন। 

ভিডিওতে যা দেখা যায়, যা শোনা যায়

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির প্রথম দিকে মেয়র জাহাঙ্গীরকে নীল রঙের জামা পরে চেয়ারে বসে কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।

ভিডিওটির প্রথম দিকে মেয়রকে দেখা গেলে বাকি অংশে শুধু অডিও বক্তব্য শোনা যায়। কিছু কিছু অংশ ছিল অস্পষ্ট।

ভিডিওটি কে বা কারা কবে ধারণ করেছেন, সেটি জানা যায়নি। কারাই বা সেটি ফেসবুকে ছেড়েছে, সেটিও অজানা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ভিডিওটির শুরুতে মেয়র জাহাঙ্গীরকে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে শোনা যায়। তার দাবি, বঙ্গবন্ধু তার স্বার্থে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান ভাঙার পেছনে রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা কাজ করেছে বলেও মনে করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা।

তার ধারণা, বাংলাদেশ স্বাধীন না হয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি থাকত এখানকার মানুষ।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের প্রসঙ্গে টেনে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি রাসেল সাহেবকে এইখানে নিয়া ফালাইছি। আমি চাইছি রাসেল সাহেব ভুল করুক। আমি ইচ্ছা করেই চাইছি হেও মিছিলটাতে এটেন্ড করুক।’

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজমত উল্লাহ আমারে জীবনে মারার লাইগা লোক কন্টাক্ট করছে, সব করছে। এখন সে আমার কর্মী হইছে। ...আমারে জিগায় কী করছ? আমারে কয়দিন জিগাইছে কী করো, কেমনে সম্ভব? হেও সব জানে না! আমি তো খেলা জিতছি।’

জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি মন্ত্রীরে নিয়া মাথা ঘামাই না। জাহিদ আহসান রাসেল আছে না? তারে নিয়া আমি এক মিনিটও চিন্তা করি না। খালি জাস্ট শুইনা রাখো, বিশ্বাস করার দরকার নাই। আমি চিন্তা করলাম সে তো মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠই। দরকারটা কী আমার এখানে, পরিবর্তনে কী হইব? এখানে পরিবর্তনের লাভ টা কার?’

গত তিন বছরেও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্যানেল মেয়র নির্বাচন করা হয়নি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও চলছে। এ বিষয়ে ভিডিওটিতে মেয়রকে বলতে শোনা যায়, ‘প্যানেল মেয়র দেই না। দিলে কী হইব? আমারে কি কাউন্সিলররা মেয়র বানাইছে? আমার কি মেয়রগিরি যাইবগা? যেমন আমি এখানে প্যানেল মেয়র করি নাই। রাসেল এমপি অনেকরে মেয়র বানাইয়া দিতেছে, অনেকরে কাউন্সিলর বানাইয়া দিতেছে। প্রধানমন্ত্রী আরেকজনরে ভারপ্রাপ্ত দিব?’

বাংলাদেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাব্যক্তি তার নিকটাত্মীয় উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘বাতাসটা আমার কাছে বইলা যায়।’

বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এমনকি হেফাজতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলার কথাও বলেন মেয়র জাহাঙ্গীর।

তিনি বলেন, ‘আমি জামায়াতের সাথে চলি না? বিএনপির সাথে চলি না? অন্য পার্টি আছে না সবার সাথেই তো কথা বলি। এই যে আমার সাথে ঘণ্টা তিনেক আগেও বাবুনগরী (হেফাজতের প্রয়াত আমির) প্রায় ৪৭ মিনিট কথা বলছে। সে আসতে চায়। আমি কথা বলছি না?

‘ধীরাশ্রম, ঝাঝর, চান্দরা আছে ৮/১০ বিঘা, দিঘিরচালা আছে ১৬ বিঘা, তেলিপাড়াও আছে। আমার এখানে সাড়ে তিন শ বিঘা জমি আছে। এই নির্বাচনের সময়েও দশ হাজার কোটি টাকা আনছি।’



এসব বিষয়ে মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই ভিডিও সম্পর্কে কিছু না জানা নেই।

বিষয়বস্তু জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এগুলো সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। ভিডিওটি কারা বানাইল, কারা ইডিট করল, কিছুই জানি না। আমার প্রত্যেকটি কথা জোড়া দেয়া। আমার কথা কেটে কেটে বিকৃতভাবে প্রকাশ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি যখন ভাওয়াল কলেজের ভিপি নির্বাচন করেছি, তখন থেকেই একটা মহল আমার বিরোধিতা করেছে। সেই বিরোধীরা উপজেলা নির্বাচন, সিটি করপোরশেন নির্বাচনসহ আজও সক্রিয়। আমি মামলা করব।’

উল্লেখ্য, ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থী কয়েকটি গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বা অর্থ প্রদানের মাধ্যমে নিজের সাফাই গেয়ে সংবাদ প্রকাশ করার কাজটিও সুচারুভাবে করতে শুরু করেছেন বিএনপি জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম।  এমনকি ছাত্রদল ও শিবিরের অভিযোগ রয়েছে এমন কয়েকজনকে  অর্থের বিনিময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার পক্ষে লেখার জন্য অথবা প্রতিবাদ করার জন্য লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে বলও নিশ্চিত হওয়া গেছে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://www.dailyvorerpata.com/ad/Comp 1_3.gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]