মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২ আশ্বিন ১৪২৮

শিরোনাম: বারডেম হাসপাতালের কেবিনে বৃদ্ধার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার    দেশে ৪ কোটি ১৩ লাখের বেশি করোনার টিকা প্রয়োগ    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সর্বত্র যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশ রাষ্ট্রপতির    করোনা টেস্টের টাকা নিয়ে উধাও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট    দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছে বিএনপি: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী    মৃত্যু ও শনাক্ত দুটোই বেড়েছে    কমল ডেঙ্গু রোগী, বাড়ল মৃত্যু   
https://www.dailyvorerpata.com/ad/Inner Body.gif
প্রতারণার ফাঁদে নারী কেন পড়ছে
মেহেদী হাসান বাবু
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১, ১২:৪৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে দাস প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছে সেই কবে! কিন্তু প্রথা নিষিদ্ধ হলেও এখনো পৃথিবী থেকে বিলীন হয়নি দাসত্ব। পরিসংখ্যান বলছে, বৈধভাবে বিশ্বের চার কোটির বেশি মানুষ এখনো দাসত্বের জালে বন্দি। আর অবৈধ বা অন্যায়ভাবে দাসত্বের শিকলে বন্দিদের সংখ্যাও কোটির কম নয়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের মানুষের স্বপ্নই থাকে উন্নত দেশের উন্নত জীবনের সংস্পর্শে এসে নিজের ভাগ্যকে বদলে ফেলা। কারও কারও ভাগ্য বদলাচ্ছে ঠিকই কিন্তু অধিকাংশই দাসত্বের জালে বন্দি হয়ে পড়ছে। আরও আগ থেকেই নারীপাচার সমাজের একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইদানীং উন্নত দেশে গৃহকর্মী, নার্স কিংবা অন্য কোনো কাজের কথা বলে বৈধভাবেই পাচার হচ্ছেন নারী। এ ক্ষেত্রে কাজ করে সংঘবদ্ধ চক্র। তারা বিদেশ পাড়ি দেওয়ার কথা বলে নারী ও কিশোরীদের মধ্যে আশা জাগায়। স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে দুই চোখভরে। কিন্তু প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক ঘটনা উঠে আসছে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমগুলোয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী ও শিশু। তারা ভালো জীবনের প্রলোভনে পড়ে শিকার হন বেগার শ্রম, বলপূর্বক শ্রমে নিয়োগ, জোর করে বিয়ে দেওয়াসহ যৌন লালসার। বাংলাদেশের অনেক নারীও আধুনিক ক্রীতদাসীর জীবন পার করছেন। মূলত ভালো চাকরি, উন্নত জীবনের কথা বলে বাংলাদেশি এসব নারী ও কিশোরীদের পাচার করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। তবে বর্বরতার শেষ তো এখানেই নয়- তাদের বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে যৌনপল্লীতে, জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে করানো হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম।

অভিবাসীদের নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা বলছেন- মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাতে গিয়ে ‘বৈধভাবে’ ঘটছে নারীপাচার। অভিবাসী নারী শ্রমিকরা কাজের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পরিবর্তে পাচার হয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করে তারা বলছেন- এই শ্রমিকরা যে দেশে যান, সেখানে নারীর কাজের পরিবেশ নেই জেনেও তাদের আটকানো হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ‘বৈধপথেই’ পাচার হয়ে যাবে। আর এরই মধ্যে পাচার হয়ে যাওয়া নারীর সংখ্যাটিও নেহাত কম নয়। এই মুহূর্তে দূতাবাসগুলো যাতে কার্যকর নজরদারির ব্যবস্থা নেয়, এ জন্য কাজ করা জরুরি বলেও মনে করছেন অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো। ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যা ক্রাইমের (ইউএনওডিসি) তথ্য মতে, প্রতিবছর আন্তর্জাতিক সীমান্তে প্রায় ৮ লাখ লোক পাচার হয়। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী বা মেয়ে ও ৫০ শতাংশ নাবালিকা। জাতিসংঘের এক তথ্য মতে, এখনো মানবপাচার বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক পেশার একটি।



মানবপাচারকারীরা ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুক্তভোগীদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে নারীদের আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কেবল একটি কৌশল। ওই প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে নারীদের আকৃষ্ট করে পাচারকারীরা তাদের কূটকৌশলে সফল হয়। কম্বোডিয়ার কথাই ধরা যাক। সেখানকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। দেশগুলোয় নারীপাচারের ট্রানজিট হিসেবেও কম্বোডিয়াকে ব্যবহার করা হয়। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য শিশুশ্রম ও বাণিজ্যিক যৌনশোষণ। নির্যাতনের শিকার অনেক নারী পরে হয়ে ওঠেন পাচারচক্রের সদস্য। যেমন- মালয়েশিয়ায় পাচার হয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন নুরজাহান ওরফে নদী আক্তার ওরফে জয়া আক্তার ওরফে জান্নাত ওরফে ইতি নামে বাংলাদেশি নারী। সেখান থেকে দেশে ফিরে নিজেই নারীপাচারকারী চক্রে জড়িয়ে পড়েন। হয়ে ওঠেন ভারতসহ আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সমন্বয়ক। গণমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পারি, নুরজাহান দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়েদের ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দিতেন। এর পর চক্রের সদস্যরা ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করত।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ‘ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন’ জানিয়েছে- গোটা বিশ্বে ৪৬ মিলিয়ন মানুষকে জোর করে শ্রমিক, যৌনকর্মী কিংবা দাসের মতো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘বৈশ্বিক দাসত্ব ইনডেক্স’-এর তথ্য অনুসারে আগে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, এর চেয়ে বেশি নারী ও শিশু এখনো দাসত্বের শিকার। আর তাদের দুই-তৃতীয়াংশের বাস এশিয়ায়। ইনডেক্স অনুযায়ী ভারতে সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি- প্রায় ১৯ মিলিয়ন মানুষ এখনো ‘আধুনিক দাসত্বের’ শিকলে বন্দি। তার পরে রয়েছে যথাক্রমে চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তানের নাম। বাংলাদেশে দাসত্বের শিকার দেড় মিলিয়নের মতো মানুষ। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, বাংলাদেশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিবছর ২০ হাজার মেয়েকে পাচার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়েদের সঙ্গে প্রতারণা করা সহজ। মেয়েদের ভয় দেখানো সহজ। মেয়েদের ওপর গায়ের জোর খাটানোও সহজ। বর্ডার পার করা সহজ। মেয়েদের বিক্রি করে দেওয়াও সহজ। এ সহজ কাজটি এখন অনেকেরই উপার্জনের উৎস। আর এসব অনৈতিক কাজে যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে অনেক বিবেকহীন লোভী সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকেও। টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ থেকে বাইরের দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিক দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে পেশাগত ভিসায় স্বল্প দক্ষ বা আধা দক্ষ কর্মীর জন্য বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আমাদের দেশ থেকে যেসব মানবপাচার হয়ে থাকে, তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই নারী। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী শুধু ২০২০ সালেই অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় ৩০৩ নারীকে উদ্ধার করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য মতে, ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে নারীপাচারের শিকার এমন মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৭৯১। মামলার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে যত মানবপাচার হয়েছে, তাদের মধ্যে ২১ শতাংশ নারী।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী ও শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন নতুন কিছু নয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অনেক দিন ধরেই বিষয়টি তুলে ধরছে। নির্যাতনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ। কিন্তু বাংলাদেশ দুই-তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক গৃহকর্মী পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে সৌদি আরবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেক নারীকর্মী ভাগ্যবদলের আশায় পাড়ি জমাচ্ছেন। আর সেখানেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের অভিযোগ। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, লেবানন, ওমান ও কাতারেও গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীরা শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এক বছরে আড়াইশরও বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এসব দেশে। তাই সময় এসেছে আধুনিক ক্রীতদাস নামক অভিশাপ থেকে নারী ও শিশুদের মুক্ত করার। সরকারকে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে নিতে হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। আর এসব ঘৃণ্যতম নির্যাতনের খবরের মধ্যে আশার কথা হলো, আধুনিক দাসদের মধ্যে নারী ও শিশুদের পুনর্বাসনে কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। এমনকি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও ইতিবাচক। তার পরও আমাদেরই সচেতনতার ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আধুনিক দাস প্রথার বলয় থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

মেহেদী হাসান বাবু: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
http://www.dailyvorerpata.com/ad/Comp 1_3.gif
https://www.dailyvorerpata.com/ad/last (2).gif
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক ভোরেরপাতা
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৮১৮৯১৪১, ৮১৮৯১৪২, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৮১৮৯১৪৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮১৮৯১৪৩, ইমেইল: [email protected] [email protected]