মঙ্গলবার ২৬ অক্টোবর ২০২১ ৯ কার্তিক ১৪২৮

শিরোনাম: স্কটল্যান্ডকে ৬০ রানেই গুঁড়িয়ে দিল আফগানিস্তান    দারিদ্র্য বিমোচনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর কাজ করা উচিত: প্রধানমন্ত্রী    ফৌজদারি কার্যবিধি আধুনিকায়নে কমিটি গঠন    আবাসিক এলাকায় নতুন গ্যাস সংযোগ দিতে হাইকোর্টের রুল    টস জিতে ব্যাটিংয়ে আফগানিস্তান    ই-কমার্সে আটকা গ্রাহকদের টাকা ফেরতের বিষয় যা বললেন বাণিজ্যমন্ত্রী    বেড়েছে ডেঙ্গু রোগী    
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
কেবল কাগজে কলমেই ২০ দলীয় জোট
#একলা চলো নীতিতে চলছে বিএনপি #কোনো কার্যক্রম নেই জোটবদ্ধ দলগুলোর
রতন বালো
প্রকাশ: রোববার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২:৩৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ

রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিও এখন অনেকটাই একলা চলো নীতিতে চলছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির জোট, অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজার নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট এলায়েন্সসহ (বিএনএ) ছোট ছোট জোটগুলো এখন অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। এর মধ্যে বামপন্থি রাজনৈতিক আদর্শের পতাকাবাহী আটটি রাজনৈতিক দলের জোট গণতান্ত্রিক বাম জোট রাজপথে কিছুটা সক্রিয় থাকলে আন্দোলনে তারা কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাদবাকী অন্যান্য ছোট ছোট জোট বা দলগুলো অনেকটাই বিলীন হতে চলেছে।

ভোটের আগে রাতারাতি গড়ে ওঠা এসব ছোট ছোট দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে  আসন ভাগাভাগি করতেই প্রধান প্রধান দলগুলোর সঙ্গে জোটবাধতে উৎসাহিত হয়।  এসময় নিজেদের শক্তি সামর্থ্যকে উপক্ষো করে তারা এই দলের কাছে জোটের  কাছে অস্বাভাবিক আবদার উত্থাপন করে। যদিও শেষ পর্যন্ত গুটি কয়েক আসন নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। তবে সেই আসনগুলোতে তাদের ভরাডুবি ঘটে। তাই ভোটের পর থেকেই জোটবদ্ধ দলগুলোর তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। ভোটে হারা আর রাজপথে আন্দেলনে ব্যর্থতার কারণে খবর নেই ২০ দলীয় জোটের। ড. কামাল ও আ স ম রবের দলেও এখন বিভক্তি স্পষ্ট। রাজনৈতিক ময়দান থেকে নিখোঁজ হয়েছে ড. অলির জাতীয় মুক্তিমঞ্চ। ফলে ২০ দলীয় জোট এখন কেবলই কাগজে কলমে তাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।  নিজেদের গৃহবিবাদের কারণে ২০ দলীয় জোটে চলছে ভাঙনের সুর। এসব কারণে অনেকটাই বেকায়দায় জোটের নীতিনির্ধারকরাও। এমনকি জোটের বৃহত্তম দল বিএনপির সঙ্গে এখন কারও নেই আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। অনেকটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে আপাতত একলা চল নীতিতে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। 

বর্তমানে বিএনপি বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে নিজেদেরকে আবার চাঙা করতে চাইছে। বিএনপির তৃণমূল নেতারা এমন কথাই বলছেন। হায়ার করে এনে কারও নেতৃত্ব মানতে নারাজ বিএনপির তৃণমূল নেতারা। তবে দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রতিকূল এই সময়ে বৃহত্তর ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ডান-বাম, ছোট-বড়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দুই জোটের পাশাপাশি সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোকেও ঐক্যবদ্ধ করে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও সে পালে তেমন হাওয়া লাগছে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জোট নিয়ে সকলের মনোভাব এমনি। বিশ দলীয় জোটের মধ্যে নিবন্ধিত দল রয়েছে মাত্র ছয়টি, বাকি ১৪টি অনিবন্ধিত। অধিকাংশ দল চলছে ব্যক্তির ইচ্ছেয়। সব মিলিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের এখন কোনো অস্তিত্বই নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।  সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনেও অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকার কারনে কর্মীদের ভেতরে হতাশা বেড়েই চলেছে।

অন্যদিকে পারস্পারিক অবিশ্বাস এবং মতবিরোধের কারণে বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গেও ভোটের মাঠে ছিলেন না শরিক দলের নেতারা। এমন কি আন্দোলন-সংগ্রামেও রাজপথেও তাদের  দেখা মিলছে না। ১৪ জুলাই ২০ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে কওমি মাদরাসাভিত্তিক প্রাচীন ধর্মীয় সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (জমিয়ত)। পুরানা পল্টনে সংগঠনটির জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন জমিয়তের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া। ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি বিএনপির অনাস্থা ও জোটের শরিক দল হিসেবে যথাযথ মূল্যায়ন না করাসহ কয়েকটি অভিযোগ করেন জমিয়ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। 

মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বলেন, ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করা জমিয়তের জন্য কল্যাণকর। আজ থেকে জোটের কোনও কার্যক্রমে জমিয়ত থাকবে না। কারণ হিসেবে তিনি সে সময় বলেছেন, জোটের শরিক দলের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, শরিকদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই উপনির্বাচন এককভাবে বর্জন করা, আলমদের গ্রেফতারের প্রতিবাদ না করা, প্রয়াত জমিয়ত মহাসচিব নূর হোসেন কাসেমীর মৃত্যুতে বিএনপির পক্ষ থেকে সমবেদনা না জানানো এবং তার জানাজায় শরিক না হওয়া।

২০ দলীয় জোট সূত্র জানায়, ২০ দলীয় জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, লেবার পার্টি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ইস্যুভিত্তিক কিছু কর্মসূচি পালন করলেও বাকি দলের কোনো তৎপরতা নেই বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, অধিকাংশ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পর্যন্ত নেই। কেন্দ্রীয় কমিটি থাকলেও নেই জেলা কমিটি। কয়েকটি আবার এক ব্যক্তির এক দল নামেও পরিচিত। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০ দলীয় জোটে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে এ কথা স্বীকার করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেছেন, ‘জোট নিয়ে এখন আমাদের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। এমনকি স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকেও এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা এখন দল (বিএনপি) নিয়ে কাজ করছি। নিজেদের দল গোছাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন দলীয় কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে দলের নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। এরপর আমরা ২০-দলীয় জোট বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, পেশাজীবী বা বিশিষ্টজনদের সঙ্গেও বসে মতামত নিতে পারি। তবে এটা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। বেশ কিছুদিন ধরে করোনা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে জোট ও ফ্রন্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। তার অর্থ এই নয় যে জোট-ফ্রন্ট নেই।’

২০ দলের অন্যতম শরিক দল এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, জোটের এখন কোনো কার্যক্রম নেই। বিভিন্ন কারণে বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু সমস্যা রয়েছে। ফলে ২০ দলীয় ঐক্যজোট সক্রিয় হচ্ছে না। বিএনপি হলো একটি সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। তারা একটি আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে ২০ দলীয় জোট গঠন করেছিল। এখানে অনেকগুলো দল আছে যাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। কতদূর তাদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে, কতদূর সফলতা আসবে এটা বলা খুব কঠিন। অলি আহমদ মনে করেন, চালকের আসনে থাকা বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

আরেক শরিক লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জোটের ভেতরে বেশ কিছু দল আছে যাদের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল, নেতৃত্বের অবস্থা খুবই খারাপ। সৃষ্টি হয়েছে চরম হতাশা। যোগাযোগই বন্ধ করে দিচ্ছে একে অপরের সঙ্গে। সবচেয়ে বেশি তুঙ্গে জামায়াত-বিএনপির টানাপোড়েন।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা জানান, গত বছরের জুলাইয়ে সর্বশেষ ২০-দলীয় জোটের একবার ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। বিএনপি এই জোটের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দল। তাদেরই জোট চাঙা করার ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা জোটগত রাজনীতি চালু রাখার ক্ষেত্রেও বিএনপিকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করেছিল বিএনপি। পরে এইচএম এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে গেলে নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) জোটে থেকে যায়। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দলীয় জোটে। এরপর পরিধি দাঁড়ায় ২০ দলে। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, এনপিপি, ন্যাপ ও এনডিপির একাংশ বেরিয়ে যায়। আন্দালিব রহমান পার্থর দল বিজেপিও বেরিয়ে যায় জোট থেকে।



জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের কোনো বৈঠক হয়নি। বিএনপির ধারাবাহিক বৈঠকে নেতারা ঐক্যফ্রন্ট বিশেষ করে ড. কামালকে নিয়ে অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্টে অন্যতম দল বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী নেই। জেএসডির আ স ম রব ভাই তিন মাস ধরে দেশের বাইরে। এখন এটাকে আর সে অর্থে ঐক্যফ্রন্ট বলা যাবে কি না বুঝতে পারছি না। আমি মনে করি ঐক্যফ্রন্ট পুনর্গঠন করা উচিত। এখন সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

এ প্রসঙ্গে গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। গণফোরাম সভাপতি ড. কামালের সঙ্গেও কোনো কথাবার্তা হয় না। আমরা এখন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সম্মেলন করছি। ৩৫টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন শেষে তৃণমূণ নেতাদের মতামত নিয়ে নেতৃত্বে নির্বাচন করব। অগঠনতান্ত্রিক কোনো নেতৃত্ব আমরা চাই না। 

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অভিমানে কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ গঠন করেন। এতে যোগ দেয় মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিও। কিন্তু কর্নেল অলির ওই জোটও এখন মৃতপ্রায়। তাদের নেই কোনো কার্যক্রম। ওই মঞ্চ গড়ে ওঠার পর ভাঙন ধরে ড. অলির এলডিপিতে। শাহাদাত হোসেন সেলিমের নেতৃত্বে নতুন এলডিপি গঠিত হয়। অন্যদিকে কল্যাণ পার্টি না ভাঙলেও কেউ কেউ দলত্যাগ করেন।

২০ দলের অস্তিত্ব আছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, জোট আছে আবার জোট নেই। জোট আছে এ অর্থে যে আমাকে গণমাধ্যমে লেখা হয় ২০-দলীয় জোটের নেতা। আবার জোট নেই এ অর্থে বলব যে কর্মেই মানুষের পরিচয়। কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর জোটের কোনো কার্যক্রম নেই। তাই বলা যেতে পারে এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জোটটি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


আরও সংবাদ   বিষয়:  ২০ দলীয় জোট  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://www.dailyvorerpata.com/ad/Comp 1_3.gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]